সদ্য-সমাপ্ত বছরটিতে কেমন ছিল বিশ্ব?

সদ্য সমাপ্ত ২০১২ সনে বিশ্ব কেমন ছিল? স্থানে-স্থানে সহিংসা, হানাহানি, লাঞ্ছিত-বঞ্চিত মানবতার করুণ আর্তি দেখিয়া নৈরাশ্যবাদীরা বলিতে পারেন বিগত বত্সরটিতে বিশ্ব রসাতলে যাইবার উপক্রম হইয়াছিল। আশাবাদীরা বলিতে পারেন যে, বত্সরটিতে বিশ্বজুড়িয়া কেবল খারাপ ঘটনাই যে ঘটিয়াছে তাহা নহে, সংখ্যাতে-মাত্রাতে কম হইলেও ইতিবাচক ঘটনা ঘটিয়াছে বৈকি। আশাবাদী বা নৈরাশ্যমুখীদের কেহই ভ্রান্ত নহেন। বিশ্ব জুড়িয়া ২০১২ সন ধরিয়া হতাশা-বিষ্মিত-স্তম্ভিত-ক্ষুব্ধ-অপমানিত বোধ করিবার মত অনেক ঘটনাই ঘটিয়াছে। আবার উল্টাদিকে আনন্দিত-আশান্বিত হইবার মত, মানবতার জয় ঘোষণা করিবার মত ঘটনাও ঘটিয়াছে বিশ্বে। সদ্য-সমাপ্ত বত্সরটিতে বৈশ্বিক হিসাবে ধরিলে আরব বসন্তের ছন্দপতনকেই সর্বাপেক্ষা হতাশাকর বলিয়া ধরিয়া লওয়া যাইতে পারে। এই বত্সরটিতে স্বৈরাচারমুক্ত একাধিক আরব দেশে গণতন্ত্রবিরোধী শক্তি নির্বাচনে জিতিয়া গণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতাতে আসীন হইয়াছে। অপরদিকে ২০১১ সালে যে ভীতির মধ্যে পড়িয়াছিলেন, ২০১২ সাল নাগাদ তাহা হইতে বহুলাংশে মুক্তি পাইয়া গিয়াছেন আরবের অন্যান্য অগণতান্ত্রিক শাসককূল। কোথাও কঠোর দমননীতি, কোথাও সুবিধাবন্টন, কোথাও প্রধান শক্তিমান রাষ্ট্রের প্রচ্ছন্ন আশীর্বাদে ক্ষমতা নিরাপদ করিয়া ফেলিয়াছেন তাহারা। গৃহযুদ্ধ প্রকটতর হইবার মধ্য দিয়া আরব তথা সারা বিশ্বে শান্তি বিঘ্নিত করিয়াছে সিরিয়া। ফিলিস্তিন সঙ্কট উত্তরণের তেমন কোন আলামত দেখা যায় নাই বিগত বত্সরে। সুদীর্ঘকাল ধরিয়া সামরিক শাসকদের যাঁতাকলে থাকা মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এই দুই বৃহত্ শক্তির যাঁতাকলে পড়িয়া বত্সরের দ্বিতীয়ার্ধের দিক হইতে কেমন ম্লান হইতে শুরু করিয়াছিল। দেশটিতে জাতিগত সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদিগের উপরে ব্যাপক নির্যাতনের ঘটনাও বিশ্ববিবেককে ভালোভাবে নাড়া দিয়াছে ২০১২। দীর্ঘদিন ধরিয়া অভ্যন্তরীণ সহিংসাতে জর্জর অনেকগুলি রাষ্ট্রেই ২০১২ সালেও শান্তির দিশা মিলে নাই। একটি উদাহরণ, কঙ্গো। বলিতে গেলে এক শতক ধরিয়া অভ্যন্তরীণ সমস্যাতে মুহ্যমান রাষ্ট্রটি বিগত বত্সরটিতেও হানাহানিতে নিমজ্জিত ছিল। আফ্রিকার অপর একটি রাষ্ট্র মালিতেও বত্সরব্যাপী তান্ডব দেখা গিয়াছে। সামরিক অভ্যুত্থান, উগ্র ধর্মবাদী আগ্রাসন সবকিছুই দেখা গিয়াছে রাষ্ট্রটিতে। গত কয়েক বত্সরে চমকপ্রদ রাজনৈতিক উন্নয়নকারী রাষ্ট্র নেপালে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষগুলির মতানৈক্যের কারণে তৈরি হইয়াছিল রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও শাসনতান্ত্রিক শূন্যতা। পাকিস্তানে অব্যাহত থাকিয়াছে ধর্মীয় উগ্রবাদী আস্ফাালন, যাহা রাষ্ট্রটির অখন্ডতা সম্পর্কে নূতন করিয়া প্রশ্ন তুলিয়া দিয়াছিল ২০১২ সালে। অন্যতম বৃহত্ রাষ্ট্র রাশিয়াতে দেখা গিয়াছিল গণতন্ত্রের বিপর্যয়। রাষ্ট্রক্ষমতাধারীরা নানাপ্রকারে বত্সর জুড়িয়াই বিরোধীপক্ষের বিরুদ্ধে কড়া দমননীতি পরিচালনা করিয়াছে। প্রধান শক্তি যুক্তরাষ্ট্র ২০১২ সনেও আপন স্বার্থের ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নানাবিধ সমীকরণের নিরিখেই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ভূমিকা রাখিয়াছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মওসুমে প্রধান দুই প্রার্থীর জায়নবাদী ইসরায়েলের পক্ষাবলম্বনের প্রতিযোগিতা ইহার একটি উদাহরণ মাত্র। বিগত বত্সরের নৈরাশ্যের তালিকা চাহিলে আরও অনেক লম্বা করা যাইবে বৈকি। কিন্তু আমরা আশাবাদী হইবার মত কতিপয় ঘটনা উল্লেখ করাও আবশ্যক জ্ঞান করিতেছি। বত্সরের একেবারে শেষের দিকে আসিয়া ফিলিস্তিনী জনগণের আন্দোলনের প্রধান শক্তি ও পশ্চিম তীর নিয়ন্ত্রণকারী ফাতাহের সহিত প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি ও গাজা নিয়ন্ত্রণকারী হামাসের মধ্যে কিছুটা হইলেও বন্ধুত্ব লক্ষ্য করা গিয়াছে। ইহা অব্যাহত থাকিলে ২০১৩ সাল ফিলিস্তিনের জন্য ঐতিহাসিক একটি বত্সর হইয়া উঠিতে পারে। আফগানিস্তানে তালেবানী ও সাম্রাজ্যবাদী উভয় তত্পরতাই কিছুটা হইলেও কমিয়াছিল ২০১২ সালে। রণক্লান্ত এই দেশ তথা গোটা বিশ্বের শান্তির জন্যই ইহা ছিল কিছুটা হইলেও স্বস্তিকর। ২০১২ সালে যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিরুদ্ধে কয়েকটি মাইলফলক রচিত হইয়াছে বিশ্বে। সিয়েরালিওনে দশকব্যাপী গৃহযুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ সংঘটনের দায়ে এপ্রিল মাসে লাইবেরিয়ায় চার্লস টেইলরের ৫০ বত্সর কারাদন্ড হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সাবেক কোন রাষ্ট্রপ্রধানের প্রথম এইভাবে সাজা হইল। গত শতকের নব্বুইয়ের দশকে বসনিয়া-হারজেগোভিনাতে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের হোতাদের বিচারও গতি পাইয়াছে বিগত বত্সরে। বাংলাদেশেও একই প্রক্রিয়া শুরু হইয়াছে ২০১২ সালে। এভাবে দেখিলেও সদ্য-সমাপ্ত বত্সরটিকে কোনভাবেই হতাশাপূর্ণ নিষ্ফল বলা যাইবে না।  লেখক : শিক্ষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।