না জাগিলে অনাচার বন্ধ হইবে না

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে প্রাণহানি ঘটিয়াছে নিষ্পাপ এক শিশুর। মর্মান্তিক এই ঘটনাটি ঘটিয়াছে গত শনিবার অপরাহ্নে। পার্শ্ববর্তী বয়রা গ্রামের এক দরিদ্র পিতার সন্তান রাব্বি ক্যাম্পাসের ভিতরের রাস্তা দিয়া যাইবার সময় গোলাগুলির মধ্যে পড়িয়া যায়। সেখানে সে বুলেটবিদ্ধ হয়। পরে তাহাকে ময়মনসিংহ মেডিক্যালে নিয়া গেলে কর্তব্যরত চিকিত্সক শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন। হূদয়বিদারক এই ঘটনায় বেদনা-বিক্ষোভে ফুঁসিয়া উঠেন পার্শ্ববর্তী গ্রামের মানুষ। তাহারা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র যাহার যাহা আছে, তাহা লইয়া ছুটিয়া আসেন ক্যাম্পাসে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪টি ছাত্রাবাসে বিক্ষুব্ধ মানুষ হামলা চালান। তাহারা নির্বিচারে ভাঙচুর করেন, আগুন ধরাইয়া দেন কয়েকটি কক্ষে। গ্রামবাসীর রোষানলে পুড়িয়া ছারখার হইয়া যায় ছাত্রাবাসের ২৪টি কক্ষের জিনিসপত্র। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয় যে, বাকৃবি শাখা ছাত্রলীগের বিবদমান দুই গ্রুপের মধ্যে কয়েকদিন ধরিয়াই চলিয়া আসিতেছিল সশস্ত্র সংঘাত। আর ইহার মূলে রহিয়াছে টেন্ডারবাণিজ্য। এই অস্থির-সহিংস পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হইয়াছে। ছাত্র সংঘর্ষে শিশুর মৃত্যু সংবাদে এমন কেহ কি আছে, যাহার হূদয় বেদনা-বিহ্বল হইয়া না পড়িবে! পক্ষান্তরে, ছাত্রাবাসে গ্রামবাসীর হামলার ঘটনাটিও তাত্পর্যপূর্ণ নিঃসন্দেহে। একটা সময় ছিল, যখন ছাত্রসমাজের প্রতি সাধারণ মানুষের দৃষ্টি ছিল স্নেহ ও ভালবাসাপূর্ণ। সমাজে তাহাদের আলাদা মর্যাদা ছিল। যৌবনের যে বিপুল শক্তি ও সম্ভাবনা, ছাত্ররা তাহারই প্রতীক। শিক্ষার্থী তরুণদের সামান্য ভুলচুক, বেয়াড়াপনা সমাজ মানিয়া লইত সোহাগভরা শাসন সহযোগে। সেই শাসন-বারণের মধ্যেও থাকিয়া যাইত এক ধরনের প্রশ্রয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্র-তরুণদের অসামান্য অবদান দেশবাসীর অন্তরে বড় একটা জায়গা করিয়া নিয়াছিল। ষাটের সেই উজ্জ্বল তারুণ্য এখনও আমাদের মনকে বিগলিত করে গভীর শ্রদ্ধায়। কিন্তু আজ এ কী হইল, একশ্রেণীর ছাত্র তাহাদের সম্মান ও মর্যাদার জায়গাটি নিজেরাই ভাঙিয়া চুরমার করিয়া দিতেছেন । অতীতে ছাত্রাবাসে সাধারণ মানুষ হামলা করিবেন, বইপত্র ও অন্যান্য শিক্ষা উপকরণ পোড়াইয়া দিবেন এমনটি ছিল অকল্পনীয়। আর আজ সব যেন বদলাইয়া গিয়াছে। দেশে বহুসংখ্যক নূতন বিশ্ববিদ্যালয় হইয়াছে। ইহা তো সুখের বিষয়। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের, যেখানেই গিয়াছে কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রায় সকল ক্ষেত্রে সেখানে গিয়াছে সন্ত্রাস-সংঘাত ও রক্তপাত। গিয়াছে অনাচার, অনিয়ম ও অসুস্থ প্রতিযোগিতা। সব সরকারের আমলেই দেখিতে পাওয়া যাইতেছে একই চিত্র। হানাহানি, গোলাগুলি নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হইয়া গিয়াছে যেনবা। তবে এইসব অনাচারের সাথে অবশ্যই যুক্ত নহেন সকল শিক্ষার্থী। যাহারা যুক্ত, সংখ্যায় তাহারা নগণ্য। কিন্তু ভাবমূর্তি সংকটাপন্ন সকলের। উচ্ছৃংখল ছাত্র নামধারীদের পদাংক যেন অনুসরণ করিয়া চলিয়াছেন একশ্রেণির শিক্ষকও। এহেন অবাঞ্ছিত পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের ক্ষেপিয়া ফুঁসিয়া উঠাই স্বাভাবিক। সেই স্বাভাবিক ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়াছে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে। অন্যায়-অনাচার এবং সহিংসতা প্রতিরোধে মানুষ একদিন না একদিন জাগিয়া উঠিবেই। না জাগিলে অনাচার বন্ধ হইবে না।