বিশ্ব ইজতেমা ও ধর্মপ্রচারের গুরুত্ব

আজ শুক্রবার রাজধানীর উপকণ্ঠে অবস্থিত শিল্পনগরী টঙ্গীর কহরদরিয়া খ্যাত তুরাগ নদীর তীরে তিনদিনব্যাপী ৪৯তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথমপর্ব অনুষ্ঠিত হইতেছে। গত দুই বত্সরের ন্যায় এবারও ইজতেমা অনুষ্ঠিত হইতেছে দুই পর্বে। ইজতেমা উপলক্ষে নজিরবিহীন নিরাপত্তা, সমাগত মুসল্লী ও মেহমানদের থাকা-খাওয়া, জরুরি চিকিত্সা সেবা ও পরিবহন সুবিধাসহ যাবতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হইয়াছে। এ বত্সর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ হইতে ২৫ হাজার বিদেশি মেহমান অংশগ্রহণ করিতেছেন। সব মিলাইয়া এইবার ইজতেমায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ৪০ লক্ষ ছাড়াইয়া যাইবে বলিয়া ধারণা করা হইতেছে। ইজতেমা মাঠে ইতোমধ্যে হাক্কানী ওলামায়ে কেরাম ও বুজুর্গ ব্যক্তিগণ ঈমান, আকিদা, আখিরাত ও দ্বীনের দাওয়াত সম্বলিত মূল্যবান বয়ান শুরু করিয়াছেন। বিশ্ব ইজতেমা বাংলাদেশের জন্য আল্লাহ তায়ালার এক বিশেষ রহমত ও নিয়ামত। মক্কা শরীফে পবিত্র হজ্বব্রত পালনের পর ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ইহাই বৃহত্তম সম্মেলন বা সমাবেশ। আজ হইতে ৮৯ বত্সর পূর্বে হিজরি ১৩৪৫ সালে দিল্লীর নিকটবর্তী নিজাম উদ্দিন আউলিয়ার (রহ.) মাজার সংলগ্ন মসজিদকে কেন্দ্র করিয়া মাওলানা ইলিয়াস আখতার কান্ধলভী (১৮৮৫-১৯৪৪ খ্রি.) নূতন ও যুগোপযোগী পদ্ধতিতে যে তাবলীগ বা দ্বীন ইসলাম প্রচারের সূচনা করিয়াছিলেন, তাহারই ধারাবাহিকতায় অনুষ্ঠিত হইতেছে আজকের ইজতেমা। তাবলিগ জামাতের উদ্যোগে পৃথিবীর শতাধিক দেশে নিয়মিতভাবে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হইয়া আসিতেছে। তন্মধ্যে বাংলাদেশের এই ইজতেমাই সবচাইতে বৃহত্ ও অধিক গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠিত ইজতেমায় অংশগ্রহণকারী মুসল্লীদের প্রায় অর্ধেকেই দ্বীনের মেহনতের উদ্দেশ্যে জামাত আকারে দেশ-বিদেশে একচিল্লা (৪০ দিন) কিংবা তিন চিল্লার জন্য বাহির হন। ইজতেমা তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জন, দ্বীনের তালিম গ্রহণ ও আমল-আখলাক সুন্দর করিবার এক অপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি করে। কালিমা, নামাজ, রোযা, ইলম ও যিকির, ইকরামুল মুসলিমিন, সহী নিয়ত ও দাওয়াতে তাবলিগ—তাবলিগ জামাতের এই ছয় উসুল বা মূলনীতি সম্পর্কেও সঠিক ধারণা পাওয়া যায়। মূলত বিশ্ব ইজতেমা তাবলিগ জামাতের সাংবাত্সরিক মহাসম্মেলন হইলেও ইহা এখন শুধু আর তাবলিগ কর্মীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাই। ইহার বাহিরেও লক্ষ লক্ষ মানুষ সওয়াব হাসিলের উদ্দেশ্যে অংশগ্রহণ করিতেছেন। কিন্তু তাহাদের মধ্য হইতে প্রত্যাশা অনুযায়ী ধর্ম প্রচারের জন্য মেহনতী দল বাহির হইতেছে না বলিয়া তাবলিগ জামাতের সহিত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিগণকে প্রায়শ আফসোস করিতে দেখা যায়। বস্তুত মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.) হইতেছেন আখেরী নবী। তাহার পর আর কোন নবী বা রাসূল আসিবেন না। তাই তাবলিগ বা দ্বীন প্রচারের মহান দায়িত্ব বর্তমানে উম্মতে মোহাম্মদীর উপরই ন্যস্ত। লক্ষ লক্ষ সাহাবি, তাবেয়ি ও তাবে-তাবিয়িন ও আল্লাহর ওলিগণের ধারাবাহিতকায় সেই দায়িত্ব এখন আমরা যদি সঠিকভাবে পালন না করি, তাহা হইলে এই জন্য হাশরের দিনে আমাদেরকেই জাবাবদিহি করিতে হইবে। রাসুল (সা.) বলিয়াছেন, বাল্লিগু আন্নি অলাও আয়াত অর্থাত্ ইসলামের সামান্য একটি বাণী জানিলেও তাহা আমার পক্ষ হইতে অন্যের নিকট পৌঁছাইয়া দাও। ইহাই ঈমানের দাবি। তাবলিগের ধারা বহমান আছে বলিয়াই বিশেষত ইউরোপ-আমেরিকায় ইসলাম গ্রহণকারীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়িতেছে। এই আধুনিক পৃথিবীতে ইসলাম দ্রুত সম্প্রসারণশীল ধর্মের মর্যাদা লাভ করিয়াছে। আর মুসলমানদের মধ্যেও ধর্ম প্রচার করিতে হইবে, যাহাতে তাহাদের ঈমান-আমল মজবুত হয়। বিশ্ব ইজতেমা হইতে আমাদের অনেক কিছুই শিক্ষণীয় রহিয়াছে। ইজতেমার স্বেচ্ছাসেবকরা যেভাবে মেহনত করেন তাহা সমাজ কল্যাণের জন্যও দৃষ্টান্ত স্বরূপ। এখানে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের যে পরিবেশ ও বিশেষ ধর্মাবেগ তৈরি হয় তাহাও এক কথায় অতুলনীয়। তবে আমরা যাহাতে বিদেশি মেহমানদের সর্বপ্রকার নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করিতে পারি, সেইদিকে অবশ্যই খেয়াল রাখা আবশ্যক। প্রতি বত্সরের ন্যায় এইবারও বিশ্ব ইজতেমা সর্বদিক দিয়া সফল হউক, ইহাই আমাদের কামনা।