শিক্ষার গুণগত মান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি

বাংলাদেশ ২০৫০ সালে বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় কি অবস্থায় থাকিবে অর্থনৈতিক অবস্থা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বিবেচনায়, তাহা নিয়া আলোচনা চলিতেছে। এই আলোচনার সূত্রপাত হইয়াছে বিশ্বের কয়েকটি পূর্বাভাস সংস্থার সামপ্রতিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাসকে ঘিরিয়া। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অন্য বিভিন্ন দিক হইতে বাংলাদেশের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত দেশকেও ছাড়াইয়া যাইবার মত পূর্বাভাস দেওয়া হইয়াছে। এই সবের ভিত্তি ছিল অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বিশাল তরুণ প্রজন্মের দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা। অর্থনীতিতে যাহারা প্রবৃদ্ধি নিয়া গবেষণা করিতেছেন তাহারাও যেকোন দেশের দীর্ঘমেয়াদী প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে ঐ দেশের জনশক্তির দক্ষতা ও তাহাদের কর্মসংস্থানের উপর জোর দিতেছেন। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের ইতিহাস ঘাটিলেও এই সত্যই বাহির হইয়া আসে। তবে অনেক দেশই তার জনশক্তিকে কাজে লাগাইয়া উন্নয়ন ত্বরান্বিত করিতে পারে নাই। না পারার সবচাইতে বড় কারণ জনশক্তিকে দক্ষ করিয়া তুলিতে না পারা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন ত্বরান্বিত হইবার যে পূর্বাভাস দেওয়া হইতেছে তাহাও কিন্তু এদেশের বিশাল জনশক্তি বিশেষত তরুণ প্রজন্মের দক্ষতার উপরই নির্ভর করিবে। আর এই দক্ষতার মূলে রহিয়াছে সুস্বাস্থ্য আর শিক্ষা। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়া সংশয় রহিয়াছে অনেকের মধ্যে। আমাদের এই শিক্ষা ব্যবস্থা বিশাল তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ হিসাবে গড়ে তুলিতে পারিবে কিনা আদৌ। সমপ্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাসমূহের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেক সংখ্যকের ন্যূনতম নম্বর পাইয়া পাস করিতে না পারায় আমাদের নিম্ন ও মধ্যস্তরের শিক্ষা ব্যবস্থার যথার্থতা নিয়া প্রশ্ন উঠিয়াছে। প্রশ্ন উঠিয়াছে নূতন গ্রেডিং পদ্ধতি নিয়া। রাজনৈতিক কারণে পাসের হার বাড়ানো হয় কিনা তাহা নিয়াও বিতর্ক দেখা দিয়াছে। বিতর্কের কারণ হঠাত্ হঠাত্ পাসের হার ও ভাল ফলাফলে বিরাট উল্লম্ফল। যেমন, উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় ২০১১ সালে প্রায় ৩৪ হাজার জিপিএ ৫ যখন ২০১২ সালে ৫১ হাজার হয়ে গেল স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন দেখা দেয় কি এমন ঘটেছে যে, কারণে এক বছরের ব্যবধানে সর্বোচ্চ গ্রেড পাওয়া ছাত্র/ছাত্রীর সংখ্যা ৫০ শতাংশ বেড়ে গেল। এই ৫১ হাজার জিপিএ ৫ পাওয়াদের অর্ধেক যখন বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ভর্তি পরীক্ষায় ন্যূনতম নম্বর পেতে ব্যর্থ হয় তখনই এই উল্লম্ফল যে যথার্থ কারণে হয়নি সেই প্রশ্ন দেখা দেয়। মানবিক গুণাবলী অর্জনসহ শিক্ষার অনেকগুলো উদ্দেশ্য রহিয়াছে। তবে অর্থনীতিতে এই সবের মধ্যে একটা উল্লেখযোগ্য উদ্দেশ্য হইলো শিক্ষিত ব্যক্তির বুদ্ধিমত্তা বা সক্ষমতা পরিমাপ করা। যেমন, একজন ভাল গ্রেড পাওয়া ব্যক্তি কম গ্রেড পাওয়া ব্যক্তির তুলনায় বেশি সক্ষম, কোন একটি কর্ম সম্পাদনের ক্ষেত্রে। পাশাপাশি শিক্ষা একজন ব্যক্তির উত্পাদনশীলতা বাড়াইবে তাহাও প্রত্যাশিত। সেই বিবেচনার কারণেই আমরা একজন ভাল ছাত্রকে কোন কর্ম সম্পাদনের ক্ষেত্রে নিয়োগে অগ্রাধিকার দেই। সেই বিবেচনার কারণে আমরা জিপিএ ৫ পাওয়াকে জিপিএ ৪.৫ পাওয়া ব্যক্তির তুলনায় বেশি যোগ্য মনে করি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির ক্ষেত্রেও তাই। একই বিবেচনার কারণে এবার মেডিকেলে ভর্তির ক্ষেত্রে শুধুমাত্র জিপিএ’র ভিত্তিতেই ভর্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হইয়াছিল। তবে সর্বোচ্চ জিপিএ পাওয়াদের অর্ধেক সফল আর অর্ধেক ব্যর্থ হওয়ার কারণে এই জিপিএ’র উপর নির্ভর করা যাচ্ছে না। এই ক্ষেত্রে বার বত্সরের শিক্ষার উপর ভিত্তি করিয়া যে জিপিএ দাঁড়াইয়া আছে সেই জিপিএকে কার্যত বাদ দিয়া এক বা দেড় ঘন্টার পরীক্ষার উপর ভিত্তি করিয়া বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করায় আমাদের নিম্ন ও মধ্যম স্তরের শিক্ষার মধ্যের ভীষণ গলদই ধরা পড়ে। ফলে কর্মমুখতাকে গুরুত্ব দিয়া যে একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ন করা হইয়াছে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ হিসাবে গড়িয়া তুলিতে তাহা কতটা কার্যকর হইবে সেই বিষয়ে সংশয় থাকিয়াই যাইতেছে।