অপসংস্কৃতির আগ্রাসন রোধ করতে হবে
প্রকাশ : ০৫ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:০৮
আমাদের দেশে অপসংস্কৃতির বিস্তার অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, এই অভিশপ্ত, সর্বনাশা পরিস্থিতি মোকাবিলার সামান্যতম প্রস্তুতিও দৃশ্যমান হচ্ছে না। পরিণামে যা হওয়া স্বাভাবিক তাই হচ্ছে। আমাদের জাতীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, হাজার বছরের আচার-আচরণ সব অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ছে। অপসংস্কৃতি, বিজাতীয় সভ্যতা-সংস্কৃতির জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে নীতি-নৈতিকতা, সুদীর্ঘকালের লালিত বিশ্বাস, মূল্যবোধ। এটা একটা ভয়াবহ অবস্থা।
লক্ষ্য করার বিষয় হলো, আমাদের রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিক আচার-আচরণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ইত্যাদি সবকিছুতে বাধা-বন্ধনহীনভাবে ঢুকে পড়েছে অপসংস্কৃতি। আমরা অবিস্মরণীয় এক মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী জাতি। একাত্তরে মাত্র নয় মাস সময়ের মধ্যে এই জাতি যে ত্যাগ স্বীকার করে তার নজির বিশ্বের ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হচ্ছে, এতো ত্যাগ-তিতিক্ষার পরও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, স্বাধীন- সার্বভৌম জাতির আত্মমর্যাদাকে আমরা ধরে রাখতে পারিনি। ফলে স্বাধীনতার চার দশক পরেও আমরা সব ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছি। এই অবস্থা একান্তই হতাশাব্যঞ্জক। এটা জাতির জন্য একটা অশনি সংকেত।
বলতে মনে ব্যথা পাই, গণতন্ত্রের কথা সারাক্ষণ জোরেসোরে বলা হলেও এদেশের মানুষের গত চার দশকে গণতান্ত্রিক শাসনের সুফল ভোগ করার সুযোগ হয়নি। স্বাধীনতার উষালগ্ন থেকে স্বৈরতান্ত্রিক মনমানসিকতা আচ্ছন্ন, প্রভাবিত করে রাখে আমাদের রাজনীতি ও রাজনীতিকদের। ফলে রাজনৈতিক দলগুলো এবং প্রধান প্রধান রাজনীতিকদের পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষের শিকার হয়ে পড়েছে জাতি।
স্বাধীনতার স্বল্পকাল পরে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার আকাঙ্ক্ষা ও ধারাবাহিকতায় কুঠারাঘাত করে। পরবর্তী সময়ে যে গণতান্ত্রিক শাসন কায়েম হয় তা মোটেও নির্ভেজাল ছিল না। তাতে স্বৈরশাসনের ফরমালিন ব্যবহার করে দীর্ঘকাল পচন ঠেকিয়ে রাখা হয় মাত্র।
বর্তমানে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে দা-কুমড়ো সম্পর্ক। দল দুটি পরস্পরকে হুকমি-ধমকি দিয়ে, চোখ রাঙিয়ে, হরতালের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে এবং শাসক দল পুলিশি নির্যাতন, ব্যাপক গ্রেফতার, মামলা দায়ের ইত্যাদি করে বিরোধী দলকে নাস্তানাবুদ করার চেষ্টা করছে। রাজপথ এখন প্রায়ই গরম থাকে। দল দুটির পারস্পরিক বিদ্বেষে ইন্ধন যোগাচ্ছে প্রধান দু’ নেত্রীর একজন আরেকজনের মুখ না দেখার নীতির অব্যাহত অনুসরণে।
এ ধরনের বৈরী, বিদ্বেষমূলক চিন্তা-চেতনা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং স্বাভাবিক রাজনীতি চর্চার সাথে সামান্যতম সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশ্বের কোনো গণতান্ত্রিক সমাজে, দেশে উল্লেখিত ধরনের মনমানসিকতা চর্চা করার নজির খুঁজে পাওয়া যাবে না। এরকম পরিস্থিতিতে আমাদের আবহমানকালের সামাজিক সৌহার্দ্যের ঐতিহ্য বিঘ্নিত হচ্ছে। তাতে করে দেশ শাসনে, সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে ব্যত্যয় ঘটছে। প্রশ্রয় পাচ্ছে উগ্র মনমানসিকতার চর্চা। পরিণামে গোটা সমাজব্যবস্থায় তার বৈরী প্রভাব পড়ছে।
বিষয়টি খুবই দুর্ভাগ্যজনক যে, আমাদের সামাজিক জীবনব্যবস্থায়, রাজনীতি চর্চায়, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে, এমনকি বিনোদনের সকল মাধ্যমে অপসংস্কৃতি চর্চার প্রতিযোগিতা চলছে। রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের বক্তৃতা-বিবৃতি শুনলে মনে হয় দেশে একটি সর্বাত্মক যুদ্ধ চলছে। এক পক্ষের বিবেচনায় অপর পক্ষ দেশ ধ্বংসের পাঁয়তারা করছে। তাই ওদের রুখে দিতে হবে। ওদের হুঙ্কার, যুদ্ধংদেহী মনোভাব, গলা ফাটানো বক্তৃতা, ক্রুদ্ধ অঙ্গভঙ্গি দেখে দেশবাসী ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। মনে হয় একটা সর্বনাশা সংঘাতের আশঙ্কা গোটা জাতিকে শঙ্কিত করে তুলেছে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে জ্ঞানচর্চার পরিবর্তে পেশিশক্তির উত্থান, অস্ত্রবাজি, চাঁদাবাজি, দখল-বেদখল ইত্যাদি অপকর্মের চর্চা সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থাকে বিনষ্ট করে দিয়েছে। কিন্তু তা প্রতিরোধের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। ছাত্রদের হাতে কলমের পরিবর্তে কারা অস্ত্র তুলে দিয়েছে এবং প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য কারা অস্ত্রধারী ক্যাডার পোষে, সে সম্পর্কে জনগণ পুরাপুরি অবগত।
বিনোদন মাধ্যমগুলোতে প্রতিযোগিতামূলকভাবে অপসংস্কৃতির চর্চা আমাদের নিজস্ব ধ্যান-ধারণাকে কোণঠাসা করে ফেলেছে। দেখে-শুনে মনে হয় আমাদের স্বাতন্ত্র্যবোধ, মর্যাদাবোধ ইত্যাদি কিছু নেই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুরাপুরি নির্বাসিত হয়ে গেছে। আমরা কোথায় চলেছি তার কোনো গন্তব্য ঠিক নেই। এটা যেন ভেসে যাক তরী, ডুবে যাক প্রাণ অবস্থা। সংস্কৃতি মানুষকে সঠিক পথে চলতে এবং সুন্দর আচরণে অভ্যস্ত করতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। কোন জাতি যখন এর সংস্কৃতির মৌলিকত্ব হারিয়ে পেলে তখন সে জাতি আর বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। জাতিতে জাতিতে সংস্কৃতির আদান-প্রদান হওয়া খুবই জরুরি। ভিন্ন জাতির নির্মল সংস্কৃতি উপভোগ্য তবে তা কোনোভাবে নিজস্ব সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিয়ে নয়। আচার-আচরণে আমাদের অবশ্যই নিজস্ব সংস্কৃতি অনুসরণ করতে হবে।
এদিকে দেশে দেশে, অঞ্চলে অঞ্চলে মানুষের জীবনধারা বা লাইফ-স্টাইল ইত্যাদিতে পার্থক্য রয়েছে। এক দেশে যা সংস্কৃতি, অন্য দেশে তা অপসংস্কৃতি। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চর্চায় পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যে পর্বতপ্রমাণ ভিন্নতা দেখা যায়। একটার সাথে আরেকটার কোনো মিলই নেই। প্রকৃত বিষয় হচ্ছে, বিশ্বজনীন সংস্কৃতি বলতে বোধ হয় কিছু নেই। সবই আঞ্চলিক বা দেশভিত্তিক সংস্কৃতি। তবে শ্লীল আর অশ্লীল বলে একটা ব্যাপার অবশ্যই আছে। কিন্তু তাও ‘ওয়েল-ডিফাইন্ড নয়’। যেমন মহিলাদের প্রায় উলঙ্গ হয়ে থাকা, চলাফেরা বা নাচানাচি করা আমাদের দেশে অশ্লীলতার পর্যায়ে পড়ে। কিন্তু পাশ্চাত্যে ওটা ‘এ পার্ট অব কালচার’। সংস্কৃতির একটা অঙ্গ। তাহলে কী করা যায়? মুক্তিযোদ্ধাদের স্বপ্ন ছিল তাদের ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ থাকবে না। ধনী-দরিদ্র সকলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গড়ে তুলবে স্বপ্নের বাংলাদেশ। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে, স্বাধীনতার পর থেকে দুর্নীতির ব্যাপক প্রসার এই জাতিকে সকল অর্থে পঙ্গু করে দিয়েছে। স্বাধীনতার চার দশক পরেও কোটি কোটি মানুষ বেকার, কর্মহীন। ওদের খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিত্সা, থাকার ব্যবস্থা ইত্যাদি কিছুই নেই। পক্ষান্তরে, আমাদের চোখের সামনে গড়ে উঠেছে একটি বিত্তশালী সমাজ। দেশের প্রায় ৯০% ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জায়গা-জমি, বাড়িঘর ওদের দখলে। মনে হয় ওদের জন্যই অর্জিত হয় স্বাধীনতা। বলা বাহুল্য, সত্ নেতৃত্বের অভাবে দুর্নীতিই হয়ে গেছে আমাদের দেশের রাজনীতির বৈশিষ্ট্য। বিগত ৪০ বছরে আমরা দেখতে পাই কৃষক, শ্রমিক মেহনতি মানুষের তথাকথিত নেতারা ক্ষমতায় গিয়ে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়ে গেছে। সত্ বলে মানুষ যাদের জানে তারাও ক্ষমতায় গিয়ে অসত্ হয়ে যায়। এই হলো দেশের অবস্থা।
প্রতি বছর থার্টিফার্স্ট নাইটের নামে রাজধানী ঢাকায় অপসংস্কৃতি চর্চার জোয়ার দেখে যে কোনো বিবেকবান মানুষ স্তম্ভিত হয়। সারা বছর এখানে-ওখানে নাচ-গানের আসর বসে। তরুণ-তরুণীদের উদ্দাম নৃত্যে মাতোয়ারা হয় কিছু লোক। আমাদের সভ্যতা-সংস্কৃতি, ধর্মীয় মূল্যবোধ, আবহমানকালের সাংস্কৃতিক চেতনার প্রতি এমন ভ্রূকুটি আর কতকাল সইতে হবে দেশবাসীকে?
প্রগতি, আধুনিকতা, যুগোপযোগিতা ইত্যাদির অন্তর্নিহিত অর্থ ও তাত্পর্যের সাথে ইসলামের সামান্যতম বিরোধ বা অসামঞ্জস্য নেই। যা কিছু অনুপযোগিতা পাশ্চাত্যের লোকজন দেখতে পায়, তা অজ্ঞতা এবং বিদ্বেষপরায়ণতার ফল। বোরকা আমাদের মেয়েদের স্বাতন্ত্র্য, বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদা দিয়েছে। এটা তাদের স্বাধীনতা, স্বকীয়তা কিংবা ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার কোনো প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ প্রয়াস নয়। এই বিষয়টি সুস্পষ্ট।
পক্ষান্তরে, প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের অনেক দেশে মহিলাদের প্রায় উলঙ্গ শরীর প্রদর্শনের সংস্কৃতি সেসব দেশে অশালীন সামাজিক অবস্থার বিস্তৃতি ঘটিয়েছে। বিপাকে পড়ে তারা অনেকে এখন মহিলাদের রুচিসম্মত, শালীন পোশাক পরিধানের পক্ষে মতামত রাখছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ওসব দেশে মহিলাদের প্রায় দিগম্বর হয়ে চলাফেরার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে উঠছে। এটা শুভ লক্ষণ বৈকি।
অপসংস্কৃতির প্রসার বন্ধ করতে হলে নিজেদের সংস্কৃতিকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করার ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের সংস্কৃতি এমনিতেই অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময়। কিন্তু অপসংস্কৃতির অব্যাহত প্রভাবে তা দিনে দিনে নিষপ্রভ হয়ে যাচ্ছে। যেভাবেই হোক, এ প্রবণতা বন্ধ করতে হবে।
দেশবাসীর ধর্মীয় মূল্যবোধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ইত্যাদির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের কোনো উদ্যোগ সরকার কিংবা অন্য কোনো মহলের পক্ষ থেকে নেয়া হচ্ছে না। কাজেই লক্ষ্যহীনভাবে এগিয়ে চলেছে দেশ। কোথায় আমাদের গন্তব্য তা নির্দিষ্ট করা নেই। তাই জাতি হিসেবে আমাদের যাত্রা অনিশ্চিতের পথে। এই যাত্রা ভয়ঙ্কর, বিপজ্জনক।
লেখক:হূদরোগ বিশেষজ্ঞ ও প্রাবন্ধিক
ইমেইল: dr.rezaul2009@gmail.com