বইমেলা হউক কেবলই প্রকাশক-লেখক-পাঠকের

মহান একুশে উপলক্ষে আয়োজিত বাংলা একাডেমীর মাসব্যাপী বইমেলা কেবলই সৃজনশীল প্রকাশক, লেখক ও পাঠকের বইমেলা হউক, এই দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু বরাবরই ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত চেনা এবং অচেনা কিছু ভুঁইফোঁড় সংগঠন বইমেলার স্টল বরাদ্দ নিয়া নেয় রাজনৈতিক প্রভাব খাটাইয়া। মাসব্যাপী মেলায় মানুষের যেই ঢল নামে তাহার অবকাশে পণ্য বিক্রিবাটা করিয়া টু-পাইস কামাইয়া লইবার ধান্দাই এইক্ষেত্রে কাজ করে। পণ্য হিসাবে তাহারা হয় বই নয়তো খাদ্যদ্রব্য অথবা এইটা-ওইটা বিক্রি করিয়া থাকে। বইমেলার সামনের রাস্তায় অথবা মেলা প্রাঙ্গণের প্রবেশদ্বারের মুখেই তাহারা স্টল বরাদ্দ নিয়া থাকে। সেইসব স্টলে ক্ষমতাসীন দলের প্রতিষ্ঠাতা-নেতার ছবি লাগাইয়া এইসব সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলি তাহাদের দাপট প্রদর্শন করে, মেলামুখে। এই সংস্কৃতি নিঃসন্দেহে মেলার ভাব, পবিত্রতা ও স্বাভাবিকতাকে ব্যাহত করে। কিন্তু বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া এমনটিই চলিয়া আসিতেছে। তবে লক্ষণীয়, সামপ্রতিক বত্সরগুলিতে বাংলা একাডেমী কর্তৃপক্ষ এই পরিস্থিতির উন্নয়নে পদক্ষেপ নিতেছে। মেলাপ্রাঙ্গণের সামনের বারোয়ারি বাজার বন্ধের উদ্যোগ দেখা গিয়াছে নিকট অতীতে। বরং সত্যিকারের সৃজনশীল প্রকাশনীগুলিকে বরাদ্দ দেয়া হইতেছে; বাইরের স্টলগুলিও দেয়া হইতেছে ভিতরে যেইসব প্রকাশক স্থান পান না তাহাদের। কিন্তু ইহা করিতে গিয়া ভুঁইফোঁড়দের সহিত বিবাদ হইতেছে আয়োজক বাংলা একাডেমীর। গত বত্সর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সদস্যরা এই হাঙামায় জড়িত হইয়াছিল। এইবার ছাত্রলীগের নাম লইয়াই আসিয়াছে একদল তরুণ। তাহাদের দাবি তাহাদের ৫০টি আবেদনপত্র দিতে হইবে। তাহাদের দাবিতে কর্তৃপক্ষ সাড়া না দেওয়ায় গত মঙ্গল ও বুধবার আবেদনপত্র জমা দেওয়ার কার্যক্রমে তাহারা বাধাপ্রদান করে। ইহাতে বিপাকে পড়ে সত্যিকারের সৃজনশীল প্রকাশকদের পক্ষ হইতে যাহারা আবেদনপত্র জমা দিতে আসিয়াছিল, তাহারা। বাংলা একাডেমীর কর্তৃপক্ষ জানাইয়াছে বাধাপ্রদানকারীরা ছাত্রলীগের সদস্য নন, তাহারা নিকটস্থ শিববাড়ি এলাকার বাসিন্দা। এইবার কোনো সাংস্কৃতিক ও উন্নয়ন সংগঠনকে স্টল দেয়া হইতেছে না, এই কথা তাহাদের বুঝাইয়া বলা হইয়াছে। তবে তাহারা ছাত্রলীগের সদস্য হইলেই তাহাদের তত্পরতা জায়েজ হইয়া যায় না। বিষয় হইলো, বইমেলাকে হইতে হইবে বইমেলার মতোই। সৃজনশীল প্রকাশকরা নূতন-পুরাতন বইয়ের সম্ভার লইয়া হাজির হইবেন, পাঠকেরা অনেক বই নাড়িয়া-চাড়িয়া-শুঁকিয়া কিছু বই কিনিয়া বাড়ি ফিরিবেন— এই সুস্থ সংস্কৃতিকে যেইভাবে হউক প্রতিষ্ঠিত করিতে হইবে। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বিবেচনায় এইদিক-ওইদিক যদি কিছু হইয়াও থাকে, তাহা যেন চোখে পড়িবার মতো না হয়। এই যেমন, লটারির মাধ্যমে স্টলবরাদ্দ হইবার পরও মেলার মূল প্রবেশমুখে গুরুত্বপূর্ণ স্টলগুলি সবসময়ই ক্ষমতাসীন দলের প্রতিষ্ঠাতা-নেতার নামধারী সংগঠন বা প্রকাশক পাইয়া থাকে; ইহা আপত্তিকর। ইহাদেরও লটারির আওতায় আনিতে হইবে। আর মেলাকে হইতে হইবে ছিমছাম-পরিচ্ছন্ন। প্রকৃত প্রকাশকদের যেমন মেলায় ঠাঁই দিতে হইবে, প্রকৃত পাঠকের আনাগোনাই মেলায় কাম্য। যেই পরিমাণ মানুষ বইমেলায় আসিয়া থাকেন, তাহাদের একটা বিরাট অংশই থাকে বৈকালিক ভ্রমণকারী। অবশ্য ইহাদের ঠেকাইতে বাংলা একাডেমীর কোনো উদ্যোগ আপাতত নাই, হয়তো তাহা সম্ভবও নহে। ইহাদের ঠেকাইতে পারিলে অবশ্য মেলার পরিবেশ অধিক উন্নত হইতো।