স্থলবন্দরগুলির বেহালদশা ও উন্নয়ন
প্রকাশ : ১৫ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:৫৩
বন্দরকে বলা হয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতীক। স্থল, সমুদ্র কিংবা বিমানবন্দর কোনটির গুরুত্ব কম নহে। তবে আঞ্চলিক বাণিজ্য বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে স্থলবন্দরগুলির গুরুত্ব দিন দিন বাড়িতেছে। কিন্তু এই দেশের স্থলবন্দরগুলির অবস্থা শোচনীয়। অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধার অভাবে বন্দরগুলিকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো যাইতেছে না। বেনাপোল ছাড়া অন্যান্য স্থলবন্দরে আধুনিক পার্কিং ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত গুদাম ঘর, ওজনযন্ত্র ও ব্যাংকিং সুবিধা নাই। ফলে সীমান্ত অতিক্রমকালে বন্দরে আনুষ্ঠানিকতা সারিতে কালবিলম্ব হয়। ইহাতে দেখা যায় পণ্যবাহী ট্রাকের দীর্ঘ সারি ও জট। ইহার কারণে বাড়িয়া যায় পরিবহন ব্যয় যাহা নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাহাছাড়া বন্দরগুলিকে কম্পিউটারাইজড করা হয় নাই। গতানুগতিকভাবে কাগজপত্রের ব্যবহার ও মান্ধাতার আমলের পণ্য খালাস পদ্ধতি অনুসরণ করায় বন্দরগুলির কাজ-কর্ম গতিশীল হইতেছে না। সবচাইতে বড় কথা হইল, স্থলবন্দরে যাওয়ার জন্য আমরা উন্নত মানের সড়ক ব্যবস্থাও গড়িয়া তুলিতে পারি নাই। যোগাযোগ ব্যবস্থার এই অপ্রতুলতা ও দুর্দশার কারণে আমাদের কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হইতেছে না।
শুধু বাংলাদেশেই যে নাজুক অবকাঠামো রহিয়াছে তাহা নহে। এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে ভারতের স্থলবন্দরগুলির অবস্থাও খারাপ। তাই এই সমস্যার প্রতি উভয় দেশেরই সমান মনোযোগ দিতে হইবে। নিশ্চিত করিতে হইবে স্থলবন্দরগুলির সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার। থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার ন্যায় বাংলাদেশ ও ভারত যদি যৌথ পরিবহন কোম্পানি গঠনের মাধ্যমে দ্রুত পণ্য আনা-নেওয়া করিতে পারে, তাহা হইলে উভয় দেশের জন্যই উত্তম হইবে। ইহা দ্রব্যমূল্যের উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলিবে। উভয় দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যও বাড়িবে। বিশেষত ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলিতে বাংলাদেশী পণ্যের বাজার সম্প্রসারিত হইতেছে। তাই মেঘালয় ও ত্রিপুরা রাজ্যঘেঁষা তামাবিল, সুতারকান্দি, আখাউড়া ও বিবিরবাজারের অবকাঠামোগত সুবিধা বাড়ানো একান্ত প্রয়োজন।
বর্তমানে বাংলাদেশে ১৪টি স্থলবন্দর রহিয়াছে এবং আরও ছয়টি স্থলবন্দর তৈরির ঘোষণা দেওয়া হইয়াছে। ২০০১ সালে স্থলবন্দরগুলি তদারকি ও নিয়ন্ত্রণের জন্য গঠিত হয় বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ। তবে ২০০৬ সালে পরিচালনার জন্য পরিচালনা-হস্তান্তর (বিল্ড-অপারেট-ট্রান্সফার বা বিওটি) পদ্ধতি চালু করা হয়। ইহার পর হইতে একমাত্র বেনাপোল ছাড়া বাকি স্থলবন্দরগুলি বেসরকারিভাবে পরিচালিত হইতেছে। ইহা নিঃসন্দেহে একটি ভাল পদক্ষেপ। তবে পর্যায়ক্রমে ও অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণও দরকার। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কথা আমরা সকলেই জানি। তথাপি বিভিন্ন মেয়াদী পরিকল্পনা নিয়া অগ্রসর হইতে পারিলে একদিন শুভ ফল পাওয়া যাইবে নিশ্চয়ই। উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় স্থলবন্দর যেমন বাংলাবান্ধা, বুড়িমারী, হিলি প্রভৃতি স্থলবন্দরগুলির সমস্যার দিকে এখনই নজর দেওয়া জরুরি। কোন কোন স্থলবন্দরের নিরাপত্তা নিয়া প্রশ্ন আছে। আছে নানা প্রকার অনিয়মের অভিযোগও। এই সকল সমস্যা আমাদের ধীরে ধীরে কাটাইয়া উঠিতে হইবে। প্রতিবেশী ও বন্ধুপ্রতীম দেশ ভারতের সাথেই বাংলাদেশের পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণ বেশি। আর এই বাণিজ্যের ৮০ ভাগই সম্পন্ন হয় স্থলবন্দর দিয়া। অতএব, স্থলবন্দরগুলির উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও আন্তরিক হইতে হইবে।