[ অ র্থ নী তি ]

জ্বালানির দাম বৃদ্ধি দ্রব্যমূল্য বাড়াবে

বর্তমান সরকার ৩ জানুয়ারি ২০১৩ থেকে তাদের চার বছর মেয়াদে এবারসহ মোট সাতবার জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করলো। তবে দু’বছরের ব্যবধানে সাতবারের মতো মূল্য বৃদ্ধি অনেকের কাছে নিতান্তই অনভিপ্রেত বলে মনে হয়েছে। কৃষি মৌসুমে ডিজেলের দাম বৃদ্ধি কৃষি উত্পাদনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে বলে অনেকেই এক্ষণে মূল্য বৃদ্ধি করা থেকে বিরত থাকতে সরকারকে সতর্ক করেছিল। কিন্তু সরকার বোধ হয় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের চাপের মুখে অসহায়বোধ করছিলো। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে এ মূল্য বৃদ্ধির ফলে দ্বিতীয় কিস্তির ১৪ কোটি ১০ লক্ষ ডলারের প্রাপ্তির পথ সুগম হলো বলে মনে হয়। এ কারণেই সরকার দ্রুত অনুরূপ একটি জটিল সিদ্ধান্ত নিতে কুণ্ঠাবোধ বা বিলম্ব করেনি, যদিও সংসদ অধিবেশনে এ জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাই ছিল সমীচীন। যেহেতু জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে জ্বালানি খাতে ৬০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে বলে অর্থমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, তাই তার অন্যথা হলে সংসদকে অবহিত করাই সঙ্গত। কোন প্রেক্ষাপটে এ জাতীয় নির্বাহী আদেশে রাত ১২টা থেকে কার্যকর করা হলো তার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করলেই সংসদের মর্যাদা বৃদ্ধি হতো এবং সংসদীয় গণতন্ত্রের উত্কর্ষ বৃদ্ধিসহ জাতীয় সংসদকে সকল সিদ্ধান্তের কেন্দ বিন্দু হিসাবে সঠিক আসন লাভে সক্ষম হতো বলে অনেকেই মনে করেন। এবারের মূল্য বৃদ্ধি আপাতত অনেক বেশি মনে হলেও সরকারকে ডিজেলের জন্য প্রতি লিটারে ১১.৫৭ টাকা এবং কেরোসিনের জন্য প্রতি লিটারে ১২.১৫ টাকা ভর্তুকি দিতে হবে এবং এ জাতীয় সিদ্ধান্ত ও তার ফলশ্রুতিতে যে ৮,৫০০ কোটি টাকার ভর্তুকি দিতে হবে তার পরিমাণ প্রায় ২৫০০ কোটি টাকা হ্রাস পাবে বা সরকারের সাশ্রয় হবে । আন্তর্জাাতিক মুদ্রা তহবিল পেট্রোলিয়ামজাত দ্রব্যের মূল্য ১০ টাকা বৃদ্ধির জন্য সুপারিশ করেছিল বলে শোনা যায় । কিন্তু সরকার অকটেন এবং পেট্রোলের মূল্য প্রতি লিটারে মাত্র ৫ টাকা বৃদ্ধি করেছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, সরকার ২০১০-২০১১ এবং ২০১১-২০১২ সালে জ্বালানি তেলের বিশ্বব্যাপী মূল্য বৃদ্ধির ফলে এবং কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্ল্যান্টসমূহকে সহায়তা দেবার লক্ষ্যে ১২ হাজার ৫শ ৪৯ কোটি টাকার ঋণ ও বন্ড বাজারে ছেড়েছিল। সরকারকে উন্নয়ন কাজ অব্যাহত রাখতে হবে, যার প্রধান উপাদান হচ্ছে জ্বালানি, যার অপর নাম শক্তি, যা উন্নয়নের ধারক ও বাহক। তাই জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন হওয়ার ঝুঁকি সরকার নিতে পারে না এবং একই সঙ্গে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডও ব্যাহত হতে দিতে পারে না। বলা যায়, এ হচ্ছে সরকারের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। একদিকে অর্থের সঙ্কট, অপরদিকে জনপ্রিয়তা হ্রাসের অধিক সম্ভাবনার মাঝে অর্থনৈতিক প্রগতির ধারাকে অব্যাহত রাখার কঠিন পরীক্ষা। তবে এ সিদ্ধান্তের ফলে সরকারের জন্য সামষ্টিক অর্থনীতির ব্যবস্থাপনা জটিল আকার ধারণ করবে, এতে কোন সন্দেহ নেই । জ্বালানি তেলের মূল্য বছরের পর বছর বৃদ্ধি পাবে, এ কোন নতুন কথা নয় । বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে গরিব কৃষক, সাধারণ নাগরিকের জীবনে মূল্যস্ফীতির কি প্রতিক্রিয়া হবে এবং সরকার কিভাবে তার মোকাবিলা করবে এবং কখন কি পরিমাণ মূল্য বাড়ানো সঙ্গত হবে, তার নাম হচ্ছে বিচক্ষণতা বা দেশদরদী গণতান্ত্রিক সরকারের দক্ষতার পরিচয়। যেমন এবার পেট্রোল ও অকটেনের দাম ৫ টাকা এবং কেরোসিন ও ডিজেলের দাম ৭ টাকা বাড়ানো হয়েছে। কেরোসিনের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়া গরিব গ্রামীণ মানুষের জীবনকে অধিকভাবে প্রভাবিত করবে এবং ডিজেলের দাম কৃষক ও গরিব চাষিদের জীবনে নানান বিড়ম্বনার সূত্রপাত ঘটাবে এমন আশঙ্কা করছেন প্রায় সকলে । তাই অনেকের প্রত্যাশা ছিল বর্তমান বোরো মৌসুমে ডিজেলের দাম বাড়ানো হবে না । কিন্তু সরকার এখানে বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে পারেনি বলে অনেকেই মনে করেন । এ মূল্য বৃদ্ধির ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতির মাত্রা বৃদ্ধি পাবে এবং এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সমগ্র অর্থনীতিতে । জিনিসপত্রের মূল্য বাড়বে, যানবাহনের ভাড়া বাড়বে, শিল্প-কারখানায় উত্পাদিত পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাবে। স্বল্প ও নির্ধারিত আয়ের মানুষের নিত্যনৈমিত্তিক জীবনধারণের ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। ফলশ্রুতিতে জনগণের মনে সরকার সম্পর্কে বিরূপ মনোভাব পড়ার সম্ভাবনা আছে। উল্লেখ্য, বর্তমানে নানান ধরনের প্রশাসনিক ব্যর্থতার কাহিনী জনগণের মধ্যে এমনিতেই সরকারের দক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে আছে । দ্রব্যমূল্যের বিরাজমান ব্যাপক ঊর্ধ্বগতি এমনিতেই মানুষের জীবনে অসহায় অবস্থার সৃষ্টি করেছে। অনেকেই দারুণভাবে উত্কণ্ঠিত । জীবন আর যেন চলছে না। তার উপর পুনরায় মূল্যবৃদ্ধি অসহনীয় অবস্থার সূচনা করবে বলে অর্থনীতিবিদদের ধারণা। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আয় নির্ধারিত এবং তারাই হবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শ্রেণী এবং তারাই আবার বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে সর্বদা থাকে সোচ্চার । এ মূল্য বৃদ্ধি কৃষি খাতের উপর প্রভাব ফেলবে এবং কৃষি উত্পাদনকে ব্যাহত করবে এতে কোন সন্দেহ নেই । তাই এ মূল্য বৃদ্ধি হবে দেশের জনগণের অধিক ক্ষতিকর এক পদক্ষেপ এবং এজন্য সরকারকে দিতে হবে অনেক প্রশ্নের উত্তর। অনেকে ইতোমধ্যে প্রশ্ন করেছেন যে, জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির ফলে সরকারের যে অর্থের সাশ্রয় হবে তা কোন খাতে ব্যবহূত হবে, সরকারকে একথা পরিষ্কারভাবে বলতে হবে। উদ্বৃত্ত অর্থ ব্যয়ে সরকারের স্বচ্ছতা আছে একথা জনগণকে জানাতে হবে, বুঝতে দিতে হবে বিভিন্ন গণমাধ্যমের দ্বারা । জাতীয় সংসদ যেহেতু তেমনটা কার্যকর বর্তমানে নেই, তাই জনগণকে জানতে দিতে হবে এ অর্থ দলীয় প্রচারণা বা মিটিং-মিছিলে ব্যয় হবে কিনা । ব্যয়ের ক্ষেত্র সম্পর্কে আভাস দিতে হবে। কারণ সরকার দেশে যেভাবে মিটিং-মিছিল করছে তাতে তাদের অর্থের উত্স নিয়ে বা অর্থ জোগনদার কারা এ নিয়ে জনগণের মধ্যে নানান প্রশ্ন ইতোমধ্যে দেখা দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, বিদ্যুত্ খাতে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে সন্দেহ নেই । সরকার প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু কুইক রেন্টাল কোম্পানিসমূহকে কি পরিমাণ অর্থের জোগান বা ছাড় দিতে হয়েছে বা দিতে হবে ভবিষ্যতে এবং তার বিনিময়ে সুবিধা প্রাপ্তির পরিমাণ কতটুকু এ বিষয়টিও পরিষ্কার হওয়ার প্রয়োজন আছে। সহজ করে বলা বাঞ্ছনীয় যে, জনগণ অনেক বেশি কষ্ট স্বীকার করতেও রাজি আছে, যদি তারা দেখতে পায় জনগণের এ আত্মত্যাগ বা কষ্টার্জিত অর্থের ব্যয় জাতির বৃহত্তর স্বার্থে বিনিয়োগ হচ্ছে এবং এ ব্যয় নির্বাহে কোন প্রকার দুরভিসন্দ্ধি নেই বা অপব্যয় হবে না। তাই জাতীয় সংসদের মাধ্যমে বিতর্কের মাঝে এ মূল্য বৃদ্ধি হলে জনগণের মনে সন্দেহ দূরীভূত হতে সহজ হতে পারতো। এ জাতীয় একটি সিদ্ধান্ত যা দেশের সকল স্তরের জনগণকে সম্পৃক্ত করে বা প্রভাবিত করে তাতে অধিকতর পরিচ্ছন্নতা থাকা হচ্ছে একান্তই কাম্য। তবে একথা অনস্বীকার্য যে, বর্তমান জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করবে এবং বর্তমান বাজারমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, যা জনজীবনে দারুণভাবে প্রতিফলিত হবে । সরকারকে দেখতে হবে কিভাবে এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে এবং মানুষের মনে আস্থার ভাব সৃষ্টি করা সহজ হবে। লেখক:সাবেক সচিব