[ রা জ নী তি ]
হরতালে সরকারের পতন হয় না
প্রকাশ : ০৬ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:০৭
অতিসমপ্রতি সারাদেশে দিনব্যাপী দুটো হরতাল হয়ে গেল। এ ছাড়া বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর ডাকে আঞ্চলিক হরতালও হয়েছে। দুটি হরতালের একটি ডেকেছিল জামায়াতে ইসলামী প্রধানত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বিচারাধীন তাদের নেতাদের মুক্তির দাবিতে। আর সে হরতালে নৈতিক সমর্থন জানিয়েছিল বিএনপি। দ্বিতীয় হরতালটি গত ৬ জানুয়ারি পালিত হলো বিএনপির ডাকে। এবার ইস্যু ছিল সরকারের জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে। বিএনপি আগেই ঘোষণা দিয়েছিল সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করলে তারা প্রতিবাদে হরতাল ডাকবে। এই সূত্রে হরতাল ডেকে বিএনপি কথা রেখেছে। সকল হরতালেই, তা সে যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তির দাবিতেই হোক বা জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদেই হোক হরতালকে আহবানকারীরা জনস্বার্থেই করেন বলে বক্তব্য রাখেন।
উল্লিখিত দুই হরতালকে যদি সাধারণ চোখে বিচার করি তা হলে প্রথমটি নিয়ে বিতর্ক থাকবে। হরতালকারীদের প্রধান ইস্যুটিকে সাধারণ বিবেকবান মানুষ সমর্থন করবে না। কারণ যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত বিচার একটি চলমান আইনী প্রক্রিয়ার বিষয়। জামায়াতে ইসলামী এই বিচার বর্জন করেনি। অভিযুক্তদের পক্ষে তাদের আইজীবীরা লড়ে যাচ্ছেন। সুতরাং এই সকল অভিযুক্তদের বিচারের মাঝপথে মুক্তি চাওয়া শুধু বেআইনী নয়, অন্যায়ও। বিএনপি কি মনে করে এই অন্যায়ের সাথে নিজেকে শামিল করলো তা বিএনপিই ভালো বলতে পারবে। সাধারণ মানুষ শুধু অনুমান করতে পারে! এরকম একটি হরতালে জনস্বার্থের কোনো প্রশ্ন থাকতে পারে না। আর এর মধ্য দিয়ে সরকারকে দুর্বল করার চিন্তাও বৃথা। এই হরতালের আগের দিন ও হরতালের দিনে গাড়ি ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও মানুষের ভোগান্তির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত ছিল হরতাল আহবানকারীদের। অবশ্য নষ্ট রাজনীতির এদেশে তেমন আশা করা বাতুলতা।
৬ জানুয়ারি হরতাল ইস্যুটি নিশ্চয়ই জনস্বার্থের সাথে যুক্ত। সরকারের পঞ্চমবারের মত মূল্য বৃদ্ধি মানুষকে ক্ষুব্ধ ও হতাশ করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যবৃদ্ধির দোহাই দিয়ে সরকার সব সময় বর্ধিত মূল্য চাপিয়ে দেয় সাধারণ মানুষের ঘাড়ে। কিন্তু এবার আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধির ঘটনা ঘটেনি। দেশীয় বাজারে মূল্য বৃদ্ধি ঘটলো। সরকারি সাফাই বক্তব্য হচ্ছে, সরকারের ভর্তুকি কমানোর জন্য মূল্য বৃদ্ধি। এখানেও জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। কুইক রেন্টাল প্ল্যান্ট করে সরকার বিদ্যুতের ক্ষেত্রে কুইক সাফল্য অর্জন দেখাতে চেয়েছে। কিছুটা দেখিয়েছেও। কিন্তু তার বিনিময়ে আর্থিক খেসারত আদায় করে যাচ্ছে বিদ্যুত্ গ্রহীতা ছাড়াও সাধারণ দেশবাসীর কাছ থেকে। বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির সাথে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধিও জড়িত। আর এর সাথে জড়িত কৃষকের সেচ, পরিবহন সেক্টর এবং পণ্য দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি। অন্যদিকে জনপ্রচলিত কথা হচ্ছে কুইক রেন্টালের সাথে রয়েছে কমিশন বাণিজ্য, দলীয় বণিকদের বিশেষ সহযোগিতা করার মত দুর্নীতি।
সুতরাং নানা অপকর্মের দায় শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে এবং আইএমএফের মত সংস্থার প্রেসক্রিপশন মেনে মানুষকে কষ্টে ফেলার বিষয়টিকে সামনে এনে যদি হরতাল ডাকা হয় তবে নিশ্চয়ই এর সাথে জনস্বার্থের বিষয়টি জড়িয়ে থাকে।
কিন্তু আমাদের প্রশ্ন অন্য জায়গায়। আগে জানতাম সব ধরনের চিকিত্সার পরও রোগীর অবস্থার ক্রমঅবনতি ঘটলে শেষ চেষ্টা হিসেবে কোরামিন ইনজেকশন দেয়া হতো। কিন্তু বিএনপি, জনস্বার্থের এই হরতালে চিকিত্সার শুরুতেই যেন প্রায় সবল রোগীকে কোরামিন ইনজেকশনের মত হরতাল চিকিত্সা দিয়ে ফেললো।
গত চার বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যর্থতার পাল্লা অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যকে ঢেকে ফেলেছে। যে কারণে মানুষ এখন বিদ্যুতের পাখার নিচে বসেও ঘামছে। সরকারের দক্ষতায় না হলেও পোশাক শিল্পের রফতানিতে আর প্রবাসী শ্রমিকদের ঘাম ঝরানো টাকায় দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে। কিন্তু এসব সাফল্য সাধারণ মানুষ উপভোগ করতে পারছে না। চাকরিজীবীদের বেতন নতুন করে বাড়েনি। মহার্ঘভাতা যুক্ত হয়নি। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের মুখে ব্যবসায়ের স্থবির দশার কথা শোনা যায়। কৃষক ফসল বিক্রি করে উত্পাদন খরচ উঠাতে পারছে না। সন্ত্রাস দুর্নীতির বাড়বাড়ন্ত দশা। ফলে সরকারের ব্যর্থতা অনেক ক্ষেত্রেই এখন স্পষ্ট। এই প্রেক্ষাপটে জনকল্যাণকামী রাজনৈতিক দল দাবিদার বিএনপি গণমানুষের পক্ষে কোনো আন্দোলন কি দাঁড় করাতে পেরেছে?
বিগত চার বছর ধরে বিএনপি ব্যস্ত থেকেছে সরকারকে পদত্যাগ করতে বলে বলে এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির দাবি জানাতে গিয়ে। এই দুটো বিষয়ের সাথে বিএনপির রাজনৈতিক লাভক্ষতির সম্পর্ক থাকলেও সাধারণ মানুষের যাপিত জীবনের কষ্ট লাঘবের কোনো সম্পর্ক নেই। সাধারণ মানুষ ভোট দিয়ে যে দল বা দল সমন্বয়কে সরকারে বসিয়েছে মানুষের কাছ থেকে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কোনো রায় না নিয়ে গত নির্বাচনে জনগণের ভোট না পেয়ে অনেকটা পিছিয়ে পড়া বিএনপি-জামায়াতের কণ্ঠে সরকারের পদত্যাগের দাবি শুধু অশোভন নয়—অন্যায়ও বটে।
অন্যদিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অনেক যুক্তি থাকলেও তা জনমতের প্রতিফলন হিসেবে প্রমাণিত নয়। তা ছাড়া মাঝখানে আবার আদালতের প্রসঙ্গও আছে। ফলে এই দাবিগুলো আদায়ে হরতাল ডাকার পরিপ্রেক্ষিত রচিত হয়েছে বলা যাবে না।
আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট। হরতাল আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দাবি আদায়ে একটি গণতান্ত্রিক আচরণ। একটি হরতাল পালনের সাথে জনগণের অনেক ত্যাগ স্বীকারের প্রশ্ন জড়িত। কারণ এখানে বিরোধী রাজনীতিকদের গণতান্ত্রিক চর্চা থাকে একপক্ষীয়। কারণ হরতাল পালন না করার গণতান্ত্রিক অধিকার আবার সাধারণ মানুষ ভোগ করতে পারে না। হরতালে দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। এর দায় ও প্রতিক্রিয়া বহন করতে হয় দেশের সকল মানুষকেই। পথঘাট পিকেটারদের দখলে থাকায় বা ভীতির আশঙ্কায় জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। শ্রমজীবী মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে দুর্যোগ বৃদ্ধি পায়।—তারপরও মানুষ সেই হরতাল মেনে নেয় যখন বুঝতে পারে তাদের বৃহত্তর স্বার্থের পক্ষে এ এক শেষ ধাক্কা। এতদিনের আন্দোলনে নাজুক অবস্থায় এখন সরকার। এই চূড়ান্ত ধাক্কায় সরকার পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হবে। জনস্বার্থে দাবি আদায় হবে।
কিন্তু জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধিতে বিএনপির এই হরতাল জনজীবনে সকল কষ্ট ঠিকই আরোপিত হলো কিন্তু এর বিনিময়ে কী অর্জিত হলো? অর্জন করার প্রেক্ষাপট কি রচনা করেছে বিএনপি? এই চার বছরে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি সংক্রান্ত ইস্যু নিয়ে দলটি কোনো আন্দোলন দাঁড় করায়নি। সরকার তাই কোনো চাপ অনুভব করেনি। নিজেদের দলীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় ছাড়া বিএনপির কোনো কর্মসূচি ছিল না। তাই আন্দোলনের রচনা লেখায় ভূমিকা ছাড়াই হঠাত্ করে উপসংহারে পৌঁছে গেল কেন দলটি! সরকারকে আন্দোলনে দুর্বল না করেই হরতালের মত শেষ অস্ত্র প্রয়োগ করলো। বিএনপি নেতারা হরতাল ডাকার কারণ সাংবাদিকদের বলতে গিয়ে বললেন তারা নিরূপায়। সরকার কারো কথা শুনছে না। অযৌক্তিকভাবে জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়াচ্ছে। তাই বাধ্য হয়েই তারা জনস্বার্থে এই হরতাল ডেকেছে।
কিন্তু এই হরতালে কি জনস্বার্থ রক্ষিত হলো? হরতালের আগের রাতে অনেকগুলো গাড়ি পুড়লো রাজধানীতে। আজকাল হরতালের আগের সন্ধ্যা এবং রাতে ভীতি সঞ্চার করা হরতাল আহ্বানকারীদের সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। হরতালের দিনও গাড়িতে অগ্নিসংযোগ হলো। বিপর্যস্ত হলো মানুষের জীবনযাত্রা। দেশের অর্থনীতির ক্ষতি হলো। কিন্তু এতে কী লাভ হলো? সরকার কী দুর্বল হয়ে পড়লো? আবার পরদিন অর্থত্ ৭ জানুয়ারি থেকে যথারীতি জীবন চলবে। বর্ধিত মূল্যে পেট্রোল পাম্পগুলো ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল বিক্রি করবে। কৃষক মনস্তাপ করতে করতে দিশেহারা দৃষ্টি নিয়ে ডিজেল কিনে সেচপাম্প সচল রাখবে। আওয়ামী লীগ নেত্রী বক্তৃতার মঞ্চে দাঁড়িয়ে বিএনপিকে যথারীতি বকাঝকা করতে থাকবেন আর উন্নয়নের কেচ্ছা শোনাবেন। খালেদা জিয়া একই সুরে আওয়ামী লীগের গোষ্ঠী উদ্ধার করবেন। আর নিরলসভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি জানিয়ে নানা কর্মসূচির হুমকি দিতে থাকবেন। তবে এই হরতাল দিয়ে জনগণের শরীরের তেল নিঙ্গড়ে নিয়ে সরকার পতন না হলেও বিএনপির কিছুটা লাভ হবে। তা হচ্ছে তারা সরকার বিরোধী আন্দোলনে দলীয় কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে কিছুটা উত্তেজনা তৈরি করতে পারবেন। আন্দোলনের মাঠে বিএনপির এসময়ের দুর্বল দশায় এ প্রাপ্তি মন্দ কি!
এভাবেই আমাদের সকল পক্ষের রাজনীতিকগণ জনগণকে পুঁজি করে তাদের সঙ্গে অসাধারণ নাটকীয়তায় প্রতারণা করে যার যার লভ্যাংশ ঘরে তুলতে চাইছেন। এ কারণেই হরতালের শিকার বিপন্ন মানুষ জানতে চায় হরতালে জনস্বার্থের দিকগুলো কী? কীভাবে হরতাল জনগণের দাবি আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে? বিএনপি তো দমে দমে সরকার পতনের স্বপ্ন দেখছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কবে কখন হরতাল সরকারের পতন ঘটিয়েছিল? হরতাল, দেয়ালে লেখা শ্লোগান—এগুলো ব্যর্থ বামপন্থি সংস্কৃতি ছাড়া আর কিছুই নয়।
জানি এর উত্তর দেয়া সুবিধাবাদী রাজনীতিকদের জন্য কঠিন হবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে সকল পক্ষকে এক সময় জনগণের কাছে ফিরতে হবে। জনগণের কাছে খেরোখাতা ও হালখাতা দুটোই খোলা আছে। বারবার প্রমাণিত হয়েছে সকল ক্রান্তিকালে এদেশের সাধারণ মানুষ ঠিক হিসেব করতে ভুল করেনি।
লেখক :অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
shahnawazju@yahoo.com