দিবস
কুষ্ঠরোগে আক্রান্তদের মানবাধিকার
প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:৩১
আজ বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস। বিশেষ করে কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংগে যে সমস্ত সংগঠন কাজ করে তারা এদিনে কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত অসহায় ও মানবাধিকারবঞ্চিত মানুষের জন্য প্রার্থনাসহ, বিভিন্ন সেমিনার, র্যালি, কুষ্ঠরোগের চিকিত্সা ও তার বিষয়ে প্রচার-প্রচারণামূলক বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করে থাকে। এইডস্, ম্যালেরিয়া ও যক্ষ্মার মতো কুষ্ঠরোগের প্রকোপ ব্যাপক না হলেও এ রোগে বহু মানুষ আক্রান্ত হয় এবং এর শারীরিক অসুস্থতার চেয়ে মানসিক ও সামাজিক কুফল আক্রান্ত ব্যক্তি ও তার পরিবার-পরিজনদের জন্য দুঃসহ ও বেদনাময়। কুষ্ঠ একটি মৃদু সংক্রামক রোগ। এ রোগের কারণ Mycobacterium Leprae নামক এক জীবাণু। নরওয়ে দেশের অধিবাসী Armauer Hansen নামক একজন ডাক্তার ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে এই জীবাণুকে শনাক্ত করেন বলে কুষ্ঠরোগ (Leprosy) “হ্যানসেন ডিজিস” নামেও পরিচিত। Mycobacterium Leprae দেখতে অনেকটা যক্ষ্মার জীবাণুর মতো। কুষ্ঠরোগের জীবাণু শরীরের প্রান্তিক স্নায়ু ও চামড়া আক্রমণ করে তাকে অসার ও অনুভূতিহীন করে দেয়। ফলে অনুভূতি নষ্ট ও মাংসপেশী দুর্বল হয় এবং কালক্রমে বিকলাঙ্গতা দেখা দেয়। বাইরের আঘাতে ঐ সমস্ত অংশ, বিশেষ করে হাত-পায়ের আঙ্গুলে পচন ধরে ও ক্ষয়ে বিলুপ্ত হয়ে যায়; আক্রান্ত অন্যান্য অঙ্গের হানি হয়। এই সমস্ত শারীরিক ক্ষতি বা বিকলাঙ্গতা ও বিকৃতি সাধারণত দেখতে কুিসত বলে আজো আক্রান্ত মানুষকে সর্বসাধারণের সমাজের বাইরে রাখা হয়; একান্ত আপনজনও অনেক সময় তাকে তাদের কাছে রাখতে চায় না, তাদের চিকিত্সার জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা হয়, এমনকি মৃত্যুর পরেও তাদের পৃথক স্থানে কবরস্থ করা হয়ে থাকে। বাইবেলসহ বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থে এবং অন্যান্য বই-পুস্তক ও সাহিত্য, ছবিতে কুষ্ঠরোগীদের মানবেতর জীবনের করুণ কাহিনীর বর্ণনা আছে। এর একটা কারণ হচ্ছে, প্রাচীনকাল হতে চলে আসা কুসংস্কার এবং ভ্রান্ত ধারণা। এর অপর কারণ হচ্ছে বিকলাঙ্গতা। কেবলমাত্র কয়েকটি রোগ ব্যতিরেকে অন্য কোন রোগের কারণে কুষ্ঠরোগের মতো এত অধিক অঙ্গ বিকৃতি ঘটায় না। আদিকাল থেকে কুষ্ঠরোগীরা সামাজিকভাবে ঘৃণিত ও অগ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়ে এসেছে।
এই অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন। জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নতি ও সকলের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার এ যুগে কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত মানুষের জন্য সর্বস্তরেই প্রয়োজন তাদের মানবাধিকার সংরক্ষণের জন্য সচেষ্ট হওয়া ও উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা। অন্যান্য ব্যাধি-পীড়ার বেলায় কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদেরও সর্বত্র সরকারি-বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিত্সা প্রতিষ্ঠানে চিকিত্সার সুযোগ ও ব্যবস্থা থাকা উচিত। চিকিত্সাক্ষেত্রে এই সম্পৃক্তকরণ এবং অবহেলিত এই মানুষের অন্যান্য আর্থ-সামাজিক অধিকারের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিতকরণ এখন সময়ের বড় একটা দাবি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ব্যবস্থাপনা অনুসারে ১৯৮১ সাল থেকে Dapsone, Clofazimine ও Rifampicin— এই তিন ধরনের ঔষধের সংমিশ্রণে তৈরি ঔষধ, যা MDT (Multi Drug Therapy) বলে পরিচিত, তা এ পর্যন্ত এ রোগের জন্য প্রধান ঔষধরূপে ব্যবহূত হয়ে আসছে। বাংলাদেশে গত কয়েক বত্সর যাবত্ গড়ে প্রায় ৫-৬ হাজার কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়ে থাকে।
কুষ্ঠরোগীদের বিষয়ে ব্রিটিশ শাসনামলের বিভিন্ন আইন এই রোগীদের সমাজ থেকে দূরে রাখার জন্য করা হয়েছিল। আমাদের সংসদ ঐসব আইন বাতিল করেছে ২০১১ সালে। তবে আরো বড় প্রয়োজন আমাদের মনমানসিকতার পরিবর্তন, যাতে ঐ রোগে আক্রান্ত মানুষ তার মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়।
কুষ্ঠরোগীদের জন্য ও তাদের সঙ্গে অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বাংলাদেশসহ পৃথিবীতে কাজ করছে। তাদের মধ্যে The Leprosy Mission International একটি। বাংলাদেশে ঐ সংগঠন দীর্ঘদিন যাবত্ কুষ্ঠরোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিত্সা, তাদের আর্থ-সামাজিকভাবে পুনর্বাসন ও তাদের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কাজ করছে। এই সংগঠনের স্বপ্ন ও দর্শন: কুষ্ঠমুক্ত এক পৃথিবী। এ দর্শনকে কেন্দ্র করে তাদের বর্তমান লক্ষ্য হচ্ছে কুষ্ঠরোগের কারণ ও কুফল দূরীকরণ। এর জন্য কুষ্ঠরোগীদের স্বার্থে যে কোন কাজকে মানুষের উন্নয়নমূলক কাজের মূল স্রোতধারার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা অবশ্যই প্রয়োজন। আমাদের আবেদন ও প্রত্যাশা, যেন সমাজের সকল স্তরের মানুষ কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সমাজে পূর্ণ মানবীয় অধিকারে পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যথাসাধ্য করতে এগিয়ে আসেন।
লেখক:The Leprosy Mission Bangladesh-এর
Advocacy বিভাগের পরিচালক এবং
সমাজসেবক