স্মরণ
বাবাকে যেমন দেখেছি
প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:০৪
সুবোধ মিত্র- এক বিপ্লবী নাম। তার জ্বালাময়ী বক্তৃতার কথা এখনো অনেকেই স্মরণ করেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে তিনি জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন স্বাধীনতাযুদ্ধের একজন অন্যতম সংগঠক। তিনি বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটিরও সদস্য ছিলেন। ২০ জানুয়ারি তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০০৭ সালের ২০ জানুয়ারি শনিবার সকাল নয়টা ১০ মিনিটে ৭৯ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ছোট বেলায় বাবাকে খুব একটা কাছে পাইনি। রাজনীতির কারণে তিনি বরাবরই এখানে-সেখানে ঘুুরে বেড়িয়েছেন।
আমার বাবা সুবোধ মিত্রের জন্ম ১৯২৮ সালের ১২ মার্চ যশোর জেলার কেশবপুর থানার বুড়িভদ্রা নদীর তীরে বালিয়াডাঙ্গা গ্রামে। ঠাকুর দাদা ছিলেন বনগাঁ আরএস অফিসের পোস্ট মাস্টার। সে কারণে বাবার লেখাপড়া হাতেখড়ি বনগাঁ মডেল প্রাইমারি স্কুলে। ১৯৪২ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে ভারত ছাড় আন্দোলনের সপক্ষে এক ছাত্র মিছিলে নেতৃত্ব দেয়ার কারণে জীবনে প্রথম তিনি একদিনের জন্য কারাবরণ করেন।
রাজনীতির প্রতি প্রবল আগ্রহ থাকায় লেখাপড়া ব্যাহত হতে পারে ভেবে ঠাকুর দাদা আমার ঠাকুরমা বাবাকে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। গ্রামে ফিরে তিনি কেশবপুর এক্সটেন ট্রেড এম ই স্কুলে ক্লাস সেভেনে ভর্তি হলেন। ১৯৪৬ সালে পাঁজিয়া হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর কলকাতার রিপন কলেজ (বর্তমান সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে আইএসসি পাস করেন।
মায়ের কাছে শুনেছি বাবা ছিলেন একজন অত্যন্ত ব্যক্তিত্ববান পুরুষ। তবে সংসারের প্রতি ছিলেন উদাসীন। বাবার ব্যক্তিত্বকে মা খুব পছন্দ করতেন এ কারণে তার রাজনীতিসহ সব ক্ষেত্রে বাবাকে খুব সহযোগিতা করতেন তিনি।
বিশিষ্ট চিকিত্সক ডা. দ্বিজেন্দ্রনাথ চ্যাটার্জির সহযোগিতায় বাবা কেশবপুর কংগ্রেস পার্টির কমিটি গঠন করেন। তিনি এ কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। আওয়ামী মুসলীম লীগ থেকে আওয়ামী লীগ হওয়ার পর তিনি আওয়ামী লীগে যোগদান করেন।
১৯৫৮ সালে যশোরের মরহুম মশিউর রহমানের বাসায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে প্রথম পরিচিত হয়েছিলেন বাবা। পাকিস্তান আমলে শেষের দিকে বাবা ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সম্পাদক এবং পরবর্তীকালে সহ-সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।
১৯৬৪ সালে তত্কালীন সরকারের বিরুদ্ধে দাঙ্গার পটভূমি ব্যাখ্যা করে এক বক্তব্য দেয়ার কারণে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় গ্রেফতার হন। ১৯৬৫ সালে তিনি পুনরায় ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের কারণে ডিফেন্স অব পাকিস্তান রুলসে গ্রেফতার হন। বঙ্গবন্ধুর খুব কাছের মানুষ হওয়ার সুবাদে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে (বর্তমান-৬) কেশবপুর, মনিরামপুর, অভয়নগর নির্বাচনী এলাকা থেকে আওয়ামী লীগের হয়ে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭০ সালের ১০ অক্টোবর চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানে জনসভায় ৩ ঘন্টা ৩৯ মিনিট বক্তৃতা দিয়ে সারা দেশে আলোড়ন তুলেছিলেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি ১৪বার কারবরণ করেন। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী এ মানুষটি অপরের কল্যাণে সদা ব্যস্ত থাকতেন। বাবার রাজনৈতিক দর্শন বঙ্গবন্ধুর একান্ত সহযোগী হিসেবে তার ভাষণ, তার জনহিতকর কর্মকাণ্ড, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আহমদুল কবির স্মৃতি স্বর্ণপদক প্রবর্তনসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ড রয়েছে।
বাবার মৃত্যুর পর অনেক চিন্তা করেছি কিভাবে তাকে স্মরণীয় করে রাখা যায়। তার সন্তান হয়েও তার মত সামাজিক তথা দেশের উন্নয়নে কাজ করার ইচ্ছা থাকলেও হয়তো যোগ্যতা অর্জন কিংবা সুযোগের অভাবে হয়ে উঠেনি। একান্ত প্রাণের ইচ্ছা বাবার স্মৃতি রক্ষার্থে এবং তার চিন্তা-চেতনার অসমাপ্ত কাজগুলো করার মানসিকতা নিয়ে বিভিন্ন জাতীয় সামাজিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে সর্বসাধারণের মাঝে থাকতে। বাবার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে প্রবর্তন করা হয়েছিল সমাজের মানুষের কল্যাণে বিশেষ অবদানের জন্য প্রতিবছর একজন ব্যক্তিকে পুরস্কৃত করা হবে। তাই তো তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদানের জন্য পদক দেয়া হয়েছিল কেশবপুরের কৃতি সন্তান শ্যামল সরকারকে। তারই ধারাবাহিকতায় এ বছর তার ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে কেশবপুরের আর এক কৃতিসন্তান সাংবাদিক এস কে মোস্তফা ফিরোজকে পদক প্রদান করা হচ্ছে।
লেখক :সুবোধ মিত্রের ছেলে।