সামাজিক মূল্যবোধ বনাম সামাজিক সমস্যা
প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:২১
সমাজবিজ্ঞানী হার্বার্ট স্পেনসর সর্বপ্রথম মানবসমাজকে জীবদেহের সাথে তুলনা করেন। তার মূল বক্তব্য ছিল ‘জীবদেহ যেমন বিভিন্ন অঙ্গ-প্রতঙ্গ বা উপাদান নিয়ে গঠিত, ঠিক তেমনি মানবসমাজও বিভিন্ন অঙ্গ-প্রতঙ্গ বা উপাদান নিয়ে গঠিত’। এখন কথা হলো, জীবদেহের কোন বিশেষ অঙ্গ রোগাক্রান্ত হলে সেই জীবের পুরো দেহ অসুস্থ ও অকার্যকর হয়ে পড়ে। ঠিক তেমনি মানবসমাজের কোন বিশেষ দিক বা অঙ্গ ব্যাধিগ্রস্ত হলে পুরো সমাজ আক্রান্ত হতে বাধ্য। আক্রান্ত জীবের সুস্থতা নিশ্চিত করার জন্য যেমন আশু সুচিকিত্সা প্রয়োজন, ঠিক তেমনি আক্রান্ত মানবসমাজের সার্বিক সুস্থতা নিশ্চিত করার জন্য আশু যথোপযুক্ত পদক্ষেপ জরুরি। নতুবা পুরো সমাজকে এর চরম মূল্য দিতে হবে।
দেশে দেশে ধর্ষণসহ বিভিন্ন সামাজিক অপরাধ ও অশ্লীলতা লাগামহীনভাবে বেড়ে চলছে। ১৬ ডিসেম্বর রাতে দিল্লীতে গণধর্ষণ ও অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করে এক মেডিক্যাল ছাত্রী, যা ভারতজুড়ে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে। সেদিন রাত ১০টার পরে সিনেমা দেখে বয়ফেন্ডের সাথে বাসায় ফেরার সময় চলন্ত বাসে মেয়েটিকে ধর্ষণ করে কিছু লম্পট। কিন্তু ঘটনার এখানে শেষ নয়, নরপশুরা ধর্ষণের পর মেয়েটিকে ও তার ছেলেবন্ধুকে প্রচণ্ড মারধর করে চলন্ত বাস থেকে ফেলে দেয়। ছেলেটি জীবনে বাঁচলেও মেয়েটির শেষ রক্ষা হয়নি। সংবাদ মাধ্যমে জানা যায় যে, লম্পটেরা সে সময় মাদকাসক্ত ছিল।
১৬ ডিসেম্বরের মর্মান্তিক ঘটনায় অবশ্য ভারতজুড়ে অনেক সচেতন মানুষ ও সংগঠন বলছে যে, ভারতের বিভিন্ন শহরে তথাকথিত আধুনিক পশ্চিমা সংস্কৃতির অনুকরণের ফলে ধর্ষণ, গণধর্ষণ ও যৌন হয়রানির মতো ঘটনা আশংকাজনকভাবে বেড়ে চলছে। এছাড়া এ ঘটনায় ভারতজুড়ে প্রতিবাদের যে ঝড় ওঠে তাতে মনে হয় কিছুটা হলেও ভারতের মানুষের মোহ ভেঙ্গেছে।
এবার নজর দেয়া যাক আমাদের বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থার দিকে। কথায় আছে আগে ঘর তারপর পর। আমাদের সমাজ ব্যবস্থাও আক্রান্ত হয়েছে নানাবিধ সামাজিক ব্যাধি দ্বারা। এর মধ্যে ধর্ষণ অন্যতম। প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় থাকছে একাধিক যৌন হয়রানি, ধর্ষণ বা ধর্ষণের পর হত্যার লোমহর্ষক ঘটনা, যা ইদানীংকালে দ্রুত বাড়ছে এবং মহামারী আকারে দেখা দিয়েছে। এ যাত্রায় রক্ষা পাচ্ছে না অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুটিও, নিরাপদ থাকছে না ছাত্রীটি তার পিতৃসূলভ শিক্ষকের কাছে, সহপাঠিনী তার সহপাঠীর কাছে; এমনকি এতে আরো একটি বিষয় যোগ হয়েছে, তা হচ্ছে বিশ্বস্ত বান্ধবীটি পর্যন্ত বান্ধবীকে ধর্ষণের ফাঁদে ফেলতে দ্বিধা করছে না। এক ধরনের মানসিক বিকারগ্রস্ততা ও সামাজিক অস্থিরতা প্রকট হয়ে উঠছে। এখন আমাদের কাছে বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে কোন সংস্কৃতির প্রভাবে এমনটা হচ্ছে!
গত ৭ ডিসেম্বর টাঙ্গাইলে বীথি আক্তার নামের এক বান্ধবীর প্রতারণায় গণধর্ষণের শিকার হয় এক ছাত্রী। ব্যাপারটি প্রাথমিকভাবে গোপন রাখার চেষ্টা করা হলেও মেয়েটি যখন মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ে ও অসুস্থ হয়ে পড়ে তখন জানাজানি হয় এবং মিডিয়ায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
টাঙ্গাইলের ধর্ষণের ঘটনার নেপথ্যে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ হয়। টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার একটি সংঘবদ্ধচক্র সিনেমা ও নাটকের অভিনয়ের প্রলোভন দেখিয়ে প্রতিভা খোঁজার নামে গ্রামগঞ্জের সহজ-সরল তরুণীদের ফাঁদে ফেলে অবৈধ, অশ্লীল এবং পর্নোফিল্ম তৈরি করছে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। প্রতিভা খোঁজার নামে, আধুনিক সংস্কৃতির নামে যে অশ্লীলতা ও নোংরামির চর্চা ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে তা আবেগী কিশোর-কিশোরী ও যুবক-যুবতীদের শুধু প্রতিভাই নষ্ট করছে না, তাদের ঠেলে দিচ্ছে অমর্যাদাকর ও মানসিক যাতনার এক অন্ধকার জীবনে, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে ঠেলে দিচ্ছে অকাল মৃত্যুতে।
এক্ষেত্রে আমরা আইনের কথা বলি, কঠোর শাস্তির বিধান করার কথা বলি। আইন ও শাস্তির বিধান আমাদের আছেও; কিন্তু চলমান ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে, শুধু আইন থাকলে কাজের কাজ হয় না। আইনের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হয়। এজন্য প্রয়োজন আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া।
এ গেল কোন ব্যাধির প্রতিকারমূলক (curative) ব্যবস্থা গ্রহণ। কিন্তু এটা কোন সামাজিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। এজন্য প্রয়োজন সমস্যার নেপথ্যের কারণগুলো উদঘাটন করে সেগুলো নিরসনের ব্যবস্থা করা তথা প্রতিরোধমূলক (preventive) ব্যবস্থা গ্রহণ করা। আমরা আমাদের সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধগুলোকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আধুনিকতা ও প্রগতিশীলতার নামে এমন একটি সামাজিক পরিবেশে যাচ্ছি যেখানে ভালো-মন্দের, সত্য-মিথ্যার, ন্যায়-অন্যায়ের, সত্চরিত্র-অসত্চরিত্রের মধ্যে কোন নির্দিষ্ট সীমারেখা (well defined boundary) থাকছে না। আমরা এমন এক মানসিক অবস্থায় চলে যাচ্ছি যেখানে অবলীলায় আমরা অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ছি কোন বিবেকের বাধা ছাড়াই। এক্ষেত্রে পশ্চিমের বিভিন্ন দেশে তাদের পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যখন চরম বিপর্যয়ের দরুন তারা নড়েচড়ে বসছে এবং সামাজিক গবেষণায় সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধগুলোর গুরুত্বের কথা উঠে আসছে, তখনো আমরা তাদের ঐসব সংস্কৃতির অনুকরণ করে যাচ্ছি। এখন প্রশ্ন হলো, তাদের বোধোদয় ঘটেছে, আমাদের ঘটবে কী?
লেখক :শিক্ষার্থী,
সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ৪র্থ বর্ষ,
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়