পাইপলাইন বাড়িলে লাভ কী
প্রকাশ : ০৩ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:৪২
বর্তমান সরকারের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হইতেছে, ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত করা। এ লক্ষ্য অর্জন করিতে হইলে উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ বাড়াইবার কোন বিকল্প নাই। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের বিগত বত্সরগুলির বাজেট বক্তৃতায় বিনিয়োগ বাড়াইবার গুরুত্বও শুনিতে পাওয়া গিয়াছে। তাহাতে স্পষ্ট হইয়াছে যে, বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সরকার বিশেষ গুরুত্বারোপ করিয়াছে। কিন্তুু বিনিয়োগ করিতে হইলে সরকারের কাছে যথেষ্ট অর্থ থাকিতে হইবে। সেই অর্থ কিন্তুু সরকারের কাছে নাই। সরকারের সম্পদের এই সীমাবদ্ধতার কারণেই বৈদেশিক সাহায্যের প্রয়োজন বা সরকার বৈদেশিক সাহায্য গ্রহণ করিয়া থাকে। এই বৈদেশিক সাহায্য এখন প্রকল্প ভিত্তিক হইয়া দাঁড়াইয়াছে। অর্থাত্, বহুপাক্ষিক উন্নয়ন সহযোগীরা প্রকল্পের বিপরীতে সাহায্য দিতে চায়। কিন্তুু এই বৈদেশিক সাহায্যেরও যথাযথ ব্যবহার করিতে পারার রেকর্ড গড়িয়া তোলা যায় নাই। সে কারণেই দিনে দিনে প্রতিশ্রুত সাহায্যের অংক কেবলই বাড়িয়াছে। সমপ্রতি ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক রিপোর্ট হইতে জানা যায়, পাইপলাইনে বৈদেশিক সাহায্যের পরিমাণ ষোলশত তেত্রিশ কোটি ডলার বা এক লক্ষ ত্রিশ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়াইয়াছে। উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে বিশ্বব্যাংকের নিকট হইতে গত অর্থ বত্সরে সর্বোচ্চ বৈদেশিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গিয়াছে, যাহার পরিমাণ ৫৮ কোটি ৩৭ লাখ ডলার। স্বাধীনতা উত্তরকালে ২০১০-১১ অর্থবছরে ৫৯৬ কোটি ৮৬ লাখ ডলারের সর্বোচ্চ প্রতিশ্রুতি পাওয়া গিয়াছিল। যাহার মধ্যে কেবল পদ্মা সেতুর জন্যই প্রতিশ্রুতি ছিল ২৩৩ কোটি ডলার। কিন্তুু কেন এমনটি হইয়াছে?
বৈদেশিক সাহায্যের ডিসবার্সমেন্ট সরাসরি প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত বিধায় প্রকল্প বাস্তবায়নকারী মন্ত্রণালয় বা বিভাগের কর্মদক্ষতার উপর ডিসবার্সমেন্ট বহুলাংশে নির্ভরশীল। কর্মদক্ষতার অভাবে সাহায্যের ব্যবহার করিতে পারা যায় নাই। সেই কারণে বত্সরের শুরুতে লক্ষ্যমাত্রা যাহাই ধরা হউক না কেন, শেষ দিকে আসিয়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বৈদেশিক সাহায্যের লক্ষ্যমাত্রা কমাইয়া আনা হয়। ইহাও পাইপলাইন বড় করিবার পিছনে অন্যতম ভূমিকা রাখিয়া আসিতেছে। আবার সরকারের রাজনৈতিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করিতে নিজস্ব অর্থায়ন হইতে খরচ করিবার আগ্রহও বাড়িয়াছে। নিজস্ব অর্থ খরচ করিতে কোন শর্ত থাকে না, কিংবা কাহারো কাছে জবাবদিহিতাও করিতে হয় না। উপরন্তুু ইচ্ছামত খরচ করিতে পারা যায়। আর ইদানীংকালে সরকারের নিজস্ব অর্থে প্রকল্প বাস্তবায়নে জোর দেওয়ার কারণে সাহায্যপুষ্ট প্রকল্পে নিজেদের অর্থায়নের অংশও অনিশ্চিত হইয়া যাইতেছে। ইহাও সাহায্য নগদায়ন করিবার পিছনে অন্যতম বাধা হিসাবে কাজ করিতেছে।
সাহায্য ব্যবহার না হইবার বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ হইতে বিভিন্ন সময় কারণ অনুসন্ধান করা হয়। কিন্তুু এইসব কারণের কথা আমরা স্বাধীনতা পরবর্তীকাল হইতেই শুনিয়া আসিতেছি। যেমন, প্রকল্প বাস্তবায়নে অত্যধিক বিলম্ব। সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে যেমন বিলম্ব হয়, তেমনি উন্নয়নসহযোগী পর্যায়েও সময় ক্ষেপণ করা হইয়া থাকে। তাহাছাড়াও সমন্বয়হীনতা, চুক্তির শর্তাবলী নির্ধারণে মেধা ও জ্ঞানের সঠিক ব্যবহার না হইবার কারণে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয় না। ইহার ফলে, প্রকল্প প্রণয়নে বিভিন্ন ধরনের আপত্তি উপস্থাপিত হয়। তাহাতে প্রকল্প গ্রহণ ও অনুমোদনেও বিলম্ব হয়। ইহাই যদি বাস্তব অবস্থা হইয়া থাকে, তবে সাহায্য ব্যবহার হইবে কিভাবে?
বৈদেশিক সাহায্য ব্যবহারে বাংলাদেশের অদক্ষতার কথা নূতন কিছু নহে। স্বাধীনতার পর হইতেই এই অদক্ষতার দুর্নাম কাঁধে বহন করিয়া আমরা চারদশক অতিক্রম করিয়াছি। কিন্তুু আমাদের দক্ষতা উন্নয়নের চেষ্টা করিয়াছি কি না তাহা প্রশ্নসাপেক্ষ। আর যদি এত সাহায্যই আমাদের পাইপলাইনে থাকিয়া যায়, তাহা হইলে নানা শর্তের বিনিময়ে নূতন করিয়া প্রতিশ্রুতি লইবার দরকার আছে বলিয়া তো মনে হয় না। এইভাবে কেবলই পাইপলাইন দীর্ঘ করিয়া আমাদের অর্থনীতির কি লাভ—সে হিসাব-নিকাশ করিবার সময় আসিয়াছে। একই সাথে কূটনৈতিক ব্যর্থতার বিষয়টিও অস্বীকার করিবার জো নাই। শেষ দিকে আসিয়া পদ্মা সুেত, ড. ইউনূসসহ আন্তর্জাতিক কিছু ইস্যু নিয়া বৈদেশিক সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দিয়াছে। যাহা সঠিকভাবে মোকাবিলা করিতে সমর্থ হন নাই আমাদের নীতিনির্ধারকরা। যাহার কারণে, শুধু ২০১০-১২ দুই অর্থবত্সরেই পাইপলাইনে যুক্ত হইয়াছে ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি। সে ব্যর্থতাও আমাদের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করিয়াছে একথাও নির্দ্বিধায় স্বীকার করিয়া লইতে দোষের কিছু নাই।