নববর্ষে আশাবাদ, উজ্জীবিত স্বদেশ ও অগ্রযাত্রা
প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:২১
অমর্ত্য সেন আবারো আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন আমাদের দেশে বা বাংলাদেশের মাটিতে নয়, ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়ে বলেছেন, সূচকে এবং বাস্তবে বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে। যে সমস্ত পরিসংখ্যানে আমরা কোনকালেও ভারতের কাছাকাছি ছিলাম না, সেগুলোর অধিকাংশই আজ বাংলাদেশের দখলে। জীবনের নানাক্ষেত্রে পরিবর্তনের ঢেউ আছড়ে পড়েছে, সবচে বড় কথা আমাদের লিংগ বৈষম্য বা নারী-পুরুষের ভেদ কমেছে, অর্মত্য সেনের মত বিদগ্ধ পণ্ডিত জনের চোখেও তা স্পষ্ট। বাংলাদেশের সমাজ ও জীবন ব্যবস্থাকে বাহ্যিকভাবে যতটা আধুনিক বা পুরনো মনে হয়, বাস্তবে তা নয়। দূর থেকে বা কাচের ঘরে বসে ভারতীয়রা আমাদের ঝাপসা দেখেন, পাকিস্তানিরা উগ্রতার অন্ধে চোখেই দেখেন না, অন্য প্রতিবেশী এমনকি মিয়ানমারও ঘোলাটে দেখে, কিস্তু সেটাই আমাদের আসল চেহারা নয়, রাজনীতি নামের দৈত্যটি এখন আর বোতল বন্দি নয়, জনহিত, মানুষের কল্যাণে নিবেদিত থাকার পরিবর্তে ক্ষমতা-অক্ষমতার লড়াইয়ে নিমজ্জিত বলে আমাদের প্রকৃত চেহারা বেরিয়ে আসতে পারে না। বলা উচিত পারেনি। এখন পরিস্থিতি বদলেছে, বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যেখানে সমাজ রাষ্ট্রের ভূমিকায় কাজ করছে, সরকার বা রাষ্ট্র যা করতে ব্যর্থ কিংবা অপারগ, সাধারণ মানুষ তা অবলীলায় করে দেখাচ্ছেন, অর্মত্য সেন যে নারীশক্তির কথা বলেছেন তার উদ্বোধন বা বিকাশে রাষ্ট্র ও সরকারের ভূমিকা যতটা তারচে অধিক অবদান রেখেছে পরিবার, সংস্কৃতি ও মিডিয়া, বাংলাদেশের সংস্কৃতির যে কি অসীম শক্তি তা দূরদেশে বসবাস না করলে ঠাউর করা যায় না। গত হপ্তায় আমরা একটি ঘরোয়া আয়োজনে মিলিত হয়েছিলাম, উদ্দেশ্য আড্ডা আর মনের খোরাক মেটানো, যতক্ষণ রাজনীতি, দেশের সাম্প্রতিক ঘটনা বা অতীত আলোচনার বিষয় ততক্ষণ আমরা ছিলাম উগ্র, জেদি, আর তর্কমুখর। যে গান কবিতা শুরু হল গর্তে ঢোকা সাপের মত ভেদাভেদ মিইয়ে দেশের অভ্যন্তরে ঢুকতে শুরু করলো হূদয়। ‘ও আমার দেশের মাটি’ গীত হবার কালে দেখি উগ্র আওয়ামীপন্থি আর চড়া বিএনপি উভয়ের চোখ ছলছল করছে। নয়ন মুছে দেশপ্রেমের এই অবগাহনই আমাদের অন্তরের শক্তি, ভারতের তা নেই। রবীন্দ্রনাথ জাতীয় সঙ্গীত রচয়িতা হিসেবে উভয় দেশে বিরাজমান বটে, তবে ভারতে তার অবস্থান আমাদের মত নয়, সেদেশের বিভিন্ন রাজ্যের জনগণ ‘জনগণ মন অধিনায়কের’ রচয়িতার নাম জানেন না, চেনেনও না। আমাদের সংস্কৃতি সে জাতীয় ভ্রান্তি বিলাস থেকে আমাদের দূরে রাখে। অমর্ত্য সেন যে নারীশক্তির কথা বলেছেন, সেখানে উহ্য বা অদৃশ্য মনে হলেও সংস্কৃতি আছে, সেও এক জাগ্রত নারীশক্তির প্রতীক, অন্তত বাংলাদেশে। আমাদের ছোট দেশটিতে যত বাধা-বিঘ্ন বা প্রতিকূলতাই আসুক না কেন গৃহের জননী আমাদের দোয়া বা আশীর্বাদ জানিয়ে তার মোকাবিলার শক্তি দেন, অন্যদিকে ঘরের বাইরে শক্তি যোগায় সংস্কৃতি, যে কারণে আজ আমাদের নারীরা শিক্ষা ও শ্রমের প্রতিযোগিতায় ভারতকে ছাড়িয়ে এগিয়ে চলেছে।
সৌভাগ্যের পাশাপাশি আমাদের সবচে বড় দুর্ভাগ্য আমরা নিজেদের শক্তি বা শৌর্য বিষয়ে উদাসীন, সম্মান করতে জানি না, আমাদের দেশের নোবেল বিজয়ীকে নিয়ে টানা-হ্যাঁচড়া দেখলেই তা আঁচ বা অনুমান করা সম্ভব। এই কারণে আমরা নিজেদের অর্জন বা সাফল্যকে বিশ্বনন্দিত করে তুলতে পারি না, ভারতীয়রা প্রচারে অনেক বেশি এগিয়ে, প্রচার ও প্রসার পারস্পরিক হাত ধরে চলা দুটো বিষয়। শচীনের মত হাতে গোনা দুই চারজন ক্রিকেটার বাদে বাকিরা আমাদের কাছে নিতান্তই সাধারণ, অথচ এদ্দিন তা কল্পনাও করা যেতো না। পাকিস্তানের বেলায়ও তাই, আজ যখন আমরা মাঠে নেমেছি, জিতেছি বা জিততে শিখেছি সে ভুল ভাঙ্গতে শুরু করেছে।
অর্মত্য সেনকে ধন্যবাদ জানানোর ভাষা আমাদের নেই। পরম হিতৈষী এই মানুষটি অনেকবার আমাদের বন্ধ চোখ খুলে দিয়েছেন। স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন কোথায় আমাদের শক্তি। আমাদের নোবেল বিজয়ীও তা করেননি। এই যে আত্মশক্তি বা বিশ্বাস জাগিয়ে তোলা আজ তার প্রয়োজন অনেক বেশি। দেশের বাইরে বসবাসরত বিশাল প্রবাসী জনগোষ্ঠীর দিকে তাকালেই তার যথার্থতা চোখে পড়ে। পুরো দুভাগে বিভক্ত প্রবাসীরা দেশের জন্য বুকভরা ভালোবাসার পরও নিন্দা আর সমালোচনার জ্বরে আক্রান্ত। কোন না কোনভাবে জননীর অপমানে এক ধরনের বিকৃত আনন্দ অথবা দেশে বসবাস না করার সন্তুষ্টি লাভই এদের মোক্ষ, অথচ এদের হূদয়ে অন্য চিন্তা, অন্য ভাবনা, এমনি একজনকে দেখেছি দিবা-নিশি দেশ ও দেশজ বাস্তবতার মুণ্ডু চিবিয়ে খাওয়ার পর বিজয় দিবসের সকালে অন্য চেহারায় আবির্ভূত হতে। সবার আগে ঘুম থেকে উঠে সবুজ টি-শার্ট গায়ে জড়িয়ে আধুনিক সিস্টেমে প্রার্থনার ভঙ্গিতে দেশের গান শুনছেন। এই সৌন্দর্য বাংলাদেশের অন্তর্গত শক্তির প্রতীক, যা অন্য জাতিতে বিরল।
এমন দেশটিকে যাবতীয় হিংস্রতা, জঙ্গিবাদ বা আক্রমণের হাত থেকে বাঁচিয়ে রেখেছেন নারীরা। কখনো পরোক্ষে, কখনো প্রত্যক্ষে এরাই প্রেরণাদাত্রী। পোশাক শিল্প বা অন্যান্য উত্পাদনে আজ এরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন। কায়িক শ্রমে এগিয়ে এসে বাংলাদেশের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করেছেন। যখন কোন পরীক্ষার ফল বেরোয়, বিশেষত স্কুল লেভেলে, মিডিয়া খুললেই তরুণীদের প্রাধান্য আর ঈর্ষণীয় ফলাফল দেখে মন জুড়িয়ে যায়। দেশে এখনো আঁধার ঘুচে যায়নি। এখনো ধর্মীয় অন্ধত্ব, সামাজিক বৈষম্য, সন্দেহ আর নির্যাতনের শিকার নারীরাই। তারপরও আমাদের স্রোতস্বিনী পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, সুরমার মত ছুটে চলেছেন তারা। পর্বতশৃঙ্গ থেকে সুন্দরবনের জঙ্গল পদানত করে চলা নারীদের কথাই বলেছেন অর্মত্য সেন। এ লেখা যখন লিখছি তরুণী ওয়াসফিয়া নাজরীন আবারো বিশ্বনন্দিতা হয়েছেন পর্বত বিজয়ে। এ যেন সত্যি প্রতীকী। আমাদের নারীশক্তি পর্বত বা আকাশচুম্বি উত্থানের প্রতীক। এখন সময় সামনে যাবার। আশা ও আস্থা জাগানো আয়ুর হারের মত বেঁচে থাকুক বাংলাদেশের সম্ভাবনা, জেগে থাকুক নারীর চোখের মত মায়াবী ও চমত্কার স্বপ্নগুলো, বাংলাদেশ তুমি জিতবেই, অর্মত্য সেন তারই প্রতিধ্বনি করেছেন মাত্র।
সিডনি থেকে
dasguptaajoy@hotmail.com