সংসদীয় গণতন্ত্র :সংকট ও উত্তরণ

১৯৯১ সালে বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলো সর্বসম্মতভাবে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করলেও এর প্রাতিষ্ঠানিকায়নের পূর্বশর্তগুলো পূরণ হয়েছে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ থেকে যায়। গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের অন্যতম শর্ত হিসেবে বিবেচিত বিষয়গুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামোতে যথাযথভাবে কার্যকর নয়। এতে দেশে গণতন্ত্রের অবক্ষয় প্রতিনিয়ত ঘটছে। কখন কীভাবে গণতন্ত্রের উজ্জ্বল সম্ভাবনা জাগ্রত হবে তা ধারণা করা খুবই মুশকিল। বাংলাদেশে কখন সকল দলের কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের সংস্কৃতি গড়ে উঠবে? আদৌ কী দেশে নিরপেক্ষ নির্বাচনের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে? কিংবা পরাজিত দল নির্বাচনের ফলাফলকে কখন কীভাবে অভিনন্দিত করবে সে অপেক্ষা আমাদের সবারই। ১৯৯০ সালে ব্যাপক গণআন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক দলগুলো গণতন্ত্র নিশ্চিতকরণে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তার মধ্যে ছিল: কার্যকর সংসদ, জবাবদিহিমূলক সরকার, আইনের শাসন, অসংগতিপূর্ণ আইনসমূহ বাতিল করাসহ মৌলিক মানবাধিকার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, ইলেকট্রনিক মিডিয়ার স্বায়ত্তশাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা। আজ দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও জবাবদিহিমূলক সরকার কিংবা গণতন্ত্রিক ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক রূপের লক্ষ্যে আইনের শাসন পেয়েছি কিনা তা আমরা সহজেই অনুমান করতে পারি। সাহসী যুবক নূর হোসেন বুকে “গণতন্ত্র মুক্তি পাক” ও পিঠে “স্বৈরাচার নিপাক যাক” লিখে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন এবং গুলিতে নিহত হয়েছিলেন। সেই স্বৈরাচারের পতন হলেও গণতন্ত্র এখনো মুক্তি পায়নি। রাজনীতিতে অস্ত্র, কালো অর্থ, নির্বাচনে পেশিশক্তির ব্যবহার, জঙ্গিবাদের অনুপ্রবেশ কার্যকর হওয়ায় গণতন্ত্রের অগ্রগতি ব্যাপকভাবে আহত হয়েছে, এমনকি রাজনীতিও চরম অসুস্থতার কবলে পড়েছে। অসুস্থ রাজনীতি প্রতিশ্রুতি পূরণের মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জনের প্রয়োজন অনুভব করেনি। তার বদলে তারা কালো টাকা ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে, এমনকি নির্বাচনী কর্মকর্তা ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে পক্ষে নিয়ে নির্বাচনে কারচুপি করার দুঃস্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে চেয়েছে, যা কোনো কোনো সময় আংশিকভাবে সফল হয়েছে আবার কোনো সময় ঘটেছে তার ব্যতিক্রম। রাজনৈতিক দলগুলো ক্রমেই মনোনয়ন বিক্রির প্রতিযোগিতায় নেমে সর্বোচ্চ দরদাতাকে মনোনয়ন দিচ্ছে। যারা মনোনয়ন কিনছে তাদের যোগ্যতা, জনসেবার ইচ্ছা কিছুই বিবেচনা করা হয় না। স্বৈরাচারী সরকারের মতোই দেশে দলীয়করণ সর্বগ্রাসী হয়ে উঠেছে, ক্ষমতার ভারসম্য বিনষ্ট হচ্ছে এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা ক্রমেই ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। রাষ্ট্র বন্দী হয়ে পড়েছে স্বার্থান্বেষী শিকারীদের হাতে। আমলাতন্ত্র ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর মধ্যে দলীয় আনুগত্য প্রবল হয়ে উঠেছে, যা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। তারা জনগণের কল্যাণের চেয়ে দুষ্ট রাজনীতিবিদদের হাতের ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছে। মাফিয়ারা রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতায় চলে এসেছে এবং সন্ত্রাস ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। রুগ্ন রাজনীতির আরেকটি অন্যতম উপসর্গরূপে সশস্ত্র ছাত্র সংগঠনের ক্যাডাররা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ প্রায় সর্বক্ষেত্রে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। এমনকি রাজনীতিবিদরা নিজেদের রক্ষা ও পৃষ্ঠপোষকতার জন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অপপ্রয়োগও করছেন। সন্ত্রাসবাদকে লুকানো, তদন্ত বিলম্ব্বিত করা এবং কার্যকর আইন-শৃঙ্খলা বাস্তবায়নকে নিয়মিতভাবে আহত করা হয়। নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালতের সকল পর্যায়ে দলীয়করণ ও রাজনীবিদদের প্রভাব বিচার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে। বিচারকদের পদোন্নতি ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদানে সরকারি প্রভাব বিদ্যমান থাকায় বিচার বিভাগ তার নিরপেক্ষতা হারিয়ে ফেলছে। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বার্থ ও চাহিদাকে নীতিতে পর্যবসিত করে গণতন্ত্র শক্তিশালীকরণে জাতীয় সম্পদের যে মুখ্য ভূমিকা পালনের কথা তা আদৌ বাস্তবায়িত হচ্ছে না। নির্বাচিত সংসদের কার্যক্রম শুরুর সময় থেকেই ওয়াক আউট ও বয়কটের রাজনীতির প্রবণতা অধিক পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়াও জনগণের নয়, বরং নেতাদের স্বার্থে সামান্যতম ব্যাঘাত ঘটলে দলত্যাগ প্রবণতা এবং সংবিধানের ৭০ নং অনুচ্ছেদের কারণে সংসদীয় কাঠামোতে স্বাধীনভাবে বিকল্প পন্থা অবলম্বন সম্ভবপর হয় না। এছাড়াও জাতীয় সংসদে স্পিকারের যথাযথ ভূমিকা পালনে ব্যর্থতা, নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনের অযোগ্যতা গণতান্ত্রিক কাঠামোর বড় অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে। গণতন্ত্রের অন্যতম মানদণ্ড সিভিল সোসাইটি দেশে যথাযথ মান অর্জন করতে সক্ষম হয়নি। শুধু তাই নয়, সিভিল সমাজ প্রতিষ্ঠায়ও দলীয়করণের ছাপ পরিলক্ষিত হয়। দেশে বিদ্যমান সিভিল সমাজের বিভিন্ন অংশ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সমর্থনে কথা বলে অর্থাত্ সেখানেও দলাদলির মতো নোংরামির ছাপ লক্ষ্য করা যায়। এ থেকে স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় যে, সিভিল সমাজও গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপায়ণে যথাযথ ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হচ্ছে। গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকায়নে নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্মে দাঁড়াতে হবে। নিম্নোক্ত বিষয়গুলোতে নাগরিকরা মতৈক্য প্রতিষ্ঠা করলে কিছুটা হলেও গণতন্ত্রের মানোন্নয়ন ঘটার সম্ভাবনা থাকবে। প্রথমত, ভোটারদের অবশ্যই সত্ ও যোগ্য প্রার্থীদের ভোট দিতে হবে। এজন্য নির্বাচনী আইনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সব তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং সেগুলো পত্র-পত্রিকা ও ইলেকট্রনিক মাধ্যমে প্রকাশ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ন্যায়পাল, মানবাধিকার কমিশন, নির্বাচন কমিশন, স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, মহাহিসাব নিরীক্ষকের দফতরসহ যেসব জাতীয় প্রতিষ্ঠানে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন, সেগুলোতে সঠিক নিয়োগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিশ্বাসযোগ্য, গ্রহণযোগ্য ও নিষ্ঠাবান লোক নিয়োগ দিতে হবে। এজন্য আমাদের অবশ্যই যে কাজগুলো করতে হবে তা হলো: ক) আইনের শাসন এবং আইনের চোখে সবাই সমান সে সত্যটিকে কার্যকর করে তুলতে হবে, খ) ব্যক্তিস্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে, গ) ব্যক্তি ও জাতীয় জীবনে প্রভাব আছে এমন নীতি গ্রহণে কার্যকর আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, ঘ) সংসদ, সংদীয় কমিটি ও নজরদারি সংস্থাগুলোসহ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী ও কার্যকর করতে হবে, ঙ) সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজকর্মে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, চ) সব স্তরে কার্যকর অর্থে বিচার বিভাগ স্বাধীন, নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক এবং তাদের কাজকর্মের জন্য জবাবদিহি করবে, ছ) আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনকে অবশ্যই নির্দলীয়ভাবে ও নিরপেক্ষ বিচারে তাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে, জ) সামপ্রদায়িকতা, রাজনীতির জন্য ধর্মের ব্যবহার থেকে জঙ্গিবাদ, অসহনশীলতা ও সন্ত্রাসবাদ এবং যে কোনো ধরনের বৈষম্য সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে। উল্লিখিত শর্তগুলো যথাযথভাবে রক্ষা করার জন্য সরকার ও বিরোধী দলের মানসিকতা ও একাগ্রতা একান্তভাবে কাম্য। আর সরকার ও বিরোধী দল উভয়ই মানসিকভাবে প্রস্তুত হলে রক্ষা পাবে দেশের গণতন্ত্র, দেশ তথা দেশের সাধারণ জনগণ।  শিক্ষক,রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় E-mail: sultanmahmud.rana@gmail.com