স্মরণ
মানিক চৌধুরী একমাত্র সিভিলিয়ান কমান্ড্যান্ট মুক্তিযোদ্ধা
প্রকাশ : ০৯ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:৫৮
মানিক চৌধুরী একমাত্র সিভিলিয়ান মুক্তিযোদ্ধা যিনি মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ‘কমান্ড্যান্ট’ উপাধি অর্জন করেন। ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের প্রতিটি নির্দেশনাকে যিনি তার জীবনের লক্ষ্য হিসাবে স্থির করেছিলেন। আর এই নির্দেশনাকে বাস্তবায়িত করতে তার নির্বাচনী এলাকায় যুদ্ধের ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। ২৬ মার্চ দিবাগত রাতে বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে (ওয়ারল্যাসের মাধ্যমে) পাওয়া তারবার্তা (যাকে ঐতিহাসিক দলিল হিসাবে স্বাধীনতার ঘোষণা পত্র বলা হয়) গ্রহণ করেন তিনি। হবিগঞ্জের অন্য নেতা-কর্মীদের সাথে এ বিষয়ে আলোচনা করে তিনি সম্মুখ সমরের জন্য প্রস্তুত হতে থাকেন। একটি দক্ষ সামরিক বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করতে যে অস্ত্রের প্রয়োজন ছিল তা বুঝতে পেরে তিনি হবিগঞ্জ সরকারি অস্ত্রাগার লুট করেন। এপ্রিলের প্রথম দিকে অংশ নেন শেরপুর সাদিপুর যুদ্ধে। মেজর জেনারেল সি আর দত্ত বীর উত্তমসহ অনেকের সাক্ষাত্কার হতে জানতে পারি, তিনি একাধারে যেমন একজন সম্মুখ যোদ্ধা ছিলেন, তেমনি ৩ নং, ৪ নং সেক্টর, সেক্টরে সৈন্য, অস্ত্র, খাদ্য সরবরাহসহ ভারতের খাৈয়াই ও কৈলাশহরের মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ প্রশিক্ষণের কাজেও দক্ষতার সহিত দায়িত্ব পালন করেছেন। তার এ বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের চীফ-অব স্টাফ মেজর জেনারেল এম, এ রব মানিক চৌধুরীকে ‘কমান্ড্যান্ট’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। ৫২-এর ভাষা আন্দোলনে, হবিগঞ্জ বৃন্দাবন কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র হিসাবে হবিগঞ্জে মাতৃভাষার আন্দোলনে অংশ নেয়ায় কারাবরণ করেন। ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে তিনি হবিগঞ্জে তৃণমূল পর্যায়ের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সফলতার স্বাক্ষর রাখেন। তার সাংগঠনিক দক্ষতার জন্যই ৭০-এর নির্বাচনে পাকিস্তানের গণ-পরিষদে এবং ৭৩-এ স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটে জয় লাভ করেন। মানিক চৌধুরীর জীবনে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অধ্যায় রচিত হয় মহান মুক্তিযুদ্ধে। যুদ্ধ শেষে তিনি বঙ্গবন্ধুর একজন বিশ্বস্ত সৈনিক হিসাবে দেশকে সোনার বাংলা গড়ার কাজে নেমে যান। ৭৩ তার নির্বাচনী এলাকা মাধবপুর বঙ্গবন্ধুর সবুজ বিপ্লবের মডেল হিসাবে নির্বাচিত হয়। যার জন্য তিনি ৭৪-এ বঙ্গবন্ধু কৃষিপদক পান। পরে তিনি হবিগঞ্জ মহকুমার গর্ভনরও নিযুক্ত হন। সহযোদ্ধা হিসাবে তত্কালীন হবিগঞ্জের এসডিও আকবর আলী খান তার একটি লেখায় (২০০৮ সালে মানিক চৌধুরীর স্মরণীকায়) মানিক চৌধুরী সম্পর্কে বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের অনেক বীর পুরুষই যথাযথ স্থান পাননি। ইতিহাসে উপেক্ষিত এই মহানায়কদের একজন হবিগঞ্জের এক সময়ের অতি জনপ্রিয় নেতা কমান্ড্যান্ট মানিক চৌধুরী। আমার অনেক গর্বের বিষয় হল তিনি আমার জন্মদাতা পিতা। আমার আব্বা। আব্বার সাথে আমার স্মৃতিগুলো খুবই অল্প সময়ের। কারণ তিনি আমার ছেলেবেলায়ই আমাকে ছেড়ে চলে যান না ফেরার দেশে। ১৯৯১ সালের ১০ জানুয়ারি আব্বা মারা যান। আজ ২২ বত্সর হতে চলেছে। আব্বা যখন বেঁচে ছিলেন তখনও তাকে অনেক বেশি কাছে পাইনি আমি। আমার জন্মের সময় আব্বা জেলে ছিলেন। ৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে স্ব-পরিবারে হত্যার পর রাজপথে প্রতিবাদের উদ্যোগ নেয়ার অপরাধে তার বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হয়। আমার বয়স যখন আট মাস, তখন কুমিল্লা জেলে আব্বা আমাকে প্রথম দেখেন। মায়ের মুখে শুনেছি, জেলের বাগান থেকে আনা একটি লাল গোলাপ হাতে দিয়ে তিনি আমার নাম রেখেছিলেন, কেয়া। সেদিন নাকি আমি আব্বার কোলে যেতে চাইনি। হয়ত প্রথম দেখেছিলাম; তাই। কিন্তুু আজ অনেক অরাজকতায় আর প্রতিকূলতায় আব্বাকে খুব কাছে পেতে মন চায়। ইচ্ছা করে দুই হাতে আব্বার মুখটা একটু স্পর্শ করি, ছুঁয়ে দেখি মহান আমার আব্বাকে।
লেখক :মানিক চৌধুরীর তনয়া
kchowdhury71@gmail.com