জেন্ডার ইস্যু
এই নিগ্রহের শেষ কোথায়
প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:৪২
ইদানিং অর্থাত্ গত চারমাস ধরে যে বিভীষিকাময় সংবাদ আমাকে (গোটা দেশবাসীকে) আলোড়িত, আতংকিত এবং শিহরিত করছে সেই বিভীষিকার নাম ধর্ষণ। যে বাংলাদেশে অক্ষুণ্ন ছিল মেয়েদের নিরাপত্তাবোধ, নারী হিসাবে তাদের সামাজিক মর্যাদা আজ ধূলিলুণ্ঠিত। শুধু নারী ধর্ষণ নয়, শিশু ধর্ষণের ঘটনা এবং ধর্ষণের পর হত্যার মতো নৃশংস ঘটনাও ঘটে চলেছে।
নারী নির্যাতন, শ্লীলতাহানি বা ধর্ষণ, ইভটিজিং এবং হত্যা সভ্যতার যে কোনও ক্ষেত্রেই ধিক্কারজনক ঘটনা। একথা সত্য যে, বিশ্বের বহু দেশেই এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে। কিন্তু সম্প্রতি জাতিসংঘের হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট প্রতিবেদন অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশেই এর হার বেশি, যা আমাদের দারুণভাবে আতংকিত করে। এর মূল কারণ হিসাবে বলা যায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে নারীর নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত দুর্বল। চিন্তায়, শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে, কৃষ্টিতে, রাজনীতিতে কোথাও কোন জরার ছাপ নেই বাংলাদেশে অথচ নারীর প্রতি সহিংসতা কমেনি। কারণ অনেকেই আমাদের ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ থেকে সরে গেছেন। সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি ও তার আংশিক রূপায়ণ সত্ত্বেও নারীকে অবহেলিত ও অনুন্নত সম্প্রদায় হিসাবে ভাবার প্রবণতা প্রশ্রয় দেয়া হয়েছে আমাদের সমাজের প্রতি স্তরেই। আজ আমরা ধরেই নিয়েছি যে, এটাই রীতি এবং আমাদের কাজকর্মের মধ্যে যে অপরাধবোধ কাজ করা উচিত সেই বোধটাই হারিয়ে যাচ্ছে। যাচ্ছে বলেই সামগ্রিকভাবে অপরাধমূলক কাজকর্মের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যাচ্ছে। এবং আমরা চূড়ান্তভাবে আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছি বলেই অন্যের আর্তনাদে আমাদের হূদয় আর তেমন আন্দোলিত হচ্ছে না। নিজেকে নিয়েই আমরা এত ব্যস্ত থাকি যে, অন্যের কষ্ট অনুভব করার মতো মন কোথায়? সেই কারণে আমাদের দেশে চাঞ্চল্যকর কিছু ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হলেও তা মূলত সীমাবদ্ধ থেকেছে নারী সংগঠন ও স্থানীয় গোষ্ঠীর মধ্যে। কিন্তু এই ভয়াবহ অবস্থা প্রতিরোধ করতে এবং সমাজ থেকে এই বিপর্যয় দূর করতে সমাজের মূলধারা বিশেষত সুশীল সমাজ ও রাজনীতিবিদরা জাতীয় ঐকমত্য নিয়ে একত্রে বসেননি। আমরা অনেক ক্ষেত্রে দেখি আমাদের বড় বড় সামাজিক বিপর্যয় এবং নারী নির্যাতনের ব্যাপারে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবী সমাজ সমান নীবরতা পালন করেন। অথচ আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে এক ধর্ষণের ঘটনা পুরো বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। এ বর্বরতার বিচার চেয়ে পুরো ভারতবাসী ফুঁসে উঠেছে। তাদের কঠোর শাস্তি দাবি করে তীব্র আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছে দেশটির ভেতর। অথচ আমাদের দেশের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন।
আমাদের দেশে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, কোনও নারী নিগ্রহের ঘটনা ঘটলেই সমাজের অঙুলি থাকে নারীর দিকেই। ফলে ধর্ষিতার ঠাঁই মেলে না সমাজ বা পরিবারে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কোনও ভাবেই মেনে নেয় না তাকে। অথচ মেয়েটির যে কোনও অপরাধ নেই, সে পরিস্থিতির শিকার। ফলে ধর্ষিতা নারী চরম দুর্ভোগে পড়ে হয় আত্মহননের পথ বেছে নেয়, নয়ত বিপথগামী হতে বাধ্য হয়।
এছাড়া রয়েছে পুলিশ ও প্রশাসনের ব্যর্থতা ও উদাসীনতা। অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থতাকে আড়াল করতে আইনি জটিলতাকে দায়ী করা হয়। অথচ সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা এবং নিরাপত্তা বজায় রাখার মূল দায়িত্ব পুলিশের। নারী ও শিশু নির্যাতনের জন্য ২০০৩ সালের অধ্যাদেশে নেয়া হয়েছে বিশেষ শাস্তির বিধান। তারপরও কি সমাজ থেকে এ অপরাধ প্রবণতা কিছু কমেছে? এক কথায় বলা চলে, না। কারণ আইন আছে কিন্তু সুষ্ঠু প্রয়োগ নেই। তাই অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত ধর্ষিতার ন্যায়বিচার পেতে প্রতি মুহূর্তে কঠিন পরিস্থিতির শিকার হতে হচ্ছে। অতি সম্প্রতি জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি প্রদত্ত তথ্যে জানা যায়, বিগত এক বছরে দেশে ৩১৭ জন নারী ও শিশু খুন হয়েছে, যাদের মধ্যে অনেকেই ধর্ষিতা হয়েছিল। ৮৮ জন নারী ও কিশোরী যৌন হয়রানির ও ইভটিজিং-এর শিকার হয় এবং নির্যাতনের মাধ্যমে প্ররোচিত হয়ে আত্মহত্যা করেছে ৪৭ জন। এ পরিসংখ্যান আংশিক হওয়া সত্ত্বেও একটি দেশের নারী নিগ্রহের যে অমানবিক চিত্র ফুটে উঠেছে তাতে করে শিউরে উঠতে হয়।
সুতরাং নারীর সম্মান, নারীর বিরুদ্ধে সহিংস আচরণ, পৈশাচিক কায়দায় ধর্ষণ ও হত্যার মতো বর্বরোচিত ঘটনা প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা দরকার। এক্ষেত্রে সচেতন, সভ্য, শিক্ষিত মানুষের দায়িত্ব অপরিসীম—এ কথা অনস্বীকার্য।
লেখক :