উপেক্ষিত শিক্ষক সমাজ বনাম সরকার

শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড হলে শিক্ষকরা তার কারিগর। পুরো জাতি আজ মেরুদণ্ড ব্যথায় (ব্যাক পেইন) ভুগছে, মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারছে না। সরকার সেই মেরুদণ্ডের ওপর আঘাত হেনেছে আবারও। এ যেন মরার ওপর খাঁড়ার ঘা। যে কারিগর জাতি গঠন করবে, সে আজ রাষ্ট্রীয় আক্রমণের শিকার। এ শিক্ষক সমাজ জাতি গঠনে ভবিষ্যতে কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারবে তা প্রশ্ন উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী হয়তো ভুলে গেছেন তার শিক্ষকদের সম্মানের কথা, কারণ এখন তিনিই অধিক সম্মানিত। শিক্ষামন্ত্রী হয়তো শিক্ষকদের মর্যাদা ভুলে গেছেন, কারণ তিনি বৃদ্ধ এবং তার ছেলে-মেয়েরা হয়তো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করে ফেলেছে। পুলিশেরও কী মনে পড়েনি তার বাচ্চাকে এই শিক্ষকরাই পড়ায়! পাঁচ দফা দাবিতে অনেক আগে থেকেই নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোট-এর ব্যানারে কর্মচারীরা বিক্ষোভ করে আসছেন। দাবীগুলো হচ্ছে: চলতি অর্থবছরে স্বীকৃতি পাওয়া সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা, স্বীকৃতির সময়কাল থেকে চাকরির বয়স গণনা করা, এমপিওর ক্ষেত্রে এমপিওদের ডিও লেটার দেয়ার প্রথা বিলুপ্ত করা, এমপিও প্রদানে অনিয়ম, ঘুষ ও দুর্নীতি বন্ধ করা এবং স্বীকৃতি পাওয়া সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্তি শেষ না হওয়া পর্যন্ত নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন না দেয়া। এগুলো আমার কাছে কোনো অযৌক্তিক দাবী মনে হয়নি। তবে সরকার এখানে মৌলবাদীদের ষড়যন্ত্রের গন্ধ পেয়েছেন। আমি অবহেলিত শিক্ষকদের মানবেতর জীবন-যাপন ও বেহাল দশার গন্ধ ছাড়া অন্য কিছু পাইনি। শিক্ষকরা সকল সরকারের আমলেই উপেক্ষিত হয়েছেন। তাদের বেতন-ভাতা যথেষ্ট নয়। সরকার কোচিং বন্ধে নীতিমালা করেছে। ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায় প্রচারিত এক রিপোর্টে, মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য তুলে ধরা হলো। কোন এক শিক্ষক বললেন,“আমি বেতন পাই ১৯,০০০ টাকা, এ এলাকায় বাসা ভাড়া ২০,০০০ টাকা। শিক্ষামন্ত্রী অনেক কিছুই বলছেন, এখন আমি কি রাস্তায় কলা বিক্রি করব না শিক্ষামন্ত্রীর বাড়ির সামনে মাছ বিক্রি করব?” শিক্ষক ঠিকই বলেছেন। স্কুলের, কলেজের শিক্ষকদের বেতন স্কেল কত, আর তাদের জীবনধারণের জন্য খরচ কত, সরকার কি সে বিষয়টি ভেবে দেখেছে? বার বার তেল, গ্যাস, বিদ্যুত্সহ সকল নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়ানো হচ্ছে, এমপি-মন্ত্রীদের বেতন-ভাতাও বাড়ানো হয়েছে সরকার ক্ষমতায় আসার পর, এই বাজারে অপ্রতুল বলে। কিন্তু শিক্ষকদের বেতন কতবার বাড়ানো হয়েছে? শিক্ষকরা কি তবে মহল্লার মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনের মত শিক্ষার্থীদের বাড়ি ঘুরে ঘুরে তিনবেলা খাবেন আর বিদ্যালয়ের বারান্দায় শুয়ে থাকবেন? তাদের কি সংসার, ছেলে-মেয়ে নেই? ছেলে-মেয়েদের পড়াশুনা ও জীবনধারণের খরচ নেই? দেশের শিক্ষা আজ সেবার পর্যায় থেকে পণ্যে পরিণত হয়েছে। শিক্ষকদের মর্যাদা তাই গুরুর আসন থেকে চাকরিজীবী বা কর্মচারীর আসনে নেমে এসেছে। প্রাথমিক বা মাধ্যমিক পর্যায়ের একজন শিক্ষকের বেতন-ভাতা ঐ স্তরের একজন শিক্ষার্থীর মাসিক পড়াশুনা বাবদ খরচের কম। যাদের যথেষ্ট টাকা-পয়সা রয়েছে তারাই মানসম্মত শিক্ষা পাচ্ছে। শিক্ষাকে প্রাইভেটাইজেশন-এর চক্রান্ত চলছে। বিশ্বব্যাংক শিক্ষাক্ষেত্রে ভর্তুকি কমানোর জন্য সরকারকে সুপারিশ করে যাচ্ছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইভনিং প্রোগ্রাম চালু করা হয়েছে। শিক্ষার মাধ্যমে আয়ের মানসিকতা, শিক্ষাকে পণ্য হিসাবে বিবেচনা করার কারণে হয়েছে। শিক্ষাকে পণ্যে রূপান্তরিত করলে শিক্ষার্থীরা সার্টিফিকেট কিনবে ঠিকই, প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে না। দীর্ঘ মেয়াদে জাতি নেতৃত্ব সংকটে পড়বে। সরকার জাতি গঠনে দীর্ঘ মেয়াদে পরিকল্পনা না করলে এ অবস্থার উন্নতি সম্ভব নয়। শিক্ষকদের মর্যাদা যে দেশের সরকার দিতে পারে না, সে দেশের আর যাই হোক, জাতি উন্নতি লাভ করবে না। নির্ভরশীল হয়ে পড়ে থাকবে অন্যের ওপর। যে শিক্ষককে তার জীবন ধারণের চিন্তায় ব্যস্ত থাকতে হয়, সে শিক্ষকের কাছ থেকে কতটুকুই বা আশা করতে পারি আমরা? যে রিকশাচালককে সারাদিন পরিশ্রম করতে হয় তিনবেলা রুজি জোগাড় করতে, তার পক্ষে যেমনি দেশ ও রাজনীতি নিয়ে চিন্তা করার সময় হয় না, তাকে দোষারোপ করাও সমীচিন নয়। তেমনি আমাদের শিক্ষকসমাজের কাছ থেকেও জাতি গঠনে ভূমিকা আশা করা বৃথা। জিডিপি-জিএনপি দিয়ে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মুখরোচক আলোচনা সম্ভব হলেও, এমন এক সম্মানিত পেশাকে এভাবে অবহেলায় রেখে দেশের উন্নয়ন কতটুকু সম্ভব সে প্রশ্নের উত্তর অজানাই থেকে যায়। লেখক:বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক