অপ্রকাশিত রচনা থেকে
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এবং পরবর্তী প্রজন্ম
প্রকাশ : ০৫ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:৫৩
১৯৭১ সাল। মুক্তির নেশায় পাগল তখন আমরা, বাঙালিরা। যেভাবেই হোক পাকিস্তানিদের হটাতেই হবে। প্রতিটি ভোরের কোমল সূর্য উঠবে শুধু আমাদেরই জন্য। চোখে শুধু তখন স্বপ্ন—স্বাধীনতার স্বপ্ন। মনে পড়ে, অমাবস্যার সেই রাতের কথা। ২৫ মার্চের সেই ভয়াল রাতটি। পাকিস্তানি সৈন্যদের বিকৃত বিভত্স রূপ দেখে এক কঠিন সংকল্প এসে দানা বাঁধলো মনে। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে আমাদের। এখন শুধু সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া। বসে থাকলে চলবে না। ঢাকা ছাড়তে হবে যে করেই হোক। ২৫ মার্চের পরের দুদিন ছিল কারফিউ। তৃতীয় দিন কারফিউ ভাঙার পর নদীপথে ঢাকা ছাড়লাম। শুরু হল এক দুঃসহ যাত্রা। তিনদিন অবর্ণনীয় কষ্টের পর আমরা গ্রামের বাড়ি পৌঁছলাম। পাবনার আতাইকুলার রঘুনাথপুরে আমার গ্রামের বাড়ি। সেখানকার আশপাশে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা আর পুলিশদের সঙ্গে পাকিস্তানি আর্মিদের সংঘর্ষ চলছিল তখন। সংঘর্ষে পাকসেনারা পরাজিত হয়। এলাকার পুরো দখল চলে আসে বাঙালিদের হাতে। কিন্তু এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় আবার অবস্থার পরিবর্তন হয়। বিপুল সংখ্যক সৈন্য পুনরায় আক্রমণ করে। যেসব জায়গায় তারা পরাজিত হয়েছিল সেগুলো ফের দখল করে নেয়। পুরো উত্তরবঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে পাক আর্মি। নিরাপত্তার কারণে পরিবারসহ আমি রঘুনাথপুর ত্যাগ করি। আশ্রয় নেই আরো প্রত্যন্ত এলাকায়। জুন মাসের দিকে অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়। তখন পাবনা শহরে ফিরে আসি। আমার ফ্যাক্টরিতে সে সময় কিছু অবাঙালি কাজ করতো। তারা বেশিরভাগই ছিল পাকিস্তানি অথবা আফগানিস্তানি। আমি ফিরে আসার পর ওরাই আমার নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে। এরপর বিভিন্নভাবে আমরা মুক্তিবাহিনীকে সাহায্য করা শুরু করি। আমার তৃতীয় ছেলে অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু ইতোমধ্যে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছে। পিন্টুই সম্ভবত ছিল কনিষ্ঠতম মুক্তিযোদ্ধা। তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৭ বছর। আমরা সাহায্য করতাম তখন ওষুধ দিয়ে, খাবার দিয়ে, কখনো বা আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা দিয়ে। কাজগুলো করতে হতো খুব গোপনে। কারণ সময়টা ছিল খুব কঠিন। আর্মিরা যাদের বিন্দুমাত্র সন্দেহ করতো সঙ্গে সঙ্গে ধরে নিয়ে সোজা মেরে ফেলতো। গোপনীয়তা রক্ষার ব্যাপারে তখন স্থানীয় প্রশাসন আমাকে যথেষ্ট সাহায্য করেছেন। এছাড়াও আমার পশ্চিম পাকিস্তানি কর্মচারীরা তো সাহায্য করেছেই। এভাবে কেটে গেল কয়েকটি মাস এভাবেই একের পর এক বিভিন্নভাবে সাহায্য করেছি। বাধা এসেছে প্রচুর। এমনকি জীবনেরও। তবু পিছু হটিনি। বিভিন্নভাবে বিভিন্ন উপায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করাই ছিল আমার ব্রত।
এই সময়টাতে দাঁড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী প্রজন্মের দিকে তাকালে আমার কষ্ট হয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংস করে দেয়ার প্রয়াস বিভিন্নভাবে তাদের মাঝে চালানো হয়েছে। সত্যিকার অর্থে মুক্তিযুদ্ধের সময় বুদ্ধিজীবী শ্রেণীকে হত্যা করে দেশে পরবর্তী প্রজন্মকে পঙ্গু করে দেয়া হয়েছে। পাকিস্তানিরা শুধু বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি, দেশের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের একটা বিরুদ্ধ দল ও তৈরি করে দিয়েছে। তারা সংগঠিত হয়ে এই প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের মূল লক্ষ্য থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। এটা জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক। একটা কথা এখানে বলা প্রয়োজন, মুক্তিযুদ্ধের পর পরই আমরা কিন্তু একটা প্রজন্মকে হারিয়েছি। মুক্তিযুদ্ধ যারা করেছিল তাদের শতকরা ৮০ ভাগ ছিল যুবক। যাদের বয়স ১৬ থেকে ১২-এর মধ্যে। এই প্রজন্মকে আমরা হারিয়েছি। কারণ যুদ্ধ শেষে তারা ফিরে আসার পর তাদের সঠিক পুনর্বাসন আমরা করতে পারিনি। সে কারণে পথহারা হয়ে হারিয়ে গেছে তারা। হারিয়েছি আমরা একটা মূল্যবান প্রজন্ম। জাতির জন্য এ এক অপূরণীয় ক্ষতি। তাই ভয় হয় আমাদের প্রজন্ম না পথহারা হয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে দূরে সরে গিয়ে লক্ষ্যচ্যুত হয়ে যেতে পারে তারা। এক্ষেত্রে এই প্রজন্ম যদি আমাদের দোষারোপ করে, আমাদের ভুল বুঝে, তাহলে তাদের দোষ দিতে পারি না। ব্যর্থতা আমাদেরই। তবে তাদের জানতে হবে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে। সঠিক ইতিহাস পড়তে হবে। একটা কথা এই প্রজন্মকে মনে রাখতে হবে, পাকিস্তানিদের দেশ ছাড়া করতে যতোটা না রক্ত দিতে হয়েছে তার চাইতে বেশি রক্ত দিতে হয়েছে বাংলাদেশ গড়তে। এই প্রজন্মকে মনে রাখতে হবে, যে মুক্ত জীবন তাদের দেয়া হয়েছে, যে মুক্ত পরিবেশ তারা ভোগ করেছে এর পেছনে আছে অনেক নির্যাতন, অনেক রক্ত, অনেক আর্তচিত্কার। এসব কিছু যেন বৃথা না যায়। এসব ত্যাগ থেকে শিক্ষা নিয়ে যেন এই প্রজন্ম সুন্দর বাংলাদেশ গড়তে পারে—এটাই একান্ত কামনা।
অনুলিখন :স্বরূপ সোহান