শুধু কি মেয়েটিই ধর্ষিত হলো নাকি আমাদের বিবেকও

নারী মায়ের জাতি। মাকে সম্মান করতে বলা হয়েছে সবধর্মে। কিন্তু সেই নারীর প্রতি অবহেলা আর অসম্মানও যেন চিরাচরিত। যৌতুক, বাল্যবিবাহ, যৌন নির্যাতন, স্বামীর অত্যাচার এ সবই নারীকে সহ্য করতে হচ্ছে যুগযুগান্তর ধরে, সে শিক্ষিত হোক আর অশিক্ষিত নারী হোক। বর্তমানে নারীর প্রতি সহিংসতা যেন আরও বেড়েছে। পত্রিকার পাতা খুললেই দেখা যায় অজস্র ঘটনা। সবই যেন গা সওয়া হয়ে গেছে। যৌতুক, বাল্যবিবাহ, সম্ভ্রমহানি, পাচার—কি না ঘটছে আমাদের এ সমাজে। কিন্তু মজার বিষয় হলো, যখন একটা ঘটনা ঘটে তখন আমরা দু’দিন মানববন্ধন করে, মোমবাতি জ্বেলে চুপ হয়ে যাই। হয়ে গেল আমাদের প্রতিবাদ!! কিন্তু এগুলোই কি প্রকৃত সমস্যার সমাধান? কি হচ্ছে আমাদের চারপাশে? কেন আজ আমাদের সন্তানেরা তাদের নিজেদের ঘরে নিরাপদ নয়? কেন বাকপ্রতিবন্ধী বাবাকে চোখের জ্বলে এই সমাজের কাছে অপরাধীদের বিচার চাইতে হয়? ক্ষমতাসীনেরা আইন প্রণয়ন করেই খালাস। কিন্তু আজকে আইনের বাস্তব প্রয়োগ কোথায়? শুধু কাগজে-কলমে আইন প্রণয়ন করলেই কি এসব সমস্যার সমাধান করা যাবে? অবশ্য আইন যারা প্রয়োগ করবেন, যারা মূল দায়িত্ব নেবেন তারা তো শুধু ক্ষমতার ভোগ-বিলাসে ব্যস্ত। কে কতটুকু খেতে পারল, আর কে কতটুকু ভোগ করতে পারল, কার বদনাম কে কতখানি করতে পারল সেটা নিয়েই ব্যস্ত সময় কাটে আমাদের সরকার আর বিরোধীদলীয় নেতা-নেত্রীদের। আর মানবাধিকার কর্মী সংগঠনগুলো মানববন্ধন করে আর মোমবাতি প্রজ্বলন করেই দায়িত্ব শেষ করে। গত কয়েকদিনের বিক্ষিপ্ত কয়েকটি ঘটনা— বিবেককে নাড়া না দিয়ে পারে না। ১১ জানুয়ারি শুক্রবার নীলফামারিতে ধর্ষিত হয়েছে চতুর্থ শ্রেণি পড়ুয়া এক ছাত্রী। ১৩ জানুয়ারী ধর্ষিত হয়েছে রাজবাড়িতে পাঁচ বছরের এক স্কুলপড়ুয়া শিশু। এই ঘটনা দুটিই আমাদের বুঝিয়ে দেয় যে, আমাদের সন্তানেরা আসলে কতটা অসহায় এই সমাজে। আমরা পারছি না শিশুর জন্য নিরাপদ পৃথিবীর শ্লোগান দিয়েও একটি নিরাপদ সমাজ ব্যবস্থা গড়ে দিতে। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে আমাদের পরিবার অথবা প্রতিবেশি নিকটজনেরা। ফলে আমাদের মনে মানুষের প্রতি বিশ্বাসের জায়গাগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে খুব দ্রুত। মানবতার প্রতি এ এক চরম প্রহসন। আমাদের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা আজ খুবই নাজুক অবস্থার মধ্যে আছে। যার প্রমাণ মেলে উপরিউক্ত ঘটনা দুটির মধ্য দিয়ে। যৌন নির্যাতন আমাদের দেশে এত বেড়েছে যে, পাঁচ বছরের বাচ্চাও তার থেকে বাদ যায় না। তাহলে আমাদের সর্বস্তরের নারীরা কোথায় নিরাপদ? মানুষ হয়ে মানুষকে বিশ্বাস না করতে পারাটা কি যন্ত্রণার নয়? আমরা পারছি না আমাদের সন্তানদের, যারা ভবিষ্যতে আমাদের এ দেশকে নেতৃত্ব দেবে তাদের রক্ষা করতে। এ কি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ হিসেবে আমাদের চরম ব্যর্থতা নয়! আমরা কি পারি না যারা ধর্ষণের মতো নোংরা কাজগুলো করছে তাদেরকে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড দিতে? দু’একজন ধর্ষককে মৃত্যুদণ্ড দিলে এ দেশে ধর্ষণের হার কমে যেত আশাতীতভাবে। আমরা কেন শুধু মুখে মুখে বোলচাল ছেড়েই কিছু সময়ের জন্য ঘটনা ধামাচাপা দিয়ে দিচ্ছি? পাঁচ বছরের যে বাচ্চাটি ধর্ষিত হলো সে কি আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল না যে সে শুধু ধর্ষিত হয়নি, ধর্ষিত হয়েছে আমাদের বিবেকও? আমাদের সমাজ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন সাধন করা জরুরী প্রয়োজন। একজন মানুষ মায়ের পেট থেকে জন্ম নিয়েই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয় না। অবশ্যই এই সমাজের কিছু অনিয়ম আর দুর্নীতি আমাদেরকে বাধ্য করে অপরাধ সংগঠন করতে। প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে সর্বপ্রথমে, জাগ্রত করতে হবে আমাদের বিবেককে। বিবেক বোধই মানুষের সবচেয়ে বড় আদালত। শিশুদেরকে ছোটকাল থেকেই প্রকৃত সামাজিকীকরণ করতে হবে। আর এর মূল দায়িত্ব নিতে হবে আমাদের পরিবারকে। পরিবর্তন আসতে হবে সমাজের মাথা থেকে। মাননীয় নেতা-নেত্রীদের উদ্দেশে বলছি, আপনারা কি একটিবার নিজেদের আখের গোছানো বাদ দিয়ে আর একে অন্যের বদনাম করা বাদ দিয়ে সমাজ পরিবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে সত্যিকার অর্থে আমাদের পাশে এসে দাঁড়াবেন? না হলে এভাবে বার বারই আমাদের বিবেক আর মানবতা ধর্ষিত হবে গুটিকতক মানুষরূপী জানোয়ারের হাতে। লেখক :ব্যাংকার