জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি
প্রকাশ : ০৪ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:০৩
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর ইসিএফের কিস্তির ছাড় পাইতে ও সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার সহজিকরণে শেষপর্যন্ত আরেক দফায় জ্বালানির দাম বৃদ্ধি করা হইল। বর্ধিত মূল্য ইতোমধ্যেই কার্যকর করা হইয়াছে। এই নিয়া বর্তমান সরকারের আমলে সাতবার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হইল। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডিজেল ও কেরোসিনে লিটার প্রতি সাত টাকা এবং পেট্রোল ও অকটেনে পাঁচ টাকা বাড়ানো হইয়াছে। তবে ফার্নেস ওয়েল ও জেট ফুয়েলের দাম বৃদ্ধি করা হয় নাই। এই মুহূর্তে আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতি দৃষ্টি দিলে দেখা যায়, সেখানেও উচ্চমূল্য বিরাজমান। আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতের কোলকাতায় ডিজেল ও পেট্রোলের মূল্য বাংলাদেশের তুলনায় যথাক্রমে ১৫ টাকা ৪৭ পয়সা ও ২১ টাকা ৫৫ পয়সা বেশি। পাকিস্তানে ডিজেল ও কেরোসিনের মূল্য যথাক্রমে ২২ ও ১৩ টাকা বেশি। এদিকে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোট আগামীকাল রবিবার দেশব্যাপী হরতাল আহ্বান করিয়াছে।
উল্লেখ্য, সরকার গত আর্থিক বত্সরে জ্বালানি খাতে এক বিশাল ভর্তুকি দিয়াছে যাহা প্রায় আমাদের উন্নয়ন বাজেটের সমান। তবে অকটেন ও পেট্রোলে ভর্তুকি না লাগিলেও দাম বাাড়ানো হইয়াছে। জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধির যে নেতিবাচক প্রভাব পড়িবে সর্বত্র তাহা অনস্বীকার্য। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাইলে মূল্যস্তরের আরেক দফা উল্লম্ফন হইবে তাহাতে কোন সন্দেহ নাই। মূল্যস্তরের উল্লম্ফন মূল্যস্ফীতি বাড়াইবে। কারণ জ্বালানির ব্যবহার সর্বত্র। জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে বাড়িবে উত্পাদন খরচ। আরও বাড়িবে পরিবহন খরচ। এই দুইয়ের প্রভাবেই বাড়িবে মূল্যস্ফীতি। অথচ এই মূল্যস্ফীতি কমাইয়া আনার জন্য নেওয়া হইয়াছে সংযত মুদ্রানীতি যাহা আগে ছিল সংকোচনমূলক। ফলে চাপ বাড়িবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখিতে। মুদ্রানীতির ক্ষেত্রে সংকোচনমূলক ব্যবস্থাপনার দিকে অগ্রসর হইলে আমাদের প্রবৃদ্ধির উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়িবে। মনে রাখিতে হইবে, বত্সর দুয়েক আগে ৬.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে সমপ্রসারণমূলক মুদ্রানীতি অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করিয়াছিল। তাই প্রবৃদ্ধি স্থবির হওয়ার পিছনে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ভূমিকা বিশ্লেষণ করিয়া দেখা উচিত।
জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে সরাসরি নিম্নমুখী চাপ সৃষ্টি করিবে প্রবৃদ্ধির ওপর। কারণ যাহারা উত্পাদনের সহিত জড়িত তাহারা এমনিতেই জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ পাইতেছেন না। তাহার উপর জ্বালানির দাম বাড়িয়া যাওয়ায় তাহাদের অনেকেই উত্পাদনে উত্সাহ হারাইয়া উত্পাদন কিছুটা কমাইয়া দিতে পারেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে জ্বালানির মত উপকরণের দাম বাড়িলে তাহাই ঘটে। এই কম উত্পাদন অন্যদিকে মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকাইয়া দিবে। কারণ চাহিদা যেই হারে বাড়িবে তাহার তুলনায় সরবরাহ কম বাড়িবে, ফলে স্বল্প মেয়াদে মূল্যস্ফীতি বাড়িবে। উত্পাদকদের মধ্যে যাহারা বিদেশে রপ্তানির সহিত জড়িত তাহাদের কেহ কেহ আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা হারাইবেন। এইসব নেতিবাচক প্রভাবের কথা মাথায় নিয়া সরকারের সতর্ক থাকা উচিত। আমরা ভাবি, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি শুধুমাত্র নিম্ন আয়ের মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করিবে মূল্যস্ফীতির দ্বারা। এইকথা যেমন ঠিক, তেমনিভাবে এই দাম বৃদ্ধি ধনিক শিল্প উদ্যোক্তাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করিবে আরও বিশাল পরিসরে। শিল্পপতিরা তো তাহাদের কর দেওয়া চালাইয়া যাইবেন কিন্তু আগে এই করের টাকার বেশ অনেকটা জ্বালানির ভর্তুকির কারণে তাহারা পরোক্ষভাবে ফেরত পাইতেন। এখন তাহারা তাহাদের শিল্পের জন্য অনেক বেশি দামে জ্বালানি কিনিবেন, আবার তাহাদেরকে কর দেওয়াও অব্যাহত রাখিতে হইবে। ফলে বর্ধিত জ্বালানি দামের কারণে তাহাদের মুনাফা বেশ খানিকটা কমিয়া যাইবে ইহাতে কোন সন্দেহ নাই। প্রশ্ন হইল, ইহার কতটা প্রভাব পড়িবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উপর। তবে সরকারের উচিত গরীব ও শিল্প উদ্যোক্তা উভয় শ্রেণীর প্রতি খেয়াল রাখা। কেননা শিল্প ও শিল্প উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হইলে এই শিল্পে নিয়োজিত শ্রমিক শ্রেণীও ক্ষতিগ্রস্ত হইবে।