বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের উন্নতি-অবনতি প্রসঙ্গে
প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:০২
স্যামুয়েল পি হান্টিংটন গত শতাব্দীর শেষ দশকের সূচনালগ্নকে বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের ‘তৃতীয় ঢেউ’ হিসাবে চিহ্নিত করিয়াছিলেন। সমপ্রতি আরব বিশ্বে যাহা ঘটিয়াছে তাহাকে কেহ চাহিলে গণতন্ত্রের ‘চতুর্থ ঢেউ’ বলিলেও বলিতে পারেন। একের পর এক স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়াছে, তদস্থলে নানান বাধা-বিঘ্নের ভিতর দিয়া হইলেও নির্বাচিত সরকারের দেখা মিলিতেছে। বিশ্বজুড়িয়া উদারনীতিক মানুষজনের খুশী হইবার মত বিষয় বটে। কিন্তু বৈশ্বিক পরিসরে দেখিলে আরবের রাজনৈতিক বসন্ত মুদ্রার একটি পিঠ। বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা লইয়া গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান ফ্রিডম হাউসের বার্ষিক প্রতিবেদনের দিকে তাকাইলে মুদ্রার অপর দিকটি খুব একটা আশাপ্রদ বলিয়া মনে হইতেছে না।
ফ্রিডম হাউসের গবেষণামতে গত বত্সর পৃথিবীতে ‘মুক্ত’ রাষ্ট্রের সংখ্যা ছিল ৯০টি, যাহা পূর্ববর্তী বত্সর অপেক্ষা ৩টি অধিক। তালিকায় স্থানপ্রাপ্ত রাষ্ট্রগুলির মধ্যে ২৭টিতে গণতন্ত্রের বড় ধরনের অবনমন ঘটিয়াছে; পক্ষান্তরে উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটিয়াছে মাত্র ১৬টি রাষ্ট্রে। আরও নিরাশার বিষয় এই যে, এই লইয়া টানা সাত বত্সর ধরিয়া গণতন্ত্রের পথে উন্নতিকারী রাষ্ট্রের তুলনায় অবনতিশীল রাষ্ট্রের সংখ্যা অধিক হইতেছে। ফ্রিডম হাউসের মূল্যায়ন পদ্ধতি লইয়া কেহ চাহিলে হয়তো প্রশ্ন তুলিতে পারিবেন। কিন্তু পৃথিবীর নানান প্রান্তে নানান দেশে ভিন্নমতাবলম্বী, সিভিল সমাজ ও মিডিয়ার বিরুদ্ধে পরিচালিত গণতন্ত্রবিনাশী কর্মকাণ্ডের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করিলে গণতন্ত্রের ভবিষ্যত্ লইয়া আশঙ্কা জাগিবারই কথা। সন্দেহ নাই, লিবিয়া, তিউনিসিয়া ও মিয়ানমারের মত দেশগুলিতে নানান প্রতিকূলতা সত্ত্বেও গণতন্ত্রের অগ্রগতি ঘটিয়াছে। অনেক সীমাবদ্ধতা দৃশ্যমান হইলেও মিসরের মত দেশ কিছুটা হইলেও উন্নতি করিয়াছে। কিন্তু আরব বসন্তের হাওয়া লাগা অনেকগুলি দেশ যেমন ইরাক, জর্দান, কুয়েত, লেবানন, ওমান, সিরিয়া বা আরব আমিরাতের মত দেশে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার অবনতি ঘটিয়াছে। এইদিকে বৃহত্ শক্তি রাশিয়ার ক্ষমতাসীনরা যেনবা একেবারে পরিকল্পনা করিয়া রুশী গণতন্ত্রের অবশিষ্টাংশও ধ্বংস করিয়া ফেলিতে চাহিতেছে। মালি, মালদ্বীপ, গিনি বিসাউয়ের মত কম আলোচিত দেশ গণতন্ত্র বিসর্জন দিয়াছে বিগত বত্সরটিতে। সোমালিয়া, সৌদি আরব, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান, ইরিত্রিয়ার মত দেশগুলি রাজনৈতিক ও নাগরিক স্বাধীনতার সকল মানদণ্ডে নিজেদের অবনমন ঘটাইয়াছে। গত অর্ধদশকে অদৃষ্টপূর্ব রাজনৈতিক উন্নয়ন সাধনকারী দেশ হিমালয়দুহিতা নেপালে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা থমকিয়াই গিয়াছে বলিতে গেলে।
গণতন্ত্রের চলতি মডেলটির নানাবিধ সীমাবদ্ধতা রহিয়াছে। কিন্তু ইহা অপেক্ষা উন্নততর, সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকের নিকট গ্রহণযোগ্য অপর কোন শাসনব্যবস্থা আপাতত বিশ্ববাসীর সামনে নাই। দেশজ গণতন্ত্রের কথা ভাবিবার সময় বিশেষজ্ঞরা সঠিকভাবেই ইহার সহিত স্থানীয় পর্যায়ে তথা তৃণমূলে গণতন্ত্র বিকাশের উপরে গুরুত্ব আরোপ করিয়া থাকেন। কিন্তু আমাদিগকে স্মরণ রাখিতে হইবে যে, একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে আসিয়া গণতন্ত্রের দেশজ সাফল্যের উপরে নির্ভর করিয়া নিশ্চিন্তে বসিয়া থাকিবার অবকাশ নাই। প্রতিবেশী দেশ কিংবা ভৌগোলিকভাবে নিকটবর্তী অঞ্চলের (এমনকি সুদূরবর্তী) কোন দেশে বা দেশগুলিতে গণতন্ত্র-ঘাটতি রাজনৈতিক সুনামী হইয়া কোন একটি দেশকে আঘাত করিতে পারে। প্রযুক্তি ও পুঁজির বিশ্বায়নের এই যুগে এই আশঙ্কা এতটুকু অমূলক নহে। এহেন বাস্তবতাতে স্ব-দেশের গণতন্ত্র-ঘাটতি পূরণে সোচ্চার হইবার সাথে-সাথে নিজেদিগের রাজনৈতিক সীমানার বাহিরেও দৃষ্টি প্রসারিত করিবার সময় আসিয়াছে। জাতীয়তাবাদের সংকীর্ণতাই শেষ কথা নহে; যাহারা নিজেদিগকে অগ্রসর মানুষ মনে করেন বিশ্বজনীনতার মহান আদর্শের কথাও তাহারা স্মরণে রাখিবেন।