‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি’

আজি হইতে শতবর্ষ আগে এই দেশের রূপে ও গুণে মুগ্ধ হইয়া ডি এল রায় লিখিয়া ছিলেন, ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি, সকল দেশের রানি সে যে আমার জন্মভূমি।’ বহু গীত, বহুল চর্চিত দেশাত্মবোধক এই গানেরই প্রতিধ্বনি যেন করিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান উইলিয়াম মজীনা। তিনি বলেন, ‘আমি ও আমার স্ত্রী বাংলাদেশের তেতুলিয়া হইতে টেকনাফ পর্যন্ত ঘুরিয়া বেড়াইয়াছি। আমি পৃথিবীর কোথাও বাংলাদেশের মত এমন প্রগতিশীল ও সৃষ্টিশীল মানুষ দেখি নাই। যেখানেই যাই এই দেশের মানুষের মধ্যে দেখিতে পাই উজ্জল সম্ভাবনা।’ তিনি এই কথা বলেন গত শনিবার টাঙ্গাইলে একটি স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানে বিশেষ অথিতির বক্তৃতায়। ড্যান ডব্লিউ মজীনার এই বক্তব্য যে অসার-অর্থহীন নহে, এই দেশের চারিদিকে চক্ষু মেলিয়া তাকাইলেই তাহা বেশ বুঝিতে পারা যায়। রবীন্দ্রনাথ এই ভাবিয়া আক্ষেপ করিয়া ছিলেন যে, ‘ঘর হইতে এক পা ফেলিয়া দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া একটি ধানের শীষে একটি শিশির বিন্দু।’ এই কালেও শত-সহস্র সম্ভাবনার শিশির বিন্দু আমাদের দৃষ্টি এড়াইয়া যায় বৈ কি! গ্রাম ও শহরের প্রান্তিক মানুষ—নারী ও পুরুষ, শিক্ষিত এবং স্বল্পশিক্ষিত প্রায় সকলেই এখন ব্যস্ত কর্ম-কোলাহলে। প্রযুক্তির যে সামান্য ছিটেফোঁটা তাহাদের কাছে পৌঁছাইয়াছে, সেইটুকুকে কাজে লাগাইয়া; উহার সঙ্গে নিজেদের মেধা, সৃজনশীলতা এবং উদ্যম যুক্ত করিয়া তাহারা সুযোগ করিয়া লইতেছে আত্ম কর্মসংস্থানের। যেখানেই গিয়াছে রাজপথ, সেখানেই মানুষ কাহারও আহবানের অপেক্ষায় না থাকিয়া কাজের সুযোগ তথা সেবা কিংবা পণ্য উত্পাদনের পথ করিয়া লইতেছেন। আধা প্রাযুক্তিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়া উদ্যমীগণ জীবনমানের পরিবর্তন সাধন করিয়া চলিয়াছেন অবিরত। দশ-বারো বত্সর আগে ধোলাইখালের কারিগরদের মেধা ও উদ্যম দেখিয়া আমরা মুগ্ধ হইয়াছি। আর এখন বলিতে গেলে জাগিয়া উঠিয়াছে গোটা বাংলাদেশ। বিক্ষিপ্ত-বিচ্ছিন্ন এই উত্পাদনশীলতা ইতোমধ্যেই মাইক্রো অর্থনীতিতে সঞ্চারিত করিয়াছে নূতন প্রাণাবেগ। বদলাইয়া গিয়াছে নিস্তরঙ্গ পল্লীর চেহারা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, শিল্পবিপ্লবের সূচনাকালে ইউরোপের গ্রাম-জনপদে এমন এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হইয়াছিল যে, কপর্দকশূন্য মানুষটিও উদ্যমহীন বসিয়া থাকেন নাই। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উদ্যোগের মাধ্যমে তাহারা প্রশস্ত করিয়া লইয়াছিলেন জীবনের পথ। বাংলাদেশেও এখন প্রযুক্তির ছোঁয়ায় শুরু হইয়াছে কর্মের নূতন ধারা। আমাদের জনসংখ্যা জনসম্পদে রূপান্তরিত হইয়া যাইতেছে দ্রুত। মাইক্রো অর্থনীতি ম্যাক্রো অর্থনীতির ভীত মজবুত করিতেছে। সাধারণ মানুষের সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং উদ্যম বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যোগ করিয়া চলিয়াছে নূতন মাত্রা। আর এই দেখিয়াই মার্কিন রাষ্ট্রদূত অকপটে প্রশংসা করেন বাঙালির সৃজনশীলতার। বাংলাদেশকে এশিয়ার ব্যাঘ্র বলিয়া আখ্যায়িত করিতেও তিনি দ্বিধাহীন। আমাদের জন্য বিষয়টি উত্সাহব্যঞ্জক নিঃসন্দেহে। কিন্তু, ইহাই শেষ কথা নয়। আজকে বাংলাদেশের পরিশ্রমী ও উদ্যমী সাধারণ মানুষ উত্পাদনশীলতার যে পথযাত্রা শুরু করিয়াছেন, তাহার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা জরুরী। সেই জন্য চাই রাজনৈতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা। এই প্রসঙ্গে গত রবিবার ড্যান মজীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষােশষে সাংবাদিকদের নিকট বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চায় যে, বাংলাদেশে গণতন্ত্র অব্যাহত থাকুক। একই দিনে অন্য এক অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রতিনিধি এ্যালেন গোল্ডস্টেইন যথার্থই বলেন, কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজন বিনিয়োগ আর সেই জন্য দরকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। বাস্তবিকপক্ষেই গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ও স্থিতিশীলতা ছাড়া, মানুষ যতই উদ্যমশীল হউন না কেন, সাফল্যের এই ধারা অব্যাহত রাখা প্রায় অসম্ভব।