স্মরণ
অবিস্মরণীয় সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ
প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:২১
ইংরেজি ১৯৬৪ সাল। মাননীয় প্রধান বিচারপতি প্রয়োজনীয় কাজে বগুড়া এসেছেন। কাজ শেষে তার সখ হলো বগুড়া জেলা স্কুল পরিদর্শন করবেন। ১৯২৬ সালে এ স্কুল থেকেই তিনি রাজশাহী বিভাগের সব পরীক্ষার্থীর মধ্যে প্রথম হয়ে প্রথম বিভাগে বিভাগীয় বৃত্তিসহ প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এ স্কুলের সাথে জড়িত তার কিশোর বয়সের সোনালি দিনগুলোর কথা তিনি ভুলতে পারেননি। ঘুরে ঘুরে তিনি স্কুলের বিভিন্ন ক্লাস দেখছেন এবং কোন্ রুমে কোন্ ক্লাস বসত আর কোন্ শিক্ষক কি বিষয় পড়াতেন তা শিশুসুলভ আবেগ নিয়ে সঙ্গীদের জানাচ্ছিলেন। পরিদর্শন শেষে স্কুলের তদানীন্তন প্রধান শিক্ষক সম্মানের সাথে প্রধান বিচারপতি মহোদয়কে তার অফিস কামরায় নিয়ে এলেন এবং বিনয়ী হয়ে প্রধান শিক্ষকের নির্দিষ্ট চেয়ারটিতে তাকে বসার অনুরোধ করলেন। ‘ধন্যবাদ। তবে যে চেয়ারে আমার শ্রদ্ধেয় হেডস্যার শাহা বাবু বসতেন সে চেয়ারে বসার যোগ্যতা আমার নেই- মাননীয় প্রধান বিচারপতি আপত্তি জানিয়ে বললেন’।
১৯৬৭ সালের নভেম্বর মাসের কথা, স্বদেশপ্রেম আর ত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তখন প্রধান বিচারপতির সম্মানিত পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন তিনি। ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার কৌসুলী স্যার টম উইলিয়ামস ঢাকায় এসে এই সাবেক প্রধান বিচারপতির সাথে দেখা করতে এলে বিচারপতি বিনয়ের সাথে বলেন, এই মামলায় আমি আপনার সহকারী হিসেবে কাজ করে যাব। টম উইলিয়ামস জবাব দিলেন, একজন প্রধান বিচারপতি সব সময়ের জন্যই প্রধান বিচারপতি থাকেন। ইউর অনার, সে হিসেবে আপনি আমার উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করবেন- টম উইলিয়ামস যতদিন ঢাকায় ছিলেন এবং যতবার সেই সাবেক প্রধান বিচারপতির সাথে তার বৈঠক হয়েছে ততবারই টম উইলিয়ামস তাকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে সম্বোধন ও সম্মান দেখিয়েছেন।
সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ ১৯১১ সলের ১১ই জানুয়ারী পশ্চিম বাংলার মুর্শিদাবাদ জেলার সৈয়দ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা একজন বিসিএস এবং একসময় বৃহত্তর বগুড়া ও দিনাজপুরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। মাতা সৈয়দা আফজালুননেসা ছিলেন শেরেবাংলা আবুল কাশেস ফজলুল হকের আপন বোন। ১৯২৬ সালে বগুড়া জেলা স্কুল থেকে কৃতিত্বের সাথে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণের পর কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে বিএ (অনার্স) ও এম এ পাস করেন। ১৯৩৭ সালে ব্যারিস্টারি পড়তে বিলেতে এবং সে সময় তিনিই একমাত্র ভারতীয় ছাত্র, যিনি অনার্সসহ বার এ্যাট ল’ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পঞ্চাশের মন্বন্তরে মানবতার সেবায় তার অবদান ছিল অপরিসীম। ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ও শান্তি স্থাপনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের সাথেও ছিলেন জড়িত। তিনি রাজনীতিক ছিলেন না, কিন্তু এ দেশের সমস্ত গণতান্ত্রিক রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। তিনি সাহিত্যিক ছিলেন না তবু লেখাগুলো সাহিত্যরস, যুক্তি ও পাণ্ডিত্যপূর্ণ ছিল। আরবি, ফারসি, উর্দু, ইংরেজি, বাংলা প্রভৃতি ভাষায় তিনি ছিলেন সুপণ্ডিত। ১৯৫৪ সালে তিনি ঢাকা হাইকোর্টে বিচারপতি নিযুক্ত হন এবং ১৯৬৪ সালে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন।
১৯৬৭ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বিপক্ষে যুক্তি প্রদর্শনকালে তিনি প্রধান বিচারপতি পদ থেকে ইস্তফা দেন। তার ঐতিহাসিক রায়সমূহে প্রয়োজনে মনীষীদের অমর বাণীর উদ্ধৃতি দিতেন তিনি। তার একটি অতি প্রিয় উদ্ধৃতি ছিল ইংল্যান্ডের সুবিখ্যাত কবি ও নাট্যকার সেক্সপিয়ার থেকে নেয়া সিংহের মতো শক্তি থাকা খুবই আনন্দের কথা, কিন্তু সেই শক্তি দুর্বলের ওপর প্রয়োগ হলে তা হয় অত্যাচার। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পেছনে তার বলিষ্ঠ ভূমিকা থাকলেও স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পরের বছরগুলোতে ন্যায়-নীতি ও মূল্যবোধের সামগ্রিক অবক্ষয় দেখে তিনি ব্যথিত হন। যে মর্যাদাবোধের কারণে ১৯৬৭ সালে তিনি প্রধান বিচারপতির আসন ছেড়ে দিয়েছেন, সেই একই কারণে জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি নিজেকে সবকিছু থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। ইংরেজি ১৯৭৯ সালের ৩রা এপ্রিল এই মহান বিচারপতি ইন্তেকাল করেন। বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের বিচারপতি হয়েছেন অনেকে এবং ভবিষ্যতেও হবেন, তবু আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বলিষ্ঠ ভূমিকার জন্য বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোর্শেদ চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
লেখক :গবেষক