[ আ ন্ত র্জা তি ক ]
শক্তি প্রদর্শনের মহড়ায় বাকযুদ্ধ:
ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক
আমীন আহম্মদ চৌধুরী, বীরবিক্রম
প্রকাশ : ১৭ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:০২
মনমোহন সিংহ হুঁশিয়ারি বাণী উচ্চারণ করলেন যে, ‘পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক চলতে পারে না’। বস্তুত কাশ্মীর সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ রেখা (যুদ্ধবিরতি রেখা) বরাবর দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে কয়েক দফা গুলি বিনিময় হয়েছে এবং এখনও সময় সময় হচ্ছে। ভারত অভিযোগ করেছে যে, ল্যান্স নায়েক হেমরাজের শিরশ্ছেদ করে নিয়ে গেছে পাক-সেনাবাহিনী। এই নৃশংস ঘটনার সাথে দায়ী এবং দোষীদের যথাযথ শাস্তি প্রদান করতে হবে বলে বলেছেন মনমোহন সিংহ। পাকিস্তান অভিযোগ করেছে যে, ভারতীয় ফায়ারে হাবিলদার আশরাফ নিহত হয়েছে। ভারত উত্তরে বলেছে যে, আত্মরক্ষা করতে গিয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনী ফায়ার করতে বাধ্য হয়েছিল। ভারতীয় সেনাপ্রধান হুঁশিয়ারি বাণী উচ্চারণ করে পাকিস্তানকে সতর্ক করে দিয়েছেন। দুই দেশের ডিজি অপারেশন ডাইরেক্টররা রেড টেলিফোনে কথা বললেও অগ্রগতি তেমন কিছু হয়নি। পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডায়লগ ওপেন করার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছেন। ভারত এখনও কিছু বলেনি। এদিকে ২০০৮ সালে মুম্বাইয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের চরম অবনতি হয়। তারপরও ভারত ৬৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়স্ক ব্যক্তিবর্গকে সর্বাধিক (কেরালা, পাঞ্জাব, মুম্বাই প্রবেশ নিষিদ্ধ) ৫টি জায়গায় ভ্রমণের জন্য ভিসা দিতে প্রস্তুত। মঙ্গলবার থেকে এই কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা। হঠাত্ করে সীমান্তে এই ধরনের উত্তেজনা। এদিকে পাকিস্তানে রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনিশ্চিতের দিকে যাচ্ছে। প্রধান বিচারপতি দেশের প্রধানমন্ত্রীকে দুর্নীতির দায়ে গ্রেফতারের হুকুম দিয়েছেন। তাতে করে বিশেষজ্ঞগণ মনে করছেন পিপিপির দিন ঘনিয়ে আসছে। সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের ভরসা একেবারে উবে গেছে। তাদের পক্ষে সীমান্তে এ ধরনের নাজুক পরিস্থিতি মোকাবিলা করা অত্যন্ত দুরূহ হবে। হঠাত্ করে এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করাতে সশস্ত্র বাহিনীসহ দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীদের কোন কালো হাত আছে কী না তা তলিয়ে দেখা একান্তভাবে অপরিহার্য।
কারগিলের উচ্চতার জন্য পাকিস্তান তুলনামূলক ভালো অবস্থানে আছে। কিন্তু ভারত সুযোগ পেলে কারগিলে ১৯৯৯ সালে তারা যে হঠাত্ করে নাজেহাল হয়েছেন তার প্রতিশোধ নিলে খুব আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। ভারত-পাকিস্তান ৪৭ সালে একবার কাশ্মীরে আত্মঘাতী যুদ্ধে ব্যাপৃত হয়েছিল। ১৯৬৫ সালে কাশ্মীর নিয়ে আবার যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত সরাসরি বাংলাদেশকে সাহায্য করে এবং বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। পরাজিত পাকিস্তান সুযোগ পেলে ভারতকে বেকায়দায় ফেলে অপমানজনক আত্মসমর্পণের বদলা নিতে চাইবে। ১৯৭১ সালে ভারত পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ সৃষ্টিতে পূর্বাহ্নে পূর্ববঙ্গকে কোন মদদ দেয়নি। পাকিস্তান তার ভুলের মাশুল দিতে গিয়ে শেষপর্যন্ত আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। পাকিস্তানের উচিত হবে রাজনৈতিক অবকাঠামোগুলো শক্তিশালী করে দেশে স্বচ্ছ ও সুস্থ রাজনৈতিক ধারা প্রবর্তন করা। সেটা না করে পাকিস্তান বারবার তাদের দেশকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। বারবার নিজেদের বোকামির মাশুল তাদেরকে দিতে হচ্ছে। সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে দুই দেশের তুলনামূলক আলোচনা করলে দেখা যাবে যে, ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান তার সীমিত সামরিক শক্তি নিয়ে ভারতের সাথে সমানে সমান লড়াই করেছিল। তার প্রধান কারণ যে, একটি সরকার তখন পাকিস্তানে ছিল যে সরকার অবৈধ হলেও ১১ বছর (তখন সাত বছর) দেশ শাসন করে মোটামুটি স্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিল। ফলে যুদ্ধে তারা অভিন্ন লক্ষ্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল। যদিও যুদ্ধের ফলে আইয়ূবের ক্ষমতার ভিত নড়বড়ে হয়ে যায়। ’৭১ সালের যুদ্ধে দেখা গেল অন্তর্দ্বন্দ্বে কাহিল পাকিস্তান মীরাজ উড়োজাহাজ নিয়েও আত্মসমর্পণ করতে হলো পূর্ব রণাঙ্গনে। পশ্চিম রণাঙ্গনে চাম্বজুরিতে ৫৬০ বর্গমাইল ভারতীয় ল্যান্ড দখল করতে পারলেও বাকী জায়গাগুলোতে ছয় হাজার বর্গমাইল এলাকা ভারতীয়রা দখল করে নেয়। ১৯৭১ সালে ভারতের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল ৮ লাখ ২৭ হাজারের মত আর পাকিস্তানের ৩ লাখ ৯২ হাজারের মত।
ভারত নিউক্লিয়ার পাওয়ার। সে নিজেই ওয়ারহেড স্থাপনে পারদর্শী। এমনকি নিউক্লিয়ার সাবমেরিনে নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড স্থাপনে ভারত সক্ষম। জাহাজে ধানূস, স্থলে অগ্নি, জলের তলদেশ/সাবমেরিনে সাগরিকা এবং আকাশে উড়োজাহাজ নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড স্থাপনে ভারত সক্ষম। ভারত ইতোমধ্যে মাল্টিলেয়ারড ব্লাস্টিক মিসাইল সিস্টেম ডেভেলপ করেছে। ১৯৯৯ সাল থেকে সে ডেভেলপ শুরু করেছে। এখন তা পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। ভারত যুদ্ধ সরঞ্জাম তৈরিতে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। বর্তমানে ভারতে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যসংখ্যা ১৪,৫০,০০০ জন (১.৪৫ মিলিয়ন) এবং ২.২ মিলিয়ন রিজার্ভ। ডিফেন্স বাজেট ৪৬.৮ বিলিয়ন ইউএস ডলার (জিডিপির ১.৯-২.৫ %)-৮তম বৃহত্তম সশস্ত্র বাহিনী। ভারতীয় সেনাবাহিনীর সদস্যসংখ্যা ১১,২৯,০০০ জন, নেভী ৫৮,৩৫০ জন (৬ষ্ঠ বৃহত্তম নেভী), এয়ারফোর্স- ১,২৭,২০০ জন এবং কোস্টগার্ড সদস্যসংখ্যা ৫,৫৫০ জন, প্যারামিলিটারি- ১৩,০০,৫৮৬ জন, পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যসংখ্যা সেনাবাহিনী ৫,৫০,০০০, রিজার্ভ ৫,০০,০০০ জন। নেভী-২২,০০০ জন। এয়ারফোর্স ৪৫,০০০। প্যারামিলিটারি ৩,০৪,০০০জন। পাকিস্তানের ৬০-৭০% সৈন্য ভারত-পাকিস্তান বর্ডারে মোতায়েন রয়েছে। ভারত-পাকিস্তান ছাড়াও চীনা বর্ডারে প্রায় ৮ ডিভিশন সৈন্য মোতায়েন করে রাখে। বাকিগুলো রিজার্ভ ও পাকিস্তান বর্ডারে মোতায়েন আছে। পাকিস্তানেও পরমাণু অস্ত্রের মজুদ আছে। চীন পাকিস্তানের বড় অস্ত্র সরবরাহকারী। কারাকুরাম হাইওয়ে দিয়ে চীন পাকিস্তানের সাথে সংযোগ স্থাপন করে যৌথ কমান্ড স্থাপনে সক্ষম। অন্যদিকে কারগিলের চূড়াগুলো পাকিস্তানের দখলে থাকায় সেখানে পাকিস্তানের অবস্থান খুব মজবুত। তবে চীন আসলে রাশিয়া কী বসে থাকবে? অন্যদিকে পাকিস্তান একাকী ভারতের সাথে লড়তে গিয়ে তেমন সুবিধা করতে পারবে বলে মনে হয় না। চীনের সাহায্য নিয়ে লড়াইতে অবতীর্ণ হলে ভারতকে কোণঠাসা করা হয়তবা সম্ভব। যদিও এখন পর্যন্ত চীন তার সামরিক বাহিনীকে কখনোই ব্যবহার করেনি। এমনকি ১৯৭১ সালেও করেনি। ভবিষ্যতে করবে এই ভরসা করা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ চীন এই মুহূর্তে তার অর্থনৈতিক উন্নতিতে বিভোর হয়ে আছে অথবা কোন যুদ্ধবিগ্রহে সে সহজে জড়াতে চাইবে না। চীন ভারতকে ১৯৬২ সালে লাদাখ এলাকাতে বলতে গেলে একেবারে নাজেহাল করে ছেড়ে দিয়েছিল। এরপর তার সশস্ত্র বাহিনী আর কোথাও সরাসরি যুদ্ধে শামিল হয়নি। ১৯৭৯ সালে ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে চীন তার এক ডিভিশন সৈন্য পাঠিয়েছিল, সেগুলো নাকি আর ফেরত আসতে পারেনি। ভারতের পক্ষে রাশিয়া বরাবর ছিল এবং এখনও থাকবে। বর্তমানে আমেরিকা ভারতের সাথে অনেক বেশি মাখামাখি করছে। পাকিস্তান থেকে এককালে আমেরিকা চীন ও সোভিয়েট ইউনিয়নের (রাশিয়া) উপর নজরদারি করতো। বর্তমানে তালেবানদের দাপটে আমেরিকার সেই ভরসাস্থলে চিড় ধরেছে। সুতরাং পাকিস্তানের পক্ষে কোন ধরনের যুদ্ধের ঝুঁকি নেয়া বোকামির শামিল হবে। পাকিস্তানকে তার ঘর সামলাতে হবে। আফগান বর্ডার/পাঠান এলাকাকে সামলাতে হবে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনতে হবে।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গন দুর্নীতিতে ভরে গেছে। মাথা থেকে পচন ধরেছে। গ্লোবালাইজেশনের নামে সরকারি ট্যাক্স, জনগণের আমানতের টাকা লুট করা, রাজনৈতিক অঙ্গনে জড়িত কর্তাব্যক্তি থেকে শুরু করে কর্মী প্রায় সবাই ব্যতিব্যস্ত। নৈতিক মূল্যবোধের এই ধরনের প্রচণ্ড ধসে রাজনৈতিক অঙ্গন কালো টাকার দাপটে কম্পমান। ভারত ও বাংলাদেশের বেলায় রাজনৈতিক দলসমূহের শক্ত অবস্থান, দুর্নীতিবাজ রাজনৈতিক নেতা-কর্মীকে ক্ষমতার বলয়ে অবস্থান করতে সাহায্য করছে। দশ চক্রে ভগবান ভূত হওয়ার মত। পাকিস্তানের অবস্থা তূলনামূলকভাবে অনেক বেশি নাজুক, অনেক বেশি শোচনীয় অবস্থা। সেখানে প্রধান বিচারপতি দেশের প্রধানমন্ত্রীকে গ্রেফতারের হুকুম দিয়েছেন, ফলে রাজনৈতিক ডামাডোলের চাপে পাকিস্তান। তাতে করে ইমরান খানের উঠে আসা হয়তবা সহজতর হতে পারে, যদি দেশে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন হয়। সে ক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনী যদি মনে করে তাদের অবস্থান পেছনের কাতারে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তাহলে তারা যদি ছোটখাটো বিবাদ লাগিয়ে জরুরি আইনের বলে নিজেদেরকে সামনের কাতারে নিয়ে আসতে সক্ষম হয় আর জেনারেল কীয়ানী (বা কিয়ানীর ছায়া) অবসরে না গিয়ে দ্বিতীয় ইনিংস খেলার সুযোগ পেলেও পেয়ে যেতে পারেন। তা না হলে হঠাত্ করে ভারতীয় এক ল্যান্স নায়েকের শিরশ্ছেদ করে তার মাথা নিয়ে এত মাথা ব্যথার উদ্রেক করার কী হেতু হতে পারে।
লেখক :অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা ও সাবেক রাষ্ট্রদূত
ইমেইল :sejach@gmail.com