[ রা জ নী তি ]
তাঁর এই খেলা বোঝা ভার
প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:৩১
জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ গতকাল শনিবার রাজধানীর বনানী বিদ্যানিকতনের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘বিএনপি বলছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল ছাড়া নির্বাচনে যাবে না। আর আওয়ামী লীগ সেটি চাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি নির্বাচনে না এলে হয়তো নির্বাচন হবে। কিন্তু সেই নির্বাচনে নির্বাচিত সরকার কতদিন ক্ষমতায় থাকতে পারবে, তা নিয়েও সংশয় আছে।’
প্রধান দুই দলের অনড় অবস্থানের কারণে ওয়ান ইলেভেনের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে কিনা এমন এক প্রশ্নের জবাবে এক পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, হতে পারে’। এমনকি সেনা নিয়ন্ত্রিত বা সমর্থিত কোন সরকার এলে জাতীয় পার্টি- জাপা তাতে সমর্থন দেবে কিনা সেই প্রশ্নও করা হয়েছিল তাঁকে। তার জবাবে তিনি তাঁর মতো করে বলেন, ‘পরিস্থিতি যাই হোক, একটি সরকার তো ক্ষমতায় যাবে। সেটি তখন দেখা যাবে।’
এর আগে গত বৃহস্পতিবার তিনি বলেন যে, আগামী নির্বাচনে সকল দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে দেশে সংঘাত সৃষ্টি হবে। সেই সঙ্গে তিনি এটাও বলেন যে, আগামীতে জাপা এককভাবে নির্বাচন করবে। অতীতে মহাজোটগতভাবে নয়, বরং জাপা এককভাবে নির্বাচন করেই লাভবান হয়েছে। এইচ এম এরশাদের এসব কথা-বার্তাকে গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিত। কেননা তিনি দীর্ঘ নয় বছর বাংলাদেশ শাসন করেছেন। রাষ্ট্রপরিচালক হিসেবে তাঁর যেমন অনেক ব্যর্থতা আছে, তেমনি সাফল্য কম নয়। তার চেয়ে বড় কথা হল, তিনি শাসনক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়ার পর আবার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে নানাভাবে চেষ্টা-চরিত্র করে যাচ্ছেন। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বলে আসছেন যে, তিনি আবার ক্ষমতায় আসছেন। গত বছর তিনি ভারত সফর করেন। সফর শেষে দেশে ফিরে এসেই বলেন যে, তিনি আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। অঙ্কের নানা হিসেব কষে ও সমীকরণ করে তিনি দেখান যে, এ পদে তাঁরই জেতার সম্ভাবনা বেশি। এজন্য সব কয়টি আসনে প্রার্থী বাছাইয়ের কাজও তিনি শুরু করেন। তাঁর এই তত্পরতায় অনেকেই অবাক হননি।
নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর তিনি গ্রেফতার হন এবং দীর্ঘ কারা ভোগ করেন। তবে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পর তার গুরুত্ব বাড়তে থকে। তিনি এই গুরুত্বের জন্য কারামুক্তিও লাভ করেন। কিন্তু তার যে অভীষ্ট তা অর্জিত হয়নি আজও। তাঁর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখলের অভিজ্ঞতা রয়েছে নিঃসন্দেহে। সে বিষয়টি খাটো করে দেখার কোন অবকাশ নেই। যদিও তিনি প্রডাক্ট অব পলিটিক্স নন বা রাজনীতি করে উঠে আসেননি, তথাপি তিনি পাওয়ার প্লেয়ার তথা ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির একজন চৌকষ খেলোয়াড় হিসেবেই পরিচিত। সরাসরি ক্ষমতায় না এলেও তিনি এখন প্রতিটি সরকার গঠনে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা ও ভূমিকা পালন করছেন। বলতে গেলে তাঁকে পাশ কাটিয়ে সরকার গঠন এখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ১৯৯৬ থেকে অদ্যাবধি তিনি আবার ক্ষমতায় যাওয়ার অভিলাষ থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি। এই না পারার পেছনে যথেষ্ট কারণ আছে।
আজ এত বছর পরও টেলিভিশনের টক শো ও গোলটেবিল বৈঠকে অনেকে এরশাদ যমানার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তাদের কেউ কেউ বারবার বলছেন, নির্বাচিত দুই নেত্রীর চেয়ে এরশাদের সরকার বেটার বা তুলনামূলকভাবে ভাল ছিল। সাথে সাথে তারা এ কথাও বলছেন যে, তারা স্বৈরশাসনকে সমর্থন করেন না। স্বৈরশাসকের প্রতি তারা বিদ্বিষ্ট ও বিরুদ্ধশীল। এই কথা প্রমাণ করতে তারা সেসময় স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে কে কতটা সক্রিয় ও সংগ্রামী ভূমিকা পালন করেন, সে কথাও উচ্চকণ্ঠে বলতে তারা ভুল করছেন না। তবে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, ২২/২৩ বছর পরও এরশাদ সরকারের প্রশংসা আমরা এখনও শুনতে পাই। অনেক ক্ষেত্রে বাইরে, আবার অনেক ক্ষেত্রে ঘরের ভেতরে।
আমরা পূর্বেই বলেছি, রাজনীতির মাঠে-ময়দানে এইচ এম এরশাদ একজন দক্ষ খেলোয়াড়। তিনি নব্বই দশক থেকে কখনো বিএনপি ও কখনো আওয়ামী লীগের সাথে ভাব জমিয়ে আসছেন। সখ্য স্থাপন ও পুন:স্থাপনের চেষ্টা করছেন। তাঁকে মুখে স্বৈরাচার বলা হলেও এবং তাঁর বয়স আশি পেরিয়ে গেলেও তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ফুরোচ্ছে না। যখন ১৯৯১ সালে এরশাদ সাহেবসহ তার ঘনিষ্ঠদের গ্রেফতার করে জেলে পুরে রেখে গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তখনও অবিভক্ত জাতীয় পার্টি ৩৫টি আসন লাভ করে। এরশাদ সাহেব নিজে বিধি অনুযায়ী পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবকয়টিতেই জয়লাভ করেন। সর্বশেষ ২০০৮ সালের নির্বাচনে একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ তিনটি আসনে লড়াই করতে পারবেন এমন বিধান জারি করা হয়। এসময়ও তিনি তিনিটি আসন থেকেই জয়লাভ করার কৃতিত্ব দেখান।
ওয়ান ইলেভেন আসার পূর্বে একদিকে তিনি যেমন বিএনপির সাথে সখ্য রক্ষা করে চলেন, তেমনিভাবে বোধগম্য কারণে আওয়ামী লীগের সাথেও সুসম্পর্ক রক্ষা করেন বা সম্পর্ক রক্ষার ব্যবস্থা করা হয়। বর্তমানে এরশাদ সাহেবের জাতীয় পার্টি-জাপা আওয়ামী লীগের মহাজোটে রয়েছে। উল্লেখ্য, ১৪ দল (বামপন্থি-উগ্রপন্থি-কমিউনিস্ট পার্টি) নিয়ে করা হয়েছে জোট। আর যারা উগ্রপন্থি ও সর্বহারা নন, তাদেরকে নিয়ে করা হয়েছে মহাজোট। আরও উল্লেখ করা যেতে পারে যে, এই সরকারের মন্ত্রিসভায় তাঁর সহোদর জিএম কাদেরের পদচারণা রয়েছে। তিনি আগে ছিলেন বেসরকারি বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী। বর্তমানে বাণিজ্যমন্ত্রী।
বর্তমানে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা নিয়ে যতই অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে, এরশাদ সাহেবের ‘পাওয়ার প্লেয়ার’ হিসেবে খেলার সুযোগ ততই বাড়ছে। যখন থেকে তারা আগামী বছরের শুরুতে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচন বয়কট করার হুমকি দিচ্ছেন ও আন্দোলনের ভয় দেখাচ্ছেন, তখন থেকেই এরশাদের জাতীয় পার্টি-জাপা চাঙ্গা হচ্ছে। তখন থেকেই তিনি আগামীর নির্বাচনে এককভাবে অংশগ্রহণের ইচ্ছে প্রকাশ থেকে শুরু করে মহাজোট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথাও বলছেন। তাঁর দলের নেতাদের একাংশ কঠোর ও কঠিন ভাষায় সরকারের সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠছে। কেউ কেউ বলছেন, এবার আওয়ামী লীগের ভরাডুবি হবে। এমনকি দলের চেয়ারম্যানও ইতোমধ্যে বলেছেন যে, ক্ষমতাসীন দল আগামী নির্বাচনে ১০০টির বেশি আসন পাবে না। কিন্তু মহাজোট থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্তটি তিনি নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন।
বস্তুত এই অতি সাম্প্রতিককালে হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের কথা-বার্তায় কিছুটা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়। এটাকে গুণগত পরিবর্তন বলাই শ্রেয়। তিনি বলছেন যে, আওয়ামী লীগ এককভাবে নির্বাচন করলে সে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না। দেশ সংঘাতের দিকে যাবে ইত্যাদি। গত কয়েক দিনের আলাপ-আলোচনায় এই বিষয়টিই মুখ্য হয়ে উঠে আসছে। আর সর্বশেষ তিনি বললেন যে, বিএনপিকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করলে পরিণতি ভাল হবে না। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হলেও ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের নির্বাচনের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। ফলে সরকার শেষপর্যন্ত ধোপে টিকবে না।
এরশাদ সাহেবের মতিগতি বোঝা অতটা সোজা নয়। তাঁর মত সুনিপুণ খেলোয়াড়ের খেলা বুঝতে পারা আমাদের মতো আমজনতার যে কঠিন হবে সে কথা বলাই বাহুল্য। তারপরও তাঁর এই সাবধান বাণী সংশ্লিষ্ট সকল মহলকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। যদিও অনেক বিদগ্ধজন ও ভূ-রাজনীতির ব্যাপারে ওয়াকিফহাল মহল মনে করেন যে, বিএনপি কেন সকল দলকে বাদ দিয়েও যদি আওয়ামী লীগ নির্বাচন করে তাহলে আকাশ ভেঙে পড়বে না।
লেখক : সাংবাদিক
faijulislam81@gmail.com