তাপদাহ, উদার মানুষ ও নিরাপত্তা
প্রকাশ : ২১ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:৩৯
জন্মেছি মৌসুমী বায়ু অঞ্চলের দেশে। প্রকৃতি যেখানে নরম, জীবন সহজ ও নদীর স্রোতের মত প্রবহমান। বন্ধু এক অনুজ কবি লিখেছিল ‘ষড় ঋতুর গন্ধ মাখা সবুজ মেয়ে।’ এর চেয়ে ভালো উপমা আর কি হতে পারে? বাংলাদেশ সবুজ মেয়েই বটে, তার ছয় ঋতুর কোন কোনটি ম্লান, ধূসর হবার পথে তবে হারিয়ে যায়নি। এখনো ফিরে ফিরে আসে, মাটি তপ্ত, উষ্ণ, আগ্নেয় হতে না হতেই বর্ষারানী হাজির হয়, কি অপূর্ব নাম, রানী বলে মাথায় তুলে রাখা। তার নূপুর বা কল কল ধ্বনি না মিলোতেই স্নিগ্ধ শান্ত শরত্ হাজির। অতুলনীয় সৌন্দর্যের এই ঋতুটি চলে যেতেই ধূসর পান্ডুলিপি নিয়ে এসে দাঁড়ায় হৈমন্তিকা। তার শরীর জুড়ে যে অবসন্নতা, অলসতা তাকে চাদর মুড়ি দিয়ে উষ্ণ করে তোলে শীত। উহু সেটাই শেষ নয়, বাংলার বসন্ত তখন জাগ্রত দ্বারে। পোড়ার মুখো সমাজে অনিয়ন্ত্রিত জন্মহারে তিল ধারণের ঠাঁই না থাকার পরও যেখানে যতটা তারচে’ অন্তত একটি অধিক ফুলের অস্তিত্বে জেগে ওঠে জীবন। এমন দেশের মানুষ আমি। অতি গরম, বরফ আবৃত জীবন রাস্তাঘাট আর তুষারপাতে অবরুদ্ধ জীবন আমার অচেনা। আমি কখনো বুশফায়ার দেখিনি। আগুনের অমন লেলিহান শিখায় পুড়ে যাওয়া বনভূমি অসহায় প্রকৃতির নিরূপায় আত্মসমর্পণ আমার অচেনা। ‘আগুন আমার ভাই আমি তোমারই গান গাই’ শিখে, জেনে বড় হওয়া মানুষের কাছে আতঙ্কের বুশফায়ার অভিজ্ঞতা দিয়েছে আমার দ্বিতীয় বসতবাটি সিডনি। গত এক বছর বলতে গেলে তারচেয়েও বেশি কিছু সময় শীতের প্রকোপে জীবন অতীষ্ঠ হয়ে এসেছিল প্রায়। ঠাণ্ডা হাওয়া, কনকনে শীত, মাথা ব্যথার জন্য যথেষ্ট ঝড়ো ঝাপটা বাতাসের দাপট দেখে মনে হচ্ছিল এই ঋতুই অনন্ত, এর কোন শেষ নেই। জানুয়ারি অর্থাত্ নববর্ষের শুরু থেকে একটু একটু করে ফিরে আসা সিডনি গ্রীষ্মের প্রচন্ডতা দেখলাম, অনুভব করলাম গত হপ্তায়। শুক্রবার ভোর থেকেই তেতে উঠতে শুরু করেছিল, প্রতিদিনের মত অফিসে যাবার জন্য বের হতে-হতেই চোখে-মুখে এসে ঝাপটা দিচ্ছিল আগুনের হলকা। ‘মর্নিং সোজ দ্যা ডে’ বলে কথা, দিনের মধ্যভাগে সত্তর বছরের রেকর্ড ভেঙ্গে ৪৬-এ পৌঁছে গিয়েছিল তাপদাহ। সেটাই বড় কথা নয়, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অফিস-আদালত, বাস-ট্রেন বা বাড়ি-ঘর তা বুঝতে দিতো না হয়তো বা কিন্তু যেটুকু হাঁটার পথ বা যেটুকু যন্ত্রের সহায়তাবিহীন প্রকৃত জীবন ঐ টুকু যে কত অসহ্য হতে পারে অনুভব না করলে বোঝা যেত না। ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত নরক দোজখের অগ্নিবাস বিশ্বাস করা না করা ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু এই দাবদাহ বা অগ্নিপ্রবাহ যদি তা হয় তবে সত্যি খবর আছে। এমনই প্রচণ্ডতা, কোথাও কোথাও রেলপথ পর্যন্ত বেঁকে গিয়েছে, তারপরও ট্রেন যাত্রা থামেনি, বিলম্বিত হলেও মানুষের জীবন-ছন্দ থেমে থাকেনি কোথাও। সরকারি দায়িত্ব বলে যে ব্যাপারটি নিয়ে আমরা সারাক্ষণ হৈ-চৈ করি, কথা বলি খুব নীরবে, অথচ সুচারুভাবে সেটাই সম্পন্ন হয় এদেশে। গণতন্ত্রের মান- মর্যাদার উত্স হচ্ছে মানুষ, তার ভালো-মন্দ এবং জীবনপ্রবাহ যদি ঠিক না থাকে বাকিগুলো কেবলই কথার কথা। সিডনির কর্তৃপক্ষ গণতন্ত্রের দাস, তারা কারো হুকুম বা দলের অনুগত নয়, তাই প্রচন্ড দাবদাহে, ফায়ার ফাইটার নামে পরিচিত দমকল কর্মী থেকে শুরু করে ট্রেনের চালকও কাজ করে জাতীয় স্পিরিট বা চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে, যা আমাদের মত কথা আর বাকবিতন্ডায় থেমে নেই, কি আশ্চর্য এই দাবদাহেও চলেছে বিশ্বখ্যাত এক সঙ্গীত দলের ওপেন কনসার্ট, স্বাভাবিকভাবেই সমাগত তরুণ-তরুণীদের পোশাকও ছিল ঢিলেঢালা। স্বাধীন দেশ, প্রকৃত সভ্য সমাজ, উদার জীবনে নারীও মানুষ, তার লিংগ পার্থক্য এখানে গৌণ। শুধু গৌণ নয় অচলও বটে, সে যে পুরুষের সমান বা যে কোন তরুণ বা প্রতিদ্বন্দ্বীর সমান্তরাল সে শিক্ষাটার শুরু হয় পরিবার থেকে। পরিবার তাকে বুঝতেই দেয় না তার সীমাবদ্ধতা বা সংকীর্ণতা একদিন কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে। যেমন ধরুন, আমাদের দেশে একই পরিবারে বড় হওয়া ভাই-বোনের ভেতর ব্যবধান বা বিভেদের বীজ বোনা হয় পরিবারে। সন্ধ্যায় পুত্র সন্তান বাইরে যেতে পারবে, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে পারবে, ছাদে উঠতে পারবে, প্রচণ্ড গরমে খোলামেলা পোশাকে ঘরে ঘুরতে পারবে, কন্যাটির বেলায় এর একটিও জায়েজ নয়, সমাজ-সংসার পরিপার্শ্ব বিবেচনার নামে তাকে ঘরে আটকে রেখে সব কিছুতে ‘না’ ‘না’ বলে জীবনের শুরু থেকেই না বোধক ও নেতিবাচক করে তুলি আমরা। তাই তার প্রতিরোধ ক্ষমতাও যায় উবে, কথায় কথায় ঘরে-বাইরে জিঘাংসা, অত্যাচার আর নিপীড়নের শিকার আমাদের নারী আজ যৌন ধর্ষণের পাপে শেষ হয়ে যাচ্ছে, যত বড় বড় কথা, ঠিক তত কম প্রতিকার বা সুরক্ষা, অথচ গ্রীষ্মের প্রচণ্ডতম দিনটিতে স্বল্প বসনা সিডনি তারুণ্য নেচে-গেয়ে ঠিকভাবে বাড়ি ফিরে গেছে, কেউ কেউ ড্রিংকস বা ঝর্নার জলে সিক্ত হয়েও, প্রমাণ করেছে উদার উন্মুক্ততা মানে মৌলবাদীদের অন্ধ চোখে দেখা খোলা মাংসের দোকান নয়, বিড়াল ও তার লোভই মূল সমস্যা।
গরমের প্রচণ্ডতায় ও শান্ত-সুস্থির জীবন প্রকৃতিও ভালোবাসে, তাই ঐ সন্ধ্যাটিতেই নেমে এসেছিল শান্তির বারিধারা। দুর্ভাগ্য এদের শিল্প সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ নেই, থাকলে সবাই মিলে গলা খুলে গাইতে পারতো ‘বরিষ ধরার মাঝে শান্তির বারি’ তারপরও রেকর্ড গরমের দিনটি স্মরণীয় হয়ে রইল ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ মোকাবিলা উত্তেজনা বাঁচিয়ে চলা শান্তির দিন বলে।
(সিডনি থেকে)
dasguptajoy@hotmail.com