টেকসই উন্নয়ন কোন পথে
প্রকাশ : ২৩ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:০১
‘টেকসই উন্নয়নের জন্য দরকার পরিবেশগত সুবিধা, সামাজিক উন্নয়ন আর অর্থনৈতিক অগ্রগতি’। এই তিনটি প্রয়োজন অবশ্য পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। পরিবেশগত সুরক্ষা বজায় রাখিতে আমরা ব্যর্থ হইতেছি সারাদেশ জুড়িয়া। আমরা ব্যর্থ হইতেছি ফসলি জমিকে বিকল্প ব্যবহারের হাত হইতে রক্ষা করিতে। প্রকাশিত খবর হইতে জানা যায়, বত্সরে প্রায় ২ লক্ষ একর কৃষিজমি বিকল্প ব্যবহারে চলিয়া যাইতেছে। ভরাট হইয়া যাইতেছে হাওর, বিল আর নানাবিধ জলাভূমি। এই অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে ফসলি জমির পরিমাণ কমিয়া যাইতেছে, যাহা বন্ধ করিতে হইবে। আমাদের সেই অর্থে খনিজ সম্পদের কোনো প্রাচুর্য নাই। আমাদের আছে এক বিশাল অদক্ষ জনগোষ্ঠী আর এক লাখ চুয়াল্লিশ হাজার বর্গকিলোমিটার ভূমি। এই দুয়ের উপর ভিত্তি করিয়াই আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অগ্রগতিকে সামনের দিকে আগাইয়া লইতে হইবে। সীমিত এই ভূসম্পদের সদ্ব্যবহার করিতে হইবে। না পারিলে আমাদের টেকসই উন্নয়ন ব্যাহত হইবে।
তবে এই অপরিকল্পিত নগরায়ণের একটা বড় কারণ বিশাল জনগোষ্ঠী—এ কথা ভুলিয়া গেলে চলিবে না। বিশাল জনগোষ্ঠীর চাপে কমিয়া যাইতেছে ফসলি জমি। এই বিশাল আকারের জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাল মিলাইয়া আবাসনসহ অন্যান্য নাগরিক সুবিধা তৈরি করিতে গিয়া কৃষিজমি বিকল্প ব্যবহারে চলিয়া যাইতেছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠী আমাদের কৃষি-প্রবৃদ্ধিকেও বাধাগ্রস্ত করিতেছে বিভিন্নভাবে। বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রধান খাদ্যশস্য চালের উত্পাদন বাড়ানোর জন্য আমাদের উচ্চফলনশীল প্রজাতির ধান উত্পাদনে মনোযোগী হইতে হইতেছে, বাড়িতেছে কীটনাশক আর রাসায়নিক সারের অবাধ ব্যবহার। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হইতেছে আমাদের মিঠাপানির মত্স্যসম্পদ। ফলশ্রুতিতে, আবার ধানী জমির এক বিশাল অংশ মত্স্য চাষে ব্যবহূত হইতেছে। সম্মিলিত প্রভাবে এক সময় আমরা আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য উত্পাদনে ব্যর্থ হইবো। প্রকৃতির বৈরী প্রভাবে কোন এক বত্সর খাদ্য উত্পাদন ব্যাহত হইলেই কিন্তু আমাদের অর্থনীতি অস্থিতিশীল হইয়া পড়িবে। তখন খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখিতে গিয়া সামাজিক উন্নয়নের গুরুত্ব কমাইয়া দেওয়া ছাড়া বিকল্প থাকিবে না।
যেহেতু আমাদের ভূসম্পদের সীমাবদ্ধতা রহিয়াছে, তাহার উপর রহিয়াছে বিশাল এক জনগোষ্ঠী, তাই সতর্ক না হইলে টেকসই উন্নয়ন ব্যাহত হইবে, ইহাই স্বাভাবিক। সেই কারণে আমাদেরকে সতর্ক থাকিতে হইবে এই সম্পদের ব্যবহারের ক্ষেত্রে। আমাদেরকে সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে আগাইতে হইবে। এই সতর্কতার প্রথম ধাপ হইলো জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা। টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় তিনটি শর্তের প্রত্যেকটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয় সীমার অতিরিক্ত জনবসতির ফলে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকিলে পরিবেশের চক্রের মধ্যে পড়িতে হয় না। জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধির হার বর্তমানে দেড়ের কাছাকাছি। যাহাকে শূন্যের কাছাকাছি না আনিতে পারিলে আরো অনেক সমস্যার মধ্যে পড়িবো আমরা দীর্ঘমেয়াদে। মনে রাখিতে হইবে, দীর্ঘ মেয়াদে আমাদের সকল সমস্যার মূলে অতিরিক্ত জনসংখ্যা। উত্পাদন যতই বাড়ুক, তাহা মানুষের জীবনমানের অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখিবে তখনই, যখন জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হইবে।