বালাগাল উলা বিকামালিহি

আজ মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর জন্ম ও ওফাত দিবস। ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখে তিনি মক্কা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। বিশ্ব মুসলিম এই দিনটি উদযাপন করিয়া থাকেন ঈদে মিলাদুন্নবী (স.) হিসাবে। নবী মুহাম্মদ (স.) দুনিয়ার কর্তব্য সমাপনান্তে ৬৩ বত্সর বয়সে এই দিনেই ইন্তেকাল করেন। তিনি সর্বযুগের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মনীষী মানব। আল্লাহ তায়ালা তাঁহাকে রাহমাতুল্লিল আলামিন বা সমগ্র বিশ্বের রহমতস্বরূপ প্রেরণ করিয়াছেন। স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু তা'য়ালা ও তাঁহার ফেরেশতাকুল নবীর (স.) প্রতি দুরুদ ও সালাম পেশ করিয়া থাকেন। কালেমা-ই তাইয়্যেবায় উচ্চারিত হয় আল্লাহ্ জাল্লা শানুহু ও তাহার প্রিয় হাবিবের নাম। ফরাসি দার্শনিক লা মার্টিনের ভাষায় তিনি একাধারে বাণীবাহক, আইন প্রণেতা, দার্শনিক, বাগ্মী, যোদ্ধা, সর্বমতবাদের উপরে বিজয়ী, যুক্তিপূর্ণ বিশ্বাসের ও মতবাদের প্রবর্তক। সিরাতে ইবনে হিশাম ইবনে কাছীরে রহিয়াছে যে, তিনি মক্কা বিজয়ের মুহূর্তেও ছিলেন বিনয়াবনত, স্রষ্টার প্রতি সমর্পিত। পিতৃভূমি মক্কা নগরী হইতে তাঁহাকে নির্বাসিত করা হইয়াছিল। কিন্তু সেই পবিত্র নগরী তিনি যখন আবার জয় করিলেন তখন তাঁহার হূদয়ে প্রতিশোধ স্পৃহার লেশমাত্র জাগিয়া উঠে নাই। তিনি মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর ধর্মাদর্শ পবিত্র ইসলামকে পরিপূর্ণতা দান করিয়াছেন। নবীজীর (স.) যথার্থ পদাংক অনুসরণের মধ্যেই আমাদের যাবতীয় মুক্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ নিহিত। সকল বিবাদ-বিসম্বাদ ভুলিয়া ‘কুল্লু মুসলিমিন ইখওয়ানুন’ বা ‘মুসলিম মাত্র ভাই ভাই’ আদর্শে উজ্জীবিত হইলে পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী পালন যথাযথ সার্থক ও সুন্দর হইবে। সর্বগুণে গুণান্বিত মহামানব হযরত মুহাম্মদ (স.)। তাঁহার জীবনের প্রতিটি কথা, প্রতিটি কাজ মানবজাতির অনুসরণীয় এবং নিশ্চিত কল্যাণের পথ প্রদর্শক। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে, সুখে-দুঃখে, বিপদে, দুর্যোগে, মহানবী (স.) কখনোই আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহ হইতে নিরাশ হন নাই। ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটে নাই তাঁহার কখনই, কোনো অবস্থাতেই। সর্বক্ষেত্রে তিনি প্রদর্শন করিয়া গিয়াছেন পরম সহিষ্ণুতা। যেইদিন, যেই মুহূর্তে তিনি এই ধরাধামে আবির্ভূত হন, সেই মুহূর্তটি নিঃসন্দেহে সমগ্র মানব জাতির জন্য পরম খুশির দিন। উম্মতে মুহাম্মদের (স.) জন্য এই দিনটি পরম আনন্দের দিন। এই জন্যই ইহাকে বলা হইয়া থাকে ঈদে মিলাদুন্নবী অর্থাত্ নবীর (স.) জন্মোত্সব বা জন্মদিনের আনন্দ। মুহাম্মদ (স.) বিশ্ব মানবতার মূর্ত প্রতীক। সত্য-সুন্দর, শুভ-কল্যাণের পথে আহবানকারী এবং পথ-প্রদর্শক। তাঁহার ব্যক্তিত্বের আলো ও মাধুর্য, নিষ্কলুষ চরিত্র মুগ্ধতায় ভরিয়া দিয়াছিল শ্রেণী-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সকলের মন-প্রাণ। তাঁহার মহান জীবনাদর্শ মুছিয়া দিয়াছিল ‘আইয়্যামে জাহেলিয়াতে’র হিংসা-বিদ্বেষ-প্রতিহিংসার কালিমা। ঐতিহাসিক সত্য যে, নানা গোত্রে বিভক্ত, কলহপ্রবণ, সামাজিক ও নৈতিকভাবে অধঃপতিত যাযাবর ও বর্বর আরব জাতি তাঁহার প্রদর্শিত পথেই রূপান্তরিত হইয়া যায় এক মহান জাতিতে। জীবত্কালে তিনি হইয়া উঠেন মজলুম জনমানুষের প্রকৃত বন্ধু। ৬১০ খ্রিস্টাব্দে হেরা পর্বতের গুহায় নবুয়ত প্রাপ্তির পূর্বেই তিনি ‘আল আমীন’ উপাধিতে ভূষিত হন। সততা, বিশ্বস্ততা, কর্তব্যনিষ্ঠা, সুন্দর ও পবিত্রতম জীবনাদর্শ বাস্তবিকপক্ষেই সঞ্চারিত করে ‘নবজীবন’। বিকাশ ঘটে মানবিক সংস্কৃতির, উন্মেষ ঘটে কল্যাণময় এক সভ্যতার। গড়িয়া ওঠে একটি সুন্দর, সুশৃংখল, পরিপূর্ণ জীবন-ব্যবস্থা। বিশ্বময় ছড়াইয়া পড়ে তাঁহার বিকশিত জীবন দর্শন, সাম্য, শান্তি এবং মানবধর্মের মহাবাণী। আজকের এই পবিত্র দিনে মহানবীর (স.) প্রতি পেশ করি শত-সহস্র দুরুদ ও সালাম। বালাগাল উলা বিকামালিহি, কাশাফাদ্দুজা বিজামালিহি, হাসুনাত জামিউ খিসালিহি সল্লু আলাইহি ওয়াআলিহি। সেইসঙ্গে প্রার্থনা করি, পবিত্র ইসলামের মহান সত্যের আলোয় উদ্ভাসিত হউক সকলের হূদয়। ঈদে মিলাদুন্নবীর (স.) এই পবিত্র দিবসে আমরা কামনা করি বিশ্ব মুসলিমের শান্তি, সমৃদ্ধি এবং কল্যাণ।