স্মরণ
ড. আব্দুল খালেক একজন মহান শিক্ষাবিদ
প্রকাশ : ১৬ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:১৪
গত ১৩ জানুয়ারি ছিল সিলেট শিক্ষা বোর্ডের প্রাক্তন চেয়ারম্যান আমাদের শ্রদ্ধেয় বড় ভাই অধ্যাপক ড. আব্দুল খালেকের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী।
ড. আব্দুল খালেক ছোটবেলা থেকেই অত্যন্ত মেধাবী, বিনয়ী এবং অমায়িক ব্যবহার ও বিনম্র স্বভাবের ছাত্র হিসেবে এলাকাতে অত্যন্ত সুপরিচিত ছিলেন। আমরা একই জনপদে পাবনা জেলার বেড়া-সাথিয়া থানার সানিলা করমজর পাশাপাশি গ্রামে বেড়ে উঠেছিলাম। খালেক ভাই আমার বেশ কয়েক বছরের সিনিয়র হলেও মন-মানসিকতা অভিন্ন হওয়ার কারণে ছোটবেলা থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমার সাথে তথা আমাদের পরিবারের সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। খালেক ভাই একাধারে আমার আত্মীয়, আমার সিনিয়র বন্ধু, আমার শিক্ষক এবং আমার কাছে একজন অনুকরণীয় আদর্শ ব্যক্তিত্ব ছিলেন। আমি যখন কলেজে পড়তাম খালেক ভাই তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ছিলেন। তিনি ছুটিতে বাড়ি আসলেই আমরা তার কাছে ইংরেজি পড়তাম এবং তখনই তার ইংরেজি ভাষায় পাণ্ডিত্ব দেখে মুগ্ধ হতাম। তার বাবা সরকারি কর্মকর্তা হওয়ায় বাবার কর্মস্থল নাটোর সেন্ট জোসেফ স্কুল (মিশনারী স্কুল) থেকে রাজশাহী বোর্ডে সম্মিলিত মেধা তালিকায় ৮ম স্থান অধিকার করে প্রথম বিভাগে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। খালেক ভাই পাবনা জেলার বেড়া কলেজ কেন্দ্রে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দেয়ার সময় তার ইংরেজি লেখা দেখে মুগ্ধ হয়ে পাবনার তত্কালীন জেলা প্রশাসক পরীক্ষার কেন্দ্রেই তাকে পুরস্কৃত করেছিলেন। এটি তখন পাবনা অঞ্চলে ভীষণ আলোড়ন জাগিয়েছিল। তিনি ইংরেজিতে লেটার মার্ক নিয়ে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। সে সময়ে তিনি মেডিক্যাল/ ইঞ্জিনিয়ারিং-এ পড়ার সুযোগ পেয়েও শিক্ষকতার মহান পেশায় আত্মনিয়োগ করার জন্য ইংরেজি সাহিত্যেই পড়ার সিদ্ধান্ত নেন।
১৯৮২ সালে নিয়মিত বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি বিসিএস (শিক্ষা) ক্যাডারে যোগদান করেন। খালেক ভাইয়ের যে মেধা ছিল তাতে তিনি অনায়াসে পররাষ্ট্র/ প্রশাসন বা অন্য যেকোন ক্যাডারে নিয়োগ পেতে পারতেন। কিন্তু শিক্ষকতার মহান পেশার প্রতি তার গভীর আগ্রহ থাকায় তিনি বিসিএস পরীক্ষায় প্রথম পছন্দই দিয়েছিলেন শিক্ষা ক্যাডার। চাকরিতে যোগদানের পরেও পড়াশুনার প্রতি তার প্রগাঢ় অনুরক্তি থাকার করণে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের স্বনামধন্য অধ্যাপক এবং বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে ইংরেজি সাহিত্যে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেন। আমি ইতোমধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স পাস করে সপ্তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৯৮৮ সালে প্রশাসন ক্যাডারে যোগদান করেছি। আমি যখন রংপুরে এনডিসি হিসাবে কর্মরত ছিলাম খালেক ভাই তখন ডেপুটেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডিতে অধ্যয়নরত। সে সময়ে আমি যখনই ঢাকায় আসতাম তখনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে তার সাথে দেখা করতাম। লাইব্রেরিতে আমি তাকে দেখেছি কীভাবে কঠোর সাধনায় নিমগ্ন থাকতেন। কঠোর পরিশ্রম ও একাগ্রতা নিয়ে সাধনা করে তিনি ইংরেজি সহিত্যে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেন। এভাবেই কঠোর সাধনা, নিরলস পরিশ্রম এবং নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার মাধ্যমে তিনি নিজেকে দেশের একজন শ্রেষ্ঠ শিক্ষাবিদ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
ড. আব্দুল খালেক শুধু একজন সফল শিক্ষকই ছিলেন না তিনি একজন দক্ষ প্রশাসকও ছিলেন। সিলেট শিক্ষা বোর্ডের জন্মলগ্ন থেকে তিনি সেখানে কর্মরত ছিলেন এবং তার হাতেই গড়ে উঠেছে সিলেট শিক্ষা বোর্ড। তিনি প্রায় ৭ বছর সিলেট শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে অত্যন্ত সততা, দক্ষতা, নিষ্ঠা ও সুনামের সাথে কাজ করে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। আমার জানামতে, শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের মত একটি স্পর্শকাতর পদে এত বছর ধরে সুনামের সাথে সফলভাবে কাজ করা একটি বিরল ঘটনা। তার সততা, দক্ষতা, বলিষ্ঠ নেতৃত্বদানের গুণাবলী, সজ্জন আচরণ এবং চারিত্রিক দৃঢ়তার করণেই এটি সম্ভব হয়েছিল।
জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় মূর্তিমান খালেক ভাইয়ের মাঝে খুঁজে পেতাম একজন অসাধারণ ভাল মানুষের প্রতিচ্ছবি। ড. খালেক-এর সততা, দক্ষতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, ধর্মপরায়ণতা, সজ্জন আচরণ, দেশপ্রেম, চারিত্রিক দৃঢ়তা, বলিষ্ঠ নেতৃত্বদানের গুণাবলী আমাদের সবার জন্য অনুপ্রেরণার উত্স হয়ে থাকবে।
লেখক :যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত মহাপরিচালক,
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)