নারীর আর্তনাদ

চারদিকে নারী নির্যাতনের ক্রমবর্ধমান মাত্রা বেড়ে চলছে। মধ্যযুগীয় স্টাইল হতে আরম্ভ করে আধুনিক ডিজিটাল স্টাইলে আমাদের মা, বোন ধর্ষিত হচ্ছে। ২ জানুয়ারি ময়মনসিংহের পাগলা উপজেলায় হাপানিয়া গ্রামের বধূকে চুল কেটে মাথা ন্যাড়া বানিয়ে ক্ষান্ত হন। গত বছর চট্টগ্রামে এক গৃহবধূকে বিবস্ত্র করে গাছে ঝুলিয়ে পেট্রোল ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে মারে পাষণ্ড স্বামীর পরিবার-পরিজনেরা। তবুও থেমে নেই, প্রতিনিয়ত অসংখ্য ঘটনার শিকার হতে হচ্ছে মাটির মানুষ বাঙালি নারীকে। কয়েকটি ঘটনা ও পুলিশের এজাহার নেপথ্য নিয়ে মানুষের পৈশাচিক ঘটনার বিবরণ তুলে ধরছি। বড় বিস্ময় মানুষের মূল্যবোধের অবক্ষয়। ঘটনাটি ঘটিয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। যার মূল নেপথ্যে একজন নারী। কিভাবে একজন নারী হয়ে আর এক নারীকে পালাক্রমে ধর্ষণের সহায়তা করে তা এক বিস্ময়কর। ২৫ নভেম্বর সকাল ১০টার দিকে সিঙ্গাইর ডিগ্রি কলেজের ছাত্রীকে পরীক্ষা আছে বলে ডেকে নিয়ে আসে তার বান্ধবী লিজা। পথিমধ্যে লিজা ছাত্রীটিকে বলে তার ফুফু অসুস্থ, তাকে দেখে যেতে হবে। এই বলে পূর্ব পরিচিত সাভারের পৌর এলাকার ছাপড়া মসজিদ মেসে ঢুকিয়ে দিয়ে চলে যায়। এরপর ওতপেতে থাকা জাহিদ ওরফে রাজু তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। ধর্ষিতার চিত্কার যাতে শুনতে না পায় সেজন্য রাজু ও তার সহযোগী উচ্চ ভলিউমে গান ছেড়ে দেয়। এই সময় তার বন্ধুদের সহায়তায় ডিজিটাল ক্যামেরায় ধারণ করে ধর্ষণচিত্র। হতে পারে মেয়েটি তাদের পূর্ব পরিচিত বন্ধু, প্রেমিক, শত্রু; তাই বলে এমন নারকীয় কাণ্ড! এখানেই তারা ক্ষান্ত নয়। মেয়েটির মাকে ফোন করে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে, অন্যথায় ভিডিও প্রকাশ। পরিশেষে সাভার বাজার সংলগ্ন এলাকায় প্রকাশ। আর সমাজের আইনের রক্ষকরা সেটাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার অপপ্রয়াস চালায়। প্রহসনমূলক এজাহার দিচ্ছে ওসি সাহেব। আলোচিত টাঙ্গাইল ঘটনার জন্য জড়িত আরেক কুলটা নারী ইভা। পাশের রুমে তার বান্ধবীকে গণহারে ধর্ষণ হচ্ছে আর সে কিনা জোরে জোরে গান শুনছিল। এমন বিস্ময়কর নারী যে বাংলাদেশে আছে তা আমাদের নতুন প্রজন্মকে ভাবতে শেখায়। ৬ ডিসেম্বর ঔ স্কুলছাত্রীকে বান্ধবীর বিয়ে বলে তাদের বাড়িতে ডেকে আনে। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী নূরুজ্জামানের বাড়িতে উঠিয়ে ঔদিন রাতে পালাক্রমে ধর্ষণ করে নূরুজ্জামানের সহযোগীরা। টানা ৪ দিন আটকে রেখে ২৪/২৫ বছর বয়স ঐ নারীকে ধর্ষণ করে অবশেষে রেললাইনে ফেলে চলে যায় কাপুরুষেরা। রাঙ্গামাটির কাউখালী উপজেলার বড়ডলু এলাকায় ৮ম শ্রেণীর আদিবাসী ছাত্রী সাইনুচিং ওরফে থোমাচিংকে গণধর্ষণ ও হত্যা করা হয়। ২১ ডিসেম্বর বিকালে থোমাচিং পাশের পাহাড়ের বাগানে গরু আনতে যায়। এই সময় দুর্বৃত্তরা পাহাড়ের টংঘরে নিয়ে মেয়েটিকে অমানুষিক নির্যাতন করে। সন্ধ্যায় থোমাচিং না আসায় অনেক খোঁজাখুঁজির পর বাগান হতে লাশ উদ্ধার হয়। ঘটনার ২৫ দিন পরেও কোন ধর্ষণকারী আটক হয়নি। পরিবারের অভিযোগ, দুষ্কৃতকারীরা ঐ এলাকায় ঘোরাফেরা করত। তাদের মুখ চিনলেও ভয়ে নাম বলতে পারে নাই। বিচারের বাণী হয়তবা এভাবেই শেষ হয়ে যাবে। অপ্রকাশিত থাকবে। সমাজের এই অবক্ষয়ের জন্য দায়ী কে? সবাই আজ বসবাস করছে আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে, পাশ্চাত্য ধারার প্রবাহে। তাহলে কি বিশ্বায়নের প্রভাব দায়ী? কিন্তু যুগে যুগে নারী হচ্ছে ঐসব অমানবিক ঘটনার শিকার। কেবল পাল্টে যাচ্ছে ধরন-রকম। এই প্রসঙ্গে ভারতের রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের বর্ষীয়ান নেতা ভগবত দাবি করেন—শহরাঞ্চলের পাশ্চাত্য দর্শনই দায়ী নারীর বিরুদ্ধে অপরাধে। তাহলে আমরা কি সেই অবরোধবাসিনী হয়ে থাকব? কাপুরুষের মনুষত্ব কি কখনও জাগ্রত হবে না? অন্যদিকে মধ্যপ্রদেশের বিজেপির নেতা কৈলাশ বিজয় ভার্গীয় বলেন, লক্ষণরেখা অতিক্রম করলে তার মূল্য দিতে হবে নারীকে। তিনি আরো বলেন, মর্যাদার লংঘন হলেই সীতা হরণ হয়। প্রত্যেকের জন্য লক্ষণরেখা টানা আছে। সেই লক্ষণরেখা অতিক্রম করলেই সামনে রাবণ। সে সীতাকে হরণ করে নিবে। আজ হয়ত সেই সোনালী যুগ নেই। প্রতি যুগে জন্ম নিচ্ছে রাম, সীতা এবং রাবণ। রাবণকে কি বধ করার কোন মাধ্যম নেই? সেই যুগে দেবতারা নাকি যাকে উদ্দেশ করে অস্ত্র বানাত এবং অস্ত্রটি ছুঁড়ে মারলে ঠিক সে যেখানে থাকত সেখানে গিয়ে অস্ত্রটি তাকে বধ করত। কল্পনার যুগ পেরিয়ে আজ আমরা এসেছি একবিশং শতাব্দীর জ্ঞান-বিজ্ঞানের যুগে। আমাদের রাষ্ট্র ক্ষমতায় যেসব দেবতারা আছেন তারা কি রাবণ নিয়ন্ত্রণের বিধিবিধান দিতে পারেন না? রাবণের পক্ষে সব সময় অপশক্তি কাজ করে। অপশক্তি রুখতে সোচ্চার হতে হবে আমাদের মতো সীতাদের। আমাদের নারী-পুরুষ সমাজের মনে রাখতে হবে “এক দেশের কালচার অন্য দেশের আলসার”। অন্ধ অনুকরণ বাদ দিয়ে যার যার পারিবারিক অনুশাসন, ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে এগিয়ে আসতে হবে। নারীকে হতে হবে প্রতিবাদী। রাবণকে করতে হবে বধ। লেখক :রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ কবি জসীম উদ্দীন হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় Email: imamhasan511@gmail.com