[ রা জ নী তি ]
শুধু লগি-বৈঠার কারণে ওয়ান ইলেভেন আসেনি
প্রকাশ : ২১ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:৩৯
আমরা ইতোপূর্বে এক কলামে বলার চেষ্টা করেছি যে, ২০০৭ সালে সংঘটিত ওয়ান ইলেভেনের ঘটনা বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট। আজ আমরা দেখব এই ঘটনা কিভাবে আমাদের ইতিহাসের গতিধারা বদলে দিয়েছে এবং সকল ঘটন-অঘটনকে ছাড়িয়ে গেছে।
যারা মনে করেন দেশের প্রধান দুই জোটের মারামারি ও লগি-বৈঠার জন্য ওয়ান ইলেভেন এসেছে, তারা হয়তোবা বিষয়টির গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করেন না। রক্তপাত এড়ানো, শান্তি প্রতিষ্ঠা কিংবা একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানও এর মূল উদ্দেশ্য ছিল না। ওয়ান ইলেভেন এসেছে ওয়ান ইলেভেনের জন্যই। এটি একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ । অন্তত অভিজ্ঞ মহল তাই মনে করেন।
কোল্ড ওয়ার বা ঠান্ডা লড়াইয়ের সময় পৃথিবীতে ছিল দ্বিমেরুকরণের (বায়োপোলার) যুগ। পৃথিবী ছিল উদার পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক ব্লকে বিভক্ত। অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এই দ্বিশক্তি ছিল একই পক্ষভুক্ত তথা মিত্রশক্তি। যখন দেখা গেল হিটলার হেরে যাচ্ছেন, তখন থেকেই এই মেরুকরণ শুরু হয়। তথাকথিত মিত্রবাহিনীর যে যতটুকু পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিলেন, সেখানে নিজেদের অবস্থান নিয়ে ফেলেন। ১৯৯১ সালে যখন অনিবার্য পরিণাম হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেল, তখন রাতারাতি কৌশলগত অবস্থান পাল্টাবার মহড়া আমরা দেখলাম। এরপর একক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হল আমেরিকা। তারপর ২০০৭ সালে এল বিশ্বমন্দার ধাক্কা। একমেরুকরণ থেকে এবার বহুমেরুকরণের (মাল্টি-পোলার) পথ খুলে গেল। অমনি আমরা যার যার মত অবস্থান নিতে ও পরিবর্তন করতে দেখলাম। এ সময় নতুন ভূ-রাজনৈতিক কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শক্তির অভ্যুদয় হল।
কথায় বলে, মাইট ইজ রাইট। যখন যিনি ক্ষমতায় থাকেন, তখন তিনি যা খুশি তাই করতে পারেন। তিনি বা তারা যেভাবে পরিকল্পনার ছক কাটেন, সবকিছু চলে সেভাবেই। জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রে শক্তিধরদেরই ইচ্ছের প্রতিফলন ঘটে। এছাড়া অন্য কিছু হতে আমরা দেখি না। এখন বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তির দৌড়ঝাঁপ আমরা লক্ষ্য করছি। তারা দ্রুত সাহস সঞ্চয় করছে। তাই তো আমরা আজ এতদিন পর বাংলাদেশে আমেরিকার মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী ভূমিকা নিয়ে কাউকে কাউকে অধিক মাত্রায় উচ্চকণ্ঠ হতে দেখি। কেউ কেউ বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান নিয়ে শ্লেষাত্মক কথা-বার্তা বলেন। আমেরিকাকে এক হাত দেখে নেওয়ার কথাও বলেন কেউ কেউ। অবস্থান পরিষ্কার করার পরও ড. ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক বিতর্ক তুঙ্গে ওঠে। নিশ্চয়ই তাদের পেছনেও খুঁটির জোর রয়েছে।
এই প্রেক্ষিতে শীতল যুদ্ধ কিংবা দুই পরাশক্তির যুগে যেসব জ্ঞানগর্ভ অভিসন্দর্ভ কিংবা বই-পুস্তক রচিত হয়েছে তা আজ সবই অপ্রাসঙ্গিক। সে সময়ের যত তত্ত্ব আছে, তা আজ অচল ও অপ্রয়োজনীয়। আমরা এখন এক নতুন বিশ্বে পদার্পণ করেছি। এ সময় পুরাতন দিনের কথা সম্পূর্ণটা ভুলে যেতে পারলেই ভাল। নতুবা মনোবেদনা ও দুঃখ পাওয়া ছাড়া আর কোন লাভ হবে না। তেমনিভাবে ওয়ান ইলেভেনের পর বাংলাদেশ এক নতুন দিগন্ত রেখায় পা রেখেছে। আগের ইতিহাস এখানে অপ্রাসঙ্গিক। পুরনো দিনের স্মৃতি রোমন্থনে ও নস্টালজিয়ায় কষ্ট ছাড়া আর কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
এমনকি ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলন, ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন ইত্যাদিও সেই ঘটনায় ম্লান হতে বসেছে। আমাদের সামনে এখন ইতিহাসের একটিই অধ্যায় খোলা- তা হল ওয়ান ইলেভেন। সেখান থেকে পাঠ নিতে হবে আমাদের। শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। এই শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষিত পরিবর্তনকে বিবেচনা করেই। আমাদের পূর্বপুরুষেরা কোন্ আন্দোলনে কতটা সাহসী ও সংগ্রামী ছিলেন, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে তাও ভুলে যেতে হবে। স্মৃতি থেকে সবকিছু ডিলেট করতে হবে, মুছে ফেলতে হবে। শুধু তাই নয়, কম্পিউটারে কোন কিছু ডিলেট করলে তা রিসাইকেল বিনে গিয়ে জমা হয়। তাও মুছে ফেলতে হবে। প্রয়োজনে কম্পিউটার ও হার্ডডিস্ক বদলাতে হবে। এরপর নতুন পরিকল্পনা নিয়ে এগুতে হবে। নতুন রাজনীতি করতে হবে।
যারা শুধু দুই নেত্রীর সংলাপের পরই সকল সমস্যার সমাধানের আশা করেন, তাদের জন্য আমাদের করুণা হয়, দুঃখ হয় বৈকি। বাংলাদেশের চার দশক কেটে গেছে। কিছু ব্যক্তিত্বের কারণে আমরা অনেক কিছু টের পাইনি। কিন্তু মুখে বড়শি নিয়ে জিয়ল মাছের মতো আর কত ছোটাছুটি? কবির ভাষায় বলতে হয়, ‘বারবার ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধান, এইবার ঘুঘু তোমার বধিব পরাণ।’ এক অদৃশ্য ফাঁদে ধরা পড়ে ‘বগা কান্দেরে’ দশা বাংলাদেশের।
বাংলাদেশে এই যে নতুন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, এটা আমাদের আগে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। পশ্চিমা কূটনীতিকরা এখনও সকলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য সাধারণ নির্বাচনের কথা বলছেন। কেননা তাদের দেশে এরূপ গণতান্ত্রিক পদ্ধতিই অনুসরণ করা হয়। এর বাইরে তারা অন্য কিছু বলতে পারেন না। সুতরাং আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ক্ষমতাবানরা যেভাবে চাইবেন সেভাবেই হবে। এর ব্যত্যয় ঘটার কোন কারণ আমরা দেখি না। তবে রাস্তা-ঘাটে, জলে-স্থলে, আকাশে-অন্তরীক্ষে ঘটনা-দুর্ঘটনা তো ঘটেই। যারা ৪০ শতাংশ বা তারও বেশি বিরোধী ভোটের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন, তাদের আফগানিস্তান, ইরাক প্রভৃতি দেশের দিকে দৃষ্টি দেয়া উচিত। ইতিহাস সাক্ষী, শক্তির কেন্দ্রসমূহ যেভাবে চায় শেষপর্যন্ত সবকিছু সেভাবেই হয়।
তবে ইতিহাস পর্যালোচনা করলে এটাও দেখা যায় যে , পরাশক্তি কিংবা অন্যান্য শক্তি সবক্ষেত্রে সব সময়ের জন্য তাদের আধিপত্য রক্ষা করতে পেরেছে এমনটি নয়। আজ আমাদের দুই নেত্রী কিংবা রাজনৈতিক নেতারা, যারা রাজনৈতিক অচলায়তনে পদচারণা করছেন, তাদের কাছে আমরা যতটুকু না আশা করি, তার চেয়ে দেশের ১৬ কোটি মানুষের নিকট আমাদের প্রত্যাশা বেশি। এতগুলি প্রাণশক্তি ও তাদের উদ্যম বৃথা যেতে পারে না। ভারত ও রাশিয়ার সহযোগিতা থাকলেও মূলত বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছে একটি মুক্তিকামী জনগণের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। তাদের স্বপ্ন ছিল একটি স্বাধীন, স্বশাসিত ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন। এ কারণে তারা কেউ অকাতরে প্রাণ দিয়েছেন, কেউ হারিয়েছেন তার মূল্যবান সম্ভ্রম। এখন এসব গণমানুষের সচেতনতা ও উদ্যোগের ওপরই আমাদের সবার ভবিষ্যত্ নির্ভরশীল। অতীতের কাসুন্দি না ঘেঁটে নতুন ও সম্মিলিত সংগ্রাম ছাড়া আমাদের মুক্তি আসবে না। ওয়ান ইলেভেন কেন হয়েছিল তা থেকে শিক্ষা নিয়েই অভীষ্ঠ লক্ষ্যে ও সামনের দিকে অগ্রসর হতে হবে। সেটা উপলব্ধি করে সেই অবস্থা থেকে দেশবাসীকে মুক্ত করার কথা অনেকেই চিন্তা করেন। তবে তা অর্জনের জন্য দেশবাসীকেই মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে।
লেখক : সাংবাদিক
faijulislam81@gmail.com