যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংলাপ কি আসন্ন
প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:৩৫
সমপ্রতি ইরানের প্রেসিডেন্ট আহমাদি নেজাদ, বিচার বিভাগের প্রধান আয়তুল্লাহ সাদেক লারিজানি, প্রভাবশালী রক্ষণশীল নেতা জাওয়াদ লারিজানি, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মানুচেহের মুত্তাকি ও বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সাবেক প্রধান মুহসেন রেজাই প্রকাশ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করেছেন। ওয়াশিংটনের সাথে তেহরানের সংলাপের বিষয়টি যখনই সামনে এসেছে, তখনি দেখা গেছে ইরানের কট্টর রক্ষণশীলরা তা অগ্রাহ্য করেছেন। তাদের কথা হলো যে কোন আলোচনা বা সংলাপের আগে যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ব্যাপারে কিছু নীতির পরিবর্তন করতে হবে,এবং আলোচনার জন্য এমন একটি পরিবেশ তৈরী করতে হবে যেখানে দু’পক্ষের সমান মর্যাদা নিশ্চিত করা হবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সামপ্রতিক কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন যা ইরানের সাথে সংলাপ শুরু করা এবং মধ্যপ্রাচ্য সঙ্কট সমাধানের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই হয়ত তিনি এই পদক্ষেপ নিয়েছেন। আফগানিস্তান ও ইরাকে ব্যর্থতার বোঝা লাঘব হতে না হতেই আরব বসন্তের ধাক্কায় পশ্চিম আফ্রিকা থেকে গোটা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে মার্কিন স্বার্থ যেভাবে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে, তাতে ইরানের মত গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশের সাথে চরম বৈরী সম্পর্ক বজায় না রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের একদল বুদ্ধিজীবী। ফিলিস্তিন ইস্যুতে বিতর্কিত ভূমিকার কারণে মুসলিম বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়া সাবেক প্রেসিডেন্ট বুশের রণ-ডঙ্কা যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়েছে চরম যুদ্ধবাজ দেশের কুখ্যাতি। এই প্রেক্ষাপটে প্রেসিডেন্ট ওবামা হয়ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে চাক হ্যাগেলকে নিয়োগ দিয়েছেন। মিঃ হ্যাগেল মার্কিন প্রশাসনে একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তারকারী ইহুদীবাদী লবির কট্টর সমালোচক হিসেবে পরিচিত। এটা কারো অজানা নয় যে মার্কিন সরকার ও প্রশাসনে ইসরাইলের পৃষ্ঠপোষক ইহুদীবাদী লবিটি অত্যন্ত প্রভাবশালী। ইহুদীবাদী লবির মন জয় করা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে কারো পক্ষে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া কঠিন বলেই মনে করা হয়। মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে এই লবির প্রভাব অত্যন্ত সুস্পষ্ট। ইরান, ফিলিস্তিন ও লেবাননের হিজবুল্লাহর ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি পর্যালোচনা করলে দেশটিতে ইসরাইলী লবির প্রভাব অনুমান করা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দুই দল ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে দ্বিতীয় দলটিকে তুলনামূলক ভাবে বেশি ইসরাইল ঘেঁষা মনে করা হয়। কিন্তু ডেমোক্র্যাট দল থেকে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ওবামা তার দ্বিতীয় মেয়াদে পদার্পণ করেই এমন একজনকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর মত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, যিনি রিপাবলিকান দলের সিনেটর। যিনি ইসরাইল ও ইহুদীবাদী লবির আস্থাভাজন নন,যিনি ইহুদীবাদী লবির কড়া সামালোচক ।
সিনেটর হ্যাগেল ২০০৬ সালে ডেভিড মিলারকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে প্রকাশ্যেই বলেছেন, “আমি ইসরাইলের সিনেটর নই, আমি যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর। আমি যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রতি অনুগত, না ইসরাইলের সংবিধানের প্রতি”। তিনি ২০০১ সালে ইরান ও লিবিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করেছেন, ২০০৭ সালে যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকায় যুক্ত করে তখন তিনি তার তীব্র সমালোচনা করেন। ২০০৮ সালে তিনি ইরানের বিরুদ্ধে চাপ সৃষ্টির বাড়তি নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করেন। ২০০৫ সাল থেকেই তিনি ইরানের উপর চাপ সৃষ্টির নীতি পরিহার করে সংলাপের পথ অনুসরণের কথা বলে আসছেন। গত সেপ্টেম্বরে ওয়াশিংটন পোষ্টে প্রকাশিত এক নিবন্ধে সিনেটর হ্যাগেল ইরানে হামলার বিষয়ে লিখেছেন, হামলা করে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নস্যাত করা যাবে না। বরং এর ফলে ইরানীরা আরো প্রত্যয়ী হবে, এছাড়া কোন হামলা হলে ইরান ও ইরানপন্থি মিলিশিয়া দলগুলো প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য যে পাল্টা হামলা চালাবে তাতে যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রচণ্ড আঘাত আসবে। তিনি ফিলিস্তিনের হামাস ও লেবাননের হিজবুল্লহকে সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার বিরোধিতা করেছেন।ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন মনে করলেও সিনেটর হ্যাগেল ২০০৯ সালে হামাস ও ফতাহ আন্দোলনের সমন্বয়ে সরকার গঠনের প্রচেষ্টাকে সমর্থন করেন।
এসব দিক বিবেচনা করলে চাক হ্যাগেলকে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর পদে নিয়োগ দেয়ার বিশেষ তাত্পর্য রয়েছে বলেই মনে হবে। ঘটনাটি অনেকটা এক ঢিলে দুই পাখি মারার মত। রিপাবলিকান সিনেটর হ্যাগেলকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী নিয়োগ দেয়ায় ওবামার সরকার মার্কিন জনগণের কাছে সর্বদলীয় সরকারের মর্যাদা পাওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করতে পারে। অন্যদিকে তার সরকার যে ইসরাইলের ব্যাপারে অন্য সরকারগুলোর চেয়ে ব্যতিক্রমী তা ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশকে বুঝানো সহজ হবে। ইহুদীবাদী লবির সমালোচনা উপেক্ষা করে মন্ত্রী পদে হ্যাগেলকে নিয়োগের মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বকে এই বার্তাটিও দেয়ার চেষ্টা হয়েছে যে প্রেসিডেন্ট ওবামা মধ্যপ্রাচ্য সঙ্কট সমাধানে নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখতে চান। কাজেই প্রেসিডেন্ট ওবামার সাম্প্রতিক পদক্ষেপের ফলে মধ্যপ্রাচ্য সঙ্কট সমাধান ও ইরানের সাথে সরাসরি সংলাপের পথ অনেকটাই মসৃণ হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তবে আগামী জুলাই মাসের আগে ইরানের সাথে সংলাপ শুরু হওয়ার যে কোন সম্ভাবনা নেই তা নিশ্চিত করে বলা যায়। কারণ জুনের শেষ দিকে ইরানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চয়ই নতুন সরকারের সাথে সংলাপে যাওয়াকেই প্রধান্য দিবে।
লেখক : রেডিও তেহরানের প্রাক্তন পরিচালক