[ রা জ নী তি ]
প্রশাসনের দলীয়করণ ও নির্বাচন
প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:৪১
গত ১৫ জানুয়ারি দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম পৃষ্ঠায় ‘নির্বাচনকে সামনে রেখে সাজানো হচ্ছে প্রশাসন!’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের বর্তমান মেয়াদে জনপ্রশাসনে শেষদফা পদোন্নতি, নিয়োগ ও রদবদলের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে। এ দফায় পদোন্নতি হবে অতিরিক্ত, যুগ্ম ও উপসচিব পদে। আর রদবদল বা নিয়োগ হবে শীর্ষ পদ সচিব ও মাঠ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাধারণ নির্বাচনের সম্ভাব্য ১০ মাস বাকি থাকতেই ডিসি পর্যায়ে রদবদল করার কাজ চূড়ান্ত করা হয়েছে। নতুন ডিসি নিয়োগের জন্য ডিসিদের তালিকা (ফিট লিস্ট) তৈরির কাজও চূড়ান্ত পর্যায়ে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের পর এ তালিকা থেকে ডিসি নিয়োগ দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে। পরবর্তীতে বিরোধী দলের দাবি উঠলে বা নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে বলা হলেও যাতে কিছু পদে পরিবর্তন করা যায় সেজন্য ৫০ জনের মতো ডিসি হওয়ার যোগ্যতা অর্জনকারী কর্মকর্তা মজুত থাকবে ক্ষমতাসীন সরকারের হাতে। এছাড়া অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব এবং উপসচিব এই তিন স্তরে কর্মকর্তার পদোন্নতির তালিকাও চূড়ান্ত করা হয়েছে। ইসি সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, নির্বাচনকালীন সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়োগ-বদলির কি নিয়ম, ডিসিরা কিভাবে রিটার্নিং অফিসার এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও) কিভাবে সহকারী রিটার্নিং অফিসার হয়ে থাকেন প্রধানমন্ত্রীর অফিস জানতে চাইলে ইসি তা জানিয়ে দিয়েছে।
এই প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন উপদেষ্টা এইচ টি ইমামের বক্তব্য পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। তিনি বলেছেন, প্রশাসন সাজানোর কিছু নেই। প্রশাসনে রদবদল একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। সরকারের কাজে গতি আনতেই প্রশাসনে রদবদল করা হয়। সে চিন্তাভাবনা থেকেই কয়েকটি পদে রদবদল করা হয়েছে, যা আগামীতেও করা হবে। আর প্রশাসনে পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে একটি তালিকা তৈরি করা হয়, এটি নতুন কিছু নয়। মাঠ প্রশাসনে যে কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে রয়েছেন, তাদের তো পরিবর্তন করতে হবে। তাদের স্থলে পদায়নের ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের একটি ফিটলিস্ট করা প্রয়োজন। আর সেটিই করা হচ্ছে। কোনো দলীয় চিন্তাভাবনা থেকে এটি করা হচ্ছে না।
বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, দলীয় সরকার কর্তৃক প্রশাসন দলীয়করণের অভিযোগ নতুন নয়। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম সাধারণ নির্বাচনে তত্কালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনের প্রাক্কালে আওয়ামী লীগের, বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে বিরাজ করলেও এবং তাদের বিজয় সম্পর্কে কোনো সন্দেহ না থাকলেও আওয়ামী লীগ সরকার দলীয় স্বার্থে রাষ্ট্রীয় রেডিও, টেলিভিশন, যানবাহনসহ পুরো প্রশাসন ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পরবর্তী ১৫ বছর অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ও এইচএম এরশাদ প্রথমে তাদের ক্ষমতা দখলকে তথাকথিত বৈধতা দেয়ার জন্য ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ গণভোট অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনকে ব্যবহারের মাধ্যমে রায়কে নিজেদের পক্ষে নেয়। এরপর তারা বেসামরিক লেবাস পরে যেসব সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করেন সেগুলোর ফলাফল ছিল পূর্বনির্ধারিত। একজন রাজনৈতিক ভাষ্যকারের মতে, স্বাধীনতার পর থেকে নির্বাচনে অবৈধ পন্থা অবলম্বনের কারণে গোটা নির্বাচন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সাধারণ মানুষের একটা দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। এর ফলে নির্বাচনের ফলাফল আগে থেকেই ছকে বাঁধা থাকায় রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তা কোনরূপ ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনি। আর এ ধরনের পূর্বনির্ধারিত প্রহসনের নির্বাচনগুলোর ওপর জনগণের আস্থা নষ্ট হয়ে যায়।
নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের গণদাবির মুখে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট এইচ এম এরশাদের নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন হয় এবং সংসদীয় সরকার পদ্ধতি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। গত বিশ বছর ধরে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ পালাক্রমে দেশ শাসন করে আসছে। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত সময়কালে সাধারণ নির্বাচনগুলো নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হলেও নির্বাচন কমিশন তথা প্রশাসন দলীয়করণের অভিযোগ হতে রেহাই পায়নি। প্রশাসনকে দলীয়করণের মাধ্যমে পরবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতায় বহাল থাকার উদ্দেশ্যে ১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার সচিবালয়ের উপসচিব, যুগ্মসচিব, অতিরিক্ত সচিব এবং সচিব পদে সাতশ’র বেশি কর্মকর্তাকে একসঙ্গে পদোন্নতি দেয়। একসঙ্গে সচিবালয়ে উপসচিব ও তদূর্ধ্ব পর্যায়ে এত বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তাকে এর আগে পদোন্নতি প্রদানের নজির ছিল না। দলীয়করণের অভিযোগ ছাড়াও পত্রপত্রিকায় এ পদোন্নতিকে ‘গণপদোন্নতি’ বলে অভিহিত করা হয়। ১৯৯২ সালে দলীয় স্বার্থে ‘গণপদোন্নতি’র যে নজির বিএনপি সৃষ্টি করে, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ তা যত্নসহকারে অনুসরণ করে।
২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে বিএনপি সচিবালয় ও মাঠ প্রশাসনের সকল স্তরে দলীয়করণে এক নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করে। এছাড়া, স্বাধীনতার পর চাকরিতে নিয়োজিত মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে যারা ‘আওয়ামীপন্থি’ হিসাবে বহুল পরিচিত ছিলো, চাকরির বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হওয়ায় গণকর্মচারী (অবসর) আইন ১৯৭৪-এর ৯(২) ধারার অধীনে তাদেরকে চাকরি হতে অবসর প্রদান করা হয়। ২০০৭ সালে অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনে নিজেদের বিজয় সুনিশ্চিত করতে বিএনপি সরকার প্রশাসন সাজানোর উদ্যোগ গ্রহণ করে। নির্বাচনে ভূমিকা রাখতে পারে প্রশাসনের এমন গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নিজেদের পছন্দসই লোক রাখতে প্রতিটি পদের বিপরীতে একাধিক বিকল্প কর্মকর্তার তালিকা প্রণয়ন করা হয়, যাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে প্রশাসনে বড় ধরনের রদবদল হলেও তাদের নিজেদের লোক এসব পদে থাকে। তবে বহুল আলোচিত ১/১১ এর কারণে তাদের সে স্বপ্ন পূরণ হয়নি।
২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকার দলীয় স্বার্থে ‘গণপদোন্নতি’ প্রদানে এবং জনপ্রশাসন দলীয়করণে বিএনপির পদাঙ্ক অনুসরণের উদ্যোগ নেয়। আওয়ামী লীগের ভাবধারায় বিশ্বাসী কর্মকর্তাদের পদোন্নতি এবং মাঠপ্রশাসনসহ প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে পদায়ন ছাড়াও ‘আওয়ামীপন্থি’ হিসাবে বহুল পরিচিত যেসব মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তাকে বিএনপি সরকার বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান করেছিল বা আওয়ামী লীগের সমর্থক যেসব কর্মকর্তা স্বাভাবিক নিয়মে অবসর গ্রহণ করেছিলেন, এবার ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকার তাদের অনেককে স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছেন। এদের অনেককে নিয়োগ দেয়া হয়েছে বিভিন্ন কমিশনে। এছাড়া ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ যেসব সিনিয়র কর্মকর্তাকে ‘বিএনপিপন্থি’ বলে মনে করেছে, তাদেরকে ওএসডি করেছে। ক্ষমতায় আসার পর পর প্রায় এক ডজন সচিবকে ওএসডি বানানো একটি উদাহরণ। এরা ওএসডি হিসাবে ইতিমধ্যে অবসরে গেছেন।
সরকার স্বীকার না করলেও পত্রপত্রিকার খবর ও অন্যান্য নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, ২০০৭ সালে অনুষ্ঠেয় নবম সংসদ নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে বিএনপি সরকার যেভাবে প্রশাসনকে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছিল, আগামী দশম সংসদ নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার সেভাবে প্রশাসনকে সাজাতে ব্যস্ত। অনেকে মনে করেন, সাধারণ নির্বাচনে ডিসিকে রিটার্নিং অফিসার এবং ইউএনওকে সহকারি রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ করার প্রথা থেকেই মূলত প্রশাসনে দলীয়করণের সৃষ্টি। এসব কর্মকর্তার নিয়ন্ত্রণ অর্থাত্ তাদের পদোন্নতি, বদলি ইত্যাদি সরকারের নিকট থাকায় ক্ষমতাসীন সরকারের পক্ষে নির্বাচনে তাদেরকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা অনেকটা সহজ হয়। যেহেতু নির্বাচনের সঙ্গে ম্যাজিস্ট্রেসি, আইন-শৃংখলা রক্ষাসহ প্রাসঙ্গিক অনেক বিষয় জড়িত থাকে, সেহেতু তাদের বিকল্প খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় প্রশাসন দলীয় সরকারের চাপের মুখে থাকে না বিধায় সে সময় মাঠপ্রশাসনসহ সর্বস্তরের প্রশাসন নির্বাচন পরিচালনায় নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে প্রায় সক্ষম হন।
নিরপেক্ষ নির্বাচনে যে বিষয়টি অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো ইসির নিরপেক্ষতা। কারণ সংবিধানে সাধারণ নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব ইসির ওপর ন্যস্ত করেছে। সংবিধানে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে আইন প্রণয়নের নির্দেশনা থাকলেও গত চার দশকে তা করা হয়নি। ফলে তাদের নিয়োগ সময়ে সময়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত সরকারের খেয়াল-খুশির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। অভিযোগ উঠেছে ইসি দলীয়করণের, ইসির নিরপেক্ষতা নিয়ে। রিটার্নিং অফিসার, সহকারি রিটার্নিং অফিসার, প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারি প্রিজাইডিং অফিসার ইসি কর্তৃক নিয়োজিত হন এবং নির্বাচনকালে তারা এবং নির্বাচনের সঙ্গে জড়িত অন্যরা ইসির নিয়ন্ত্রণে থাকেন। সুতরাং ইসি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থাকলে নির্বাচনের সঙ্গে জড়িত সকলে নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনে উত্সাহিত হন।
সবশেষে যা বলা দরকার তা হলো, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ভূমিকা অপরিসীম। নিরপেক্ষ সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদে জনগণের ইচ্ছের প্রতিফলন ঘটে। তা না হলে যে সংসদ গঠিত হয় তাতে জনগণের ইচ্ছের প্রতিফলন হয় না। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনই পারে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও এর বিকাশ নিশ্চিত করতে। তাই দেশ ও গণতন্ত্রের স্বার্থে ক্ষমতাসীন দলের উচিত হবে সাধারণ নির্বাচনে প্রশাসনকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা।
লেখক :সাবেক সচিব
E-mail: latifm43@gmail.com