[ রা জ নী তি ]

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ:একটি বিশ্লেষণ

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের চার বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১১ জানুয়ারি, ২০১৩ তারিখে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়েছেন। সরকারের চার বছর পূর্তিতে এ ধরনের ভাষণ সরকারের একটি রুটিন ওয়ার্কের মধ্যে পড়ে। কিন্তু এবারের ভাষণটি অন্যান্য ভাষণের তুলনায় অনেক তাত্পর্য বহন করে। বাংলাদেশে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে পাঁচ বছরের জন্য সরকার গঠিত হয়। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পাঁচ বছর ইতোমধ্যে পূর্ণ হয়েছে। অবশিষ্ট আছে মাত্র এক বছর। বাংলাদেশে সরকারের শেষ বছর অর্থাত্ পঞ্চম বছর কাটে বিরোধী দলের নানামুখী আন্দোলন-সংগ্রাম মোকাবেলা করে। এ জন্য ১১ জানুয়ারি তারিখে দেয়া ভাষণকে ‘প্রধানমন্ত্রীর প্রাক উপসংহার ভাষণ’ বলা যেতে পারে। প্রাককথন থেকে প্রাক-উপসংহারে মূল বিষয়বস্তু সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়া যায়। এটা কী গ্রন্থ বা প্রবন্ধ রচনা কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠান বা সরকার, সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সরকারের চার বছর পূর্তিতে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ জনগণের কাছে বহুল প্রত্যাশিত ছিলো। প্রত্যাশার জায়গাটি ছিলো বাংলাদেশের রাজনীতিতে অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়া আগামী নির্বাচনকালীন ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ফিরে আসবে কী না? কিংবা কোন্ সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, সে প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর মনোভাব কী? জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এটা আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরবেন বলে অনেকেই মনে করেছিলেন। আনুষ্ঠানিক বলছি এ জন্য যে, প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারের বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তিগণ আগামী নির্বাচনকালে সরকার ব্যবস্থার ধরন নিয়ে নানা ধরনের কথাবার্তা বলছেন। বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্নভাবে প্রধানমন্ত্রী, দলের সাধারণ সম্পাদক, যুগ্ম সম্পাদক, আইন প্রতিমন্ত্রীর মতো অন্যান্য ছোট-খাট মন্ত্রীরাও ইচ্ছেমতো মন্তব্য করছেন। এমতাবস্থায় জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া প্রদত্ত ভাষণে প্রধানমন্ত্রী যদি এ ব্যাপারে সরকারের মনোভাব প্রকাশ করতেন, তা আনুষ্ঠানিক বক্তব্য হিসেবে গণ্য হতো। কিন্তু এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী কিছু না বলায় ভাষণটি পূর্ণতার দিক থেকে অপূর্ণ রয়ে গেছে। যদিও ভাষণ প্রদানের পরের দিন অর্থাত্ ১২ জানুয়ারি গণভবনে আইনজীবীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ্য করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রসঙ্গে বলেছেন, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমাকে এবং তাকে জেলে পুরেছিল। তার দুই সন্তানকেও তত্ত্বাবধায়ক সরকার জেলে পুরেছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকার আবার ক্ষমতায় এলে তিনি কী পার পাবেন? তাকে আবারও জেলে যেতে হতে পারে।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ ধরনের কথা এর আগেও অনেক বলেছেন। বিরোধী দলীয় নেতাকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেছেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এলে কী তাকে চ্যাংদোলা করে ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে?’ এ ধরনের কথাবার্তার চর্চা আমরা সড়ক পরিবহন শ্রমিক নেতা-কর্মী কিংবা ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বারদের মুখে শুনে থাকি। প্রধানমন্ত্রীর কথা শিক্ষণীয় হয়, হয় অনুকরণীয়। আমরা কী এ ধরনের ভাষা শিখবো? যা হোক, প্রধানমন্ত্রী হয়তো মনে করেছেন, আদালতের নির্দেশনার আলোকে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করা হয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনেই আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সুতরাং জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে এ বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করার প্রয়োজন নেই। আমরা মনে করি, তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রসঙ্গে শেখ হাসিনার মনোভাব পুরো জাতির মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ নয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি কারা চায় না? অতীতে লক্ষণীয় যে, যারা ক্ষমতাসীন, ন্যায্য-অন্যায্য সুবিধাপ্রাপ্ত, দুর্নীতিতে জড়িত, অপকর্মে লিপ্ত, কৃতকর্মের জন্য শংকিত; তারা নির্দলীয় ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার চায় না। পক্ষান্তরে, ক্ষমতার বাইরে রাজনৈতিক দলগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রর্বতনের দাবিতে সোচ্চার থাকে। এখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আবার ক্ষমতায় এলে ভয় প্রধানমন্ত্রী তথা সরকারি দলের নেতা-কর্মীদের। কারণ, ক্ষমতাকে অপব্যবহার করে নানা ধরনের অপকর্ম করেছেন সরকারি ক্ষমতায় সংশ্লিষ্ট লোকজন। ক্ষমতার বাইরে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের অপকর্ম করার সুযোগই নেই। তারা সময় কাটিয়েছে দৌড়ের ওপর। সুতরাং তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারি দলের অন্য নেতা-কর্মীদের বিরোধিতা যে নিজেদের রক্ষার চেষ্টা, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে সরকারের উন্নয়নের বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। এটা স্বাভাবিক। সবাই তার সাফল্য প্রচার করতে চায়। কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রশাসনে ‘জবাবদিহিতা’ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতার জবাবদিহিতা থাকলে ভাষণটি আরো অর্থবহ হতো। ভাষণে তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলেছেন। সংঘাতের পথ পরিহারের কথা বলেছেন। জাতিসংঘে বাংলাদেশের উন্নয়নের মডেল উপস্থাপন এবং গৃহীত হওয়ার কথা বলেছেন। সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সাফল্যের কথা বলেছেন। যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার বিষয়টি পুনরুল্লেখ করেছেন। এ ব্যাপারে বিরোধী দলকে উদ্দেশ্য করে হুঁসিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের, বিপক্ষের কথা। শেয়ারবাজারের মন্দাভাব তুলে ধরেছেন। সমুদ্র বিজয় থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্য অর্জনের কথা বলেছেন। উন্নয়নের গতি অব্যাহত রাখতে পুনরায় ভোট দিয়ে নির্বাচিত করার আহবান জানিয়েছেন। আমরা প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের সার সংক্ষেপ করলে বলতে পারি যে, তার সরকারের সাফল্যের সব বিবরণ পুরোপুরি সত্য নয়। এ সরকারের সময়ে মানুষের আয় বেড়েছে কয়েকগুণ, কিন্তু ব্যয় বেড়েছে বহুগুণ। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সঙ্গতি না থাকায় মানুষ বাজারে গিয়ে প্রতিনিয়ত হিমশিম খায়। খুন, অপহরণ, চুরি, ছিনতাই, গুম, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক মানুষ হত্যা প্রভৃতি সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধির বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের কথা কী বলা যায়? রাস্তায় বেরুলে হেলপার বলে উঠে, ‘ওস্তাদ সাবধান! সামনে আবুল’। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে তৈরিকৃত রাস্তাঘাট আবুল হোসেন মেরামত, সংস্কার কিছুই করেননি। তেমন কোনো উন্নতি করতে পারছেন না নতুন যোগাযোগমন্ত্রীও। অষুধের দোকানে কোরাসেট বেল্টের এখন অনেক চাহিদা। ভাঙ্গা, এবড়ো-থেবড়ো রাস্তায় চলাচল করতে গিয়ে নিত্য যাতায়াতকারী লোকজনের কোমর ভেঙ্গে গেছে। কোরাসেট বেল্ট লাগিয়ে তারা কোমর রক্ষার চেষ্টা করছে। দক্ষিণাঞ্চলের ছয় কোটি মানুষের স্বপ্নের পদ্মা সেতু আবুল যে ডুবিয়ে দিয়ে গেছেন, তা এখনো দৃশ্যমান হচ্ছে না। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান সত্যের অপলাপ মাত্র। আবুল হোসেনসহ দুর্নীতিবাজ মন্ত্রীদের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী সাফাই গেয়েছেন। রেলের প্রকৃত কালো বিড়াল কোন্ অদৃশ্য কারণে এখনো মন্ত্রী পরিষদে বহাল রয়েছেন? আমি ব্যক্তিগতভাবে যে কোনো হত্যাকাণ্ড, অপরাধের বিচারের পক্ষে। যুদ্ধাপরাধীরাও এ আওতার মধ্যে পড়ে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তিবিশেষের জন্য বিশেষ আনুকূল্য এবং কারো জন্য খড়গ হওয়া উচিত নয়। সরকারি দলের মধ্যে যে যুদ্ধাপরাধী রয়েছে, তাদের বিচারের আওতায় আনা হলে এ বিতর্কের অবসান হতো। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আওয়ামী লীগের একটি রাজনৈতিক এজেন্ডা। এটি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও ছিলো। কিন্তু এটি একটি অবস্তুগত কাজ। জনকল্যাণমুখী কাজ বলতে বস্তুগত কাজকে বুঝায়। আমরা লক্ষ্য করছি যে, বর্তমান সরকার এই অবস্তুগত কাজকে প্রাধান্য দিয়ে এগুচ্ছে। এবং এটাকে কেন্দ্র করে বিশেষ করে দ্রুত বিচারকাজ সম্পন্ন করা-না করা নিয়ে সরকারের ভেতর এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। আমরা মনে করি, সরকার বস্তুগত কাজ নিয়ে এগুলে জনকল্যাণমুখী কাজের গতি ত্বরান্বিত হতো। প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারের অন্য ব্যক্তিগণ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বলে যে প্রচারণা চালাচ্ছেন, তা এক ধরনের প্রতারণা। এই প্রতারণা সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের যুদ্ধনীতির সঙ্গে সাদৃশ্য রয়েছে। জর্জ বুশ সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বলে ইসলামি রাষ্ট্রগুলো ধ্বংস করার নিমিত্ত আক্রমণ চালিয়েছেন। তিনি অপরাপর রাষ্ট্রগুলোকে এই আক্রমণে সামিল হওয়ার আহবান জানিয়ে বলেছিলেন, ‘যারা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হবে না, মনে করা হবে তারা সন্ত্রাসের পক্ষে’! বর্তমানে সরকারি দলও এই নীতি গ্রহণ করেছে। রাজনীতি বিজ্ঞানে এ ধরনের তত্পরতা জাতির মধ্যে এটা একটা বিভাজন সৃষ্টির চেষ্টা হিসেবে গণ্য। আওয়ামী লীগ ছাড়াও অন্যান্য দলে অনেক মুক্তিযোদ্ধা, সেক্টর কমান্ডার রয়েছেন, এ বিষয়টি ভুলে যাওয়া উচিত নয়। প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে আবারো এক-এগারোর আশংকা প্রকাশ করেছেন। গণমাধ্যমগুলো এদিকটি গুরুত্ব দিয়ে প্রচার/প্রকাশ করেছে। এর দায় তিনি বিরোধী দলের ওপর ফেলতে চাচ্ছেন। মানুষ সহজ হিসাবে ভুল করে কম। এমন পরিস্থিতি যদি সত্যি সৃষ্টি হয়, তার দায় যে আওয়ামী লীগের ওপর বর্তাবে, সেটার জন্য কোনো প্রচারণা চালানোর প্রয়োজন নেই। আমরা মনে করি, প্রধানমন্ত্রী নিজেও এটি বিশ্বাস করেন। আমরা এটাও জানি, সব বিশ্বাস বা সব সত্য প্রকাশ করা যায় না। প্রধানমন্ত্রী যদি অন্তরের কথা মুখে প্রকাশ করেন, তবে পুনরায় এক-এগারোর মতো পরিস্থিতি ঠেকানো যায়। এটি পুরোপুরি সরকারি দলের ওপর নির্ভরশীল। প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে আগামীর সম্ভাবনার বিষয় তুলে ধরেছেন। ভাষণে এ বিষয়ে ধারণা এবং অনুমিত সূচকও রয়েছে। ধারণা বা অনুমিত সূচকের বর্ণিত রেখা স্থিতিশীল পরিবেশ-পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। আগামী নির্বাচন কোন ধরনের সরকারের অধীনে হবে, তা নিয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে বিরোধের মাত্রা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করার দিকটি উপেক্ষিত থেকেছে। নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতি নিয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে ঐক্যমত যে হতে হবে, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে বিষয়টি উল্লেখ থাকলে আগামীর অন্ধকার, আশংকা কেটে যেতো। স্বস্তি ফিরে আসতো জনমনে। লেখক:অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় e-mail: drshamsulalamgp@gmail.com