[ রা জ নী তি ]

রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সামাজিক অনাচার

রাজনীতির সুড়ঙ্গে এখন পর্যন্ত আলোর অবশেষ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। সংলাপের যে ক্ষীণ আশা আড়ালে-আবডালে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল তাও সর্বশেষ রাজনৈতিক বাদানুবাদে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। বছরের প্রথম দিন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেছিলেন:বিএনপির সাথে গোপন সংলাপ চলছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজীনা সংলাপ চলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে নির্বাচনী ফলাফল যাই হোক মেনে নেয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এর আগেও প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছিলেন নির্বাচনে পরাজয় মেনে নেয়ার জন্যও তিনি প্রস্তুত। এসব কথায় আশান্বিত হয়েছিল মানুষ। সংলাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক অচলাবস্থা দূরীভূত হতে যাচ্ছে এরকম মনে হয়েছিল পর্যবেক্ষক মহলে। কিন্তু বছরের দ্বিতীয় দিনে সংবাদ বের হয় যে, বিএনপি চেয়ারপারসন ও বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া গোপন সংলাপের কথা দৃঢ়তার সাথে অস্বীকার করেছেন। বরং অভিযোগ করেন, তলে তলে আলোচনা নয়, ষড়যন্ত্র চলছে। তিনি বলেন, ভেতরে ভেতরে তলে তলে আলোচনায় আমরা বিশ্বাসী নই। যা কিছু আলোচনা হবে তা প্রকাশ্যে হতে হবে। বিএনপি’র সমন্বয়কারী তরিকুল ইসলামও সংলাপের কথা অস্বীকার করেন। তিনি খালেদা জিয়ার বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করেন। এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সর্বশেষ বক্তব্যে সংলাপের সম্ভাবনা আপাতত তিরোহিত হয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন। গত ৮ জানুয়ারি নোয়াখালীর জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাফ জানিয়ে দেন যথাসময়ে আওয়ামী লীগের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। প্রধানমন্ত্রী যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, বর্তমান সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সব নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে। একটি নির্বাচন নিয়েও কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেনি। আগামী নির্বাচনও যথাসময়ে এবং নিরপেক্ষ হবে। বস্তুত সংলাপ বা রাজনৈতিক সমঝোতা এমন একটি প্রক্রিয়া যা কোন আকস্মিক বিষয় নয়। এজন্য যে পরিবেশ ও পরিস্থিতি প্রয়োজন তা কেন যেন হয়ে উঠছে না। বর্তমান সঙ্কট নিরসনে সংলাপের তাগিদ সব মহলে অনুভূত হচ্ছে; কিন্তু এজন্য যারা সংশ্লিষ্ট বা যাদের মধ্যে সংলাপ শুরু করার কথা তারাই দায়িত্ব নিতে অগ্রসর হচ্ছেন না। সংলাপের পরিবেশ সৃষ্টিতে সরকারের দায়-দায়িত্বই বেশি বা তাদেরকেই প্রথম কথাটি বলতে হবে। রাজনৈতিক তথ্যাভিজ্ঞ মহল মনে করেন, এই মুহূর্তে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের মুক্তি না দেয়া একটি বড় ধরনের প্রতিবন্ধক। ফখরুল ইসলাম আলমগীর কার্যত বিএনপির পক্ষ থেকে সংলাপ সংগঠন আয়োজন এবং নির্ধারণ ক্ষেত্রে যথার্থ ব্যক্তি। প্রথমত তার পদাধিকার বলে এবং দ্বিতীয়ত তার পরিচ্ছন্ন নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে। অথচ তিনি ময়লার গাড়িতে আগুন দেয়ার মতো নাজুক অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন। বিগত ৪০ বছরে অনুসৃত রাজনৈতিক সংস্কৃতি আশানুরূপ নয় এটা সত্য; কিন্তু এতটা এগ্রেসিভ ছিল না কখনোই, যেখানে বিকল্প সরকারের প্রধান নির্বাহী ব্যক্তিত্বকে নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হতে হয়েছে। অপরদিকে সংলাপে বিরোধী দল থেকে বাধা হয়ে দাঁড়াল আহূত হরতাল। সরকার পতনের পক্ষে পরিচালিত এ সহিংস হরতাল তাদের বিব্রত করবে বৈকি! তাত্পর্যের সাথে লক্ষণীয় যে, বিএনপি সরকারবিরোধী আন্দোলনে হরতালকে সতর্কতার সাথে ব্যবহার করেছে। জনসাধারণের খোলামেলা আলাপ-আলোচনা থেকে বোঝা যাচ্ছে, এই প্রথমবার বিরোধী দল জনস্বার্থে একটি হরতাল দিয়েছে। ইতিপূর্বের হরতালগুলো যদি হয়ে থাকে ক্ষমতার স্বার্থে তাহলে এই হরতাল ছিল জনদুর্ভোগ লাঘবে। এই সর্বশেষ হরতালের বিষয়টি ছিল সরকারের আহূত (!)। বিরোধী দল আগে থেকেই বলে আসছিল যে, বিদ্যুতের দাম বাড়ালেই হরতাল। সুতরাং বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়টি দ্বিতীয়বার বিবেচনা করতে পারতো সরকার অথবা তারা ধীরনীতি অবলম্বন করে ‘হরতাল সিরিজ’ অতিক্রম করতে পারতো। অর্থনৈতিক স্বার্থ-সমীক্ষা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) মন্তব্য করেছে, এ মূল্যবৃদ্ধি অনিবার্য ছিল না। লক্ষণীয়, সরকারের প্রকারান্তরে সমর্থক বামধারাও ১৬ জানুয়ারি হরতাল ঘোষণা করেছে। বামধারার হরতালের প্রতি ইতিপূর্বে সরকার পরোক্ষ সমর্থন দিয়েছিল। এখন কি সে সমর্থন দিতে পারবে? সংলাপ অনুষ্ঠানে তৃতীয় প্রতিবন্ধকতার ঘটনা হলো ঢাকা মহানগর বিএনপির ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের সক্রিয় সদস্য সচিব হাজী রফিকুল ইসলাম মজুমদারের হত্যাকাণ্ড। এই উদীয়মান নেতাকে র্যাবের পোশাকধারী ব্যক্তিরা ঢাকা থেকে অনেক দূরে ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার আনন্দনগর গ্রামে হত্যা করে। তার মৃতদেহ পুলিশের হ্যান্ডকাপ পরানো অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। র্যাব এবং পুলিশ পরে এ ব্যাপারে তাদের দায়-দায়িত্ব অস্বীকার করে। ইতোপূর্বে এভাবে অনেক খুন ও গুমের ঘটনা ঘটেছে। বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী এবং ঢাকা শহরের অপর জনপ্রিয় বিএনপি নেতা ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলমের কথা উল্লেখ করা যায়। জনগণের জানমালের দায়িত্ব সরকারের। সরকারের সংশ্লিষ্টতা না থাকলেও সরকারের উচিত এসব হত্যা ও গুমের ঘটনা উদ্ঘাটন করা। এমনও হতে পারে যে, সরকারের অজান্তে কোন দেশজ বা আন্তর্জাতিক সংস্থা দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির জন্য এসব অপকর্ম সরকারের নামে করে বেড়াচ্ছে। সংলাপবান্ধব পরিবেশের ক্ষেত্রে আর একটি প্রতিবন্ধকতা সরকারের তরফ থেকে ক্রমবর্ধমান হামলা এবং মামলা। বিরোধী রাজনৈতিক দলসমূহ যেমন সহিংসতা ঘটাচ্ছে, তেমনি সরকার তাদের দমনে ক্রমাগত নিষ্ঠুর আচরণ করছে। হরতাল আহ্বান রাজনৈতিক অধিকার। জনসাধারণ যদি স্ব-ইচ্ছায় স্ব-উদ্যোগে হরতাল পালন করে সেটাই তাদের রাজনৈতিক সফলতা। কিন্তু বিরোধী জোটও যদি নিপীড়নের কৌশল অবলম্বন করে তা কারো কাম্য হতে পারে না। বাসে আগুন, গাড়ি পোড়ানো, সম্পদ বিনষ্টের মতো কার্যক্রম থেকে অবশ্যই হরতালকারীদের বিরত থাকতে হবে। বৃটিশ আমলে শুনতাম ‘কোম্পানিকা মাল দরিয়ামে ডাল’। পাকিস্তান আমলেও একই অবস্থা চলেছে। কিন্তু এখন তো আমরা স্বাধীন। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের নাগরিক হিসাবে আমাদের দায়িত্বশীল হতে হবে। এটা মনে রাখতে হবে, যখন আমরা কোন বাসে আগুন দেই, গাড়ি পোড়াই বা সম্পদ নষ্ট করি তা আমাদের। আমাদের কোন ভাই অথবা প্রতিবেশীর। রাজনৈতিক নেতাদের উচিত কর্মীদের সংযম আচরণের দীক্ষা দেয়া। আর একটি বিষয় হলো: রাজনীতির সাথে সৌজন্য ভদ্রতা সভ্যতার সংমিশ্রণ। অতি সম্প্রতি নারীদের সাথে প্রশাসনের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারের ইমেজ এবং মর্যাদার স্বার্থেই এমন অনভিপ্রেত আচরণ থেকে বিরত থাকতে হবে। সমাজে রাজনৈতিক অস্থিরতা যখন বৃদ্ধি পায়, সামাজিক অনাচার তখন বেড়ে যায়। তার কারণ হচ্ছে, রাজনীতিকরাই সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করেন। রাজনীতিকদের নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব শিথিল হলে সামাজিক শৃঙ্খলা ব্যাহত হয়। সামাজিক শৃঙ্খলা দুর্বল হলে সমাজে লুক্কায়িত দুষ্কৃতকারীরা বেরিয়ে আসে। যদিও রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সামাজিক অনাচার এই মুহূর্তে অসম্ভব হয়ে পড়েনি, তবুও পত্রিকান্তরে প্রকাশিত সারাদেশে নারীধর্ষণ, নারী হত্যা, নারী নিপীড়নের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এটা হঠাত্ করেই বেড়েছে এমনটি নাও হতে পারে। নারী নিপীড়নের যে ঘটনা ভারতকে আন্দোলিত করেছে, হতে পারে তারই অভিঘাতে প্রকাশ হয়ে পড়ছে আড়ালে-আবডালের ঘটনাগুলো। তাহলে একথা সত্য বলে মেনে নিতে হয় যে, ইভটিজিং-এর মতো যে মহামারি সরকারি কড়াকড়ির ফলে ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েছিল, তারা আবার আরও ভয়ঙ্করভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। নইলে এক সপ্তাহে এত ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশিত হওয়ার কথা নয়। আমাদের রাজনৈতিক অস্থিরতা অবসানে সংলাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক সমঝোতা অর্জনের যেমন বিকল্প নেই, তেমনি সামাজিক অনাচারের মূলোত্পাটনে রাজনৈতিক শক্তির সদিচ্ছাই একমাত্র প্রতিষেধক। লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়