হাছন রাজার স্মৃতি
প্রকাশ : ০৬ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:০৭
সিলেটে মরমি কবি হাছন রাজার বাড়িটি বর্তমানে অবহেলা ও অযত্নে পড়িয়া রহিয়াছে। প্রতিদিন বহু মানুষ বিভিন্ন অঞ্চল হইতে বাড়িটি দেখিতে আসেন। কিন্তু তাহারা দারুণভাবে হতাশ হন। কেননা পুরাতন ঘরের ধ্বংসাবশেষ আর কিছু খালি জায়গা ব্যতীত সেখানে দেখার কিছুই নাই। দর্শকদের একদন্ড বসার জন্য নাই কোন সুব্যবস্থা। হাছন রাজা তাহার একটি গানে লিখিয়াছেন, ‘ লোকে বলে, বলেরে ঘর-বাড়ি ভালা না আমার,/ জানতো যদি হাছন রাজা বাঁচব কতদিন/ বানাইতো দালান-কোঠা করিয়া রঙিন।’ তাহার এই বিখ্যাত গানটির ন্যায় এখন তাহার নিজের বাড়িটিরও করুণ দশা। ভাঙ্গা বাড়িটি সংস্কারের নাই কোন উদ্যোগ। সত্যিই হাছন রাজার বাড়িটির অবস্থা ‘ভালা না’।
ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ ও দেখভাল করার জন্য আমাদের দেশে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রহিয়াছেন। তাহাদেরই সবকিছু নজরে রাখার কথা। কিন্তু তাহারা সেই দায়িত্ব সুচারুভাবে পালন করিতেছেন বলিয়া মনে হয় না। হাছন রাজার স্মৃতিধন্য বাড়িটিকে ঘিরিয়া পর্যটন কেন্দ্রও গড়িয়া উঠিতে পারে। এখানে গড়িয়া উঠিতে পারে পাবলিক লাইব্রেরি ও মিউজিয়াম। হাছন রাজা একজন মরমী কবিই শুধু ছিলেন না, ছিলেন একজন জমিদারও । তিনি সহজ-সরল সুরে ও আঞ্চলিক ভাষায় প্রায় এক হাজার গান লিখিয়া গিয়াছেন। তাহার এই গানগুলি এক অমর কীর্তি। আমাদেরকে এখনও তাহা আকুল ও ব্যাকুল করিয়া তোলে। গানগুলি আজও প্রাসঙ্গিক ও তুমুল জনপ্রিয়। তিনি প্রথম জীবনে সৌখিন ও ভোগবিলাসী ছিলেন। কিন্তু পরিণত বয়সে সকল কিছুকে তুচ্ছ করিয়া দরবেশি বা বৈরাগ্য জীবন বাছিয়া নেন। তাই গানের ভনিতায় তিনি নিজেকে ‘উদাসী’, ‘দেওয়ানা’, ‘বাওলা’ ইত্যাদি বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন। তাহার নিকটতম পূর্বপুরুষ ছিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী। ফলে তাহার গানে এমন আধ্যাত্মিক ভাবধারার পরিচয় পাওয়া যায় যাহা হিন্দু-মুসলিম উভয়কেই টানে।
লোকজ গান ও সুরের মধ্যে আমাদের হূদয়ের টান বা আকর্ষণ রহিয়াছে। সুতরাং এসব গানের রচয়িতাদের অবহেলা ও অনাদর করা যায় না। মরমি সাধক হাছন রাজা ১৮৫৪ সালে সিলেটের সুনামগঞ্জের অন্তর্গত লক্ষণশ্রী গ্রামের এক জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শুধু হাছন রাজা নহে, এমন আরও অনেক বরেণ্য মনীষী আছেন যাহাদের স্মৃতিময় স্থান ও কীর্তিকর্মকে আমরা অবহেলা করিয়া চলিয়াছি। ‘বিষাদসিন্ধু’ খ্যাত লেখক মীর মোশাররফ হোসেন কিংবা ‘আনোয়ারা’ খ্যাত ঔপন্যাসিক মুুজিবুর রহমান সাহিত্যরত্নের বাড়ি বা স্মৃতিচিহ্নগুলির কী অবস্থা তাহার ব্যাপারে খোঁজ-খবর নেওয়া প্রয়োজন। ত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে এবং শাহজাদপুরে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামেও একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা প্রক্রিয়াধীন রহিয়াছে। এসব উদ্যোগ-আয়োজন আমাদের অবশ্যই আশান্বিত করে। পরক্ষণে হাছন রাজার বাড়ির দুর্দশা দেখিয়া আমরা মর্মাহত না হইয়া পারি না। সাধারণত এসব মনীষীর স্মৃতিচিহ্ন রক্ষায় সর্বাগ্রে স্থানীয় অধিবাসীরাই আগাইয়া আসেন। একসময় সরকার পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে। যেমন পতিসরে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি রক্ষায় এমনটিই ঘটিয়াছে। কিন্তু হাছন রাজার এলাকার গণ্যমান্য ও ধনবান-হূদয়বান ব্যক্তি, ইউনিয়ন বা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও এমপিরা কোথায়? এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ তাহাদের ভূমিকা দেখিতে চাহে। মোদ্দাকথা, এলাকার মানুষ আগে সোচ্চার ও সচেতন না হইলে কোন দাবি সহজে আদায় করা যায় না। আমরা আশা করি, মরমি কবি হাছন রাজার বাড়িটি সরকারি-বেসরকারি উভয় উদ্যোগে সংরক্ষণের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হইবে।