প্রকৃতির রুদ্রমূর্তি :বিপন্ন বন্যপ্রাণী

অনেকেই মনে করেন বর্তমানকালে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ সম্বন্ধে আমাদের ধারণা ও উদ্যোগ সম্পূর্ণ আধুনিক। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। নির্বাধ, নির্বিচারে ও নৃশংসভাবে বন্যপ্রাণী নিধন করার ফলে অদূর ভবিষ্যতে মানবসভ্যতার অবলুপ্তির সম্ভাবনা হওয়ায় এই আতঙ্ক থেকে অব্যাহতি পাবার জন্যই আমরা হালে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য এতটা উত্সাহী। কাজেই আমাদের এ কাজে এগিয়ে আসাটা প্রয়োজনভিত্তিক। কিন্তু প্রাচীনকালে বন্য পশুপক্ষী রক্ষণটা ছিল মৌলিক ও আত্মিক। কেননা তারা বন্যপ্রাণী রক্ষণের ব্যাপারে শুধু সজাগই ছিলেন না, তারা বনাঞ্চল, বন্যপ্রাণী ও মানুষকে বিশ্ববোধের প্রেক্ষিতে দেখতেন। ইংরেজিতে আমরা যাকে ফরেস্ট বলি সে শব্দটা এসেছে ফারসি শব্দ থেকে- যার অর্থ হচ্ছে ‘বাহির’। কাজেই বনাঞ্চলকে আমরা জনাঞ্চল থেকে পৃথকভাবেই দেখতে অভ্যস্ত। বন্যপ্রাণী হিংস্র এবং বনাঞ্চল বিপদসঙ্কুল- এ ধারণা নিয়েই আমরা বড় হচ্ছি। কাজেই বনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বড়ই দূর সম্পর্কের। আমাদের এ সংরক্ষণ-চেতনা দেরিতে হলেও সময় এখনো আছে। তবে এই সংরক্ষণের কাজটা যেমন অত্যন্ত জরুরি, তেমনি দুরূহ। সরকার অগ্রণী ভূমিকা নিলেও যতদিন না জনসাধারণ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে এগিয়ে আসবে, এ সমস্যার সমাধান হবে না। ইতিমধ্যে সরকার অনেক কঠোর আইন প্রণয়ন করেছে, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য রিজার্ভ ফরেস্ট, ওয়াইল্ড লাইফ স্যাঙ্কচিউয়্যারি, ন্যাশনাল পার্ক স্থাপন করেছে, এমনকি সম্প্রতি বন্যপ্রাণী স্থানান্তর করছে সরকার। যদি সরকারের ভূমিকা যথেষ্ট হত তাহলে বিরল প্রজাতির পশুপক্ষী বিলুপ্ত হচ্ছে কেন? সেজন্য সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে ও বন্য পশুপক্ষী রক্ষার জন্য সদর্থক নিষ্ঠাভরা যৌথ উদ্যোগ নিতে হবে। বন সংকোচন বন্ধ করতে হলে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ অবশ্যই জরুরি হয়ে পড়েছে। বন্যপ্রাণীদের পর্যাপ্ত আহার ও অবাধ বিচরণের জন্য প্রয়োজন বনাঞ্চলে বসবাসকারীদের তাদের দখলিকৃত স্থান থেকে উত্খাত করে এ সমস্ত স্থানকে পুনরায় সবুজ করে তোলা। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও বন সংকোচন রোধ করার জন্য সরকার যে সমস্ত বিধিনিষেধ জারি করেছেন সেগুলো যাতে যথারীতি রূপায়িত হয় তা সরকার ও জনসাধারণের যুগ্ম দায়িত্ব। প্রতিটি সংরক্ষিত এলাকায় বন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় সশস্ত্র পাহারাদার নিযুক্তি দিতে হবে, রাখতে হবে জবাবদিহিতার ব্যবস্থা। চোরা শিকারীদের জন্য থাকতে হবে কঠোর আইনি ব্যবস্থা। রিজার্ভ ফরেস্ট ছাড়াও খণ্ড ভবনগুলো যাতে জনবসতিমুক্ত থাকে, তাতে সরকারি খবরদারি রাখতে হবে। বিরল প্রজাতির প্রাণীগুলোকে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেশের চিড়িয়াখানাগুলোর ওপর ছেড়ে দেয়া যেতে পারে। দেশের উন্নতি এবং অগ্রগতি অব্যাহত রেখেও যাতে বায়ু দূষণ একেবারে সীমিত থাকে, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। ঝিলে-বিলে বাড়িঘর নির্মাণ করে পরিযায়ী পাখিদের কলরব স্তব্ধ করা ঠিক হবে না। প্রাণীদের স্থানান্তরের আগে বন বিভাগকে দেখতে হবে পরিবর্তিত বনের ভিন্ন পরিবেশ ও আবহাওয়া প্রেরিত বন্যপ্রাণীদের বাঁচার ও বৃদ্ধির অনুকূল কিনা। সেখানে তাদের বেঁচে থাকার জন্য পর্যাপ্ত পশু ও বনভূমি আছে কিনা। তা না হলে সংখ্যা বৃদ্ধি করতে গিয়ে সংখ্যা হ্রাসই হবে। দেখা গেছে যে সমস্ত প্রাণীকে সংরক্ষণ করলে আর্থিক ফায়দা হয় সেগুলো সংরক্ষণেরই বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে, আর যে সমস্ত প্রাণী সেই উদ্দেশ্য সাধনে অসমর্থ, তারা কাগজে-কলমে সংরক্ষিত বললেও হাজার হাজার এ জাতীয় প্রাণী ধীরে ধীরে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। তাই সামগ্রিকভাবে তাদের অকৃত্রিমভাবে ভালোবাসতে হবে এবং তাদের সঙ্গে সংযোগ পুনঃস্থাপন করতে হবে। বন্যা পশুপক্ষীদের অস্তিত্ব কিছুসংখ্যক মানুষের ওপর নির্ভর করবে, তা কখনও হতে পারে না। আর মনে রাখতে হবে, গাছপালা, বন, বন্যজন্তু, পশুপাখি না থাকলে মানুষের অস্তিত্বই একদিন বিলীন হয়ে যাবে। লেখক :সাংবাদিক