ভেনিজুয়েলার কারাবিদ্রোহ
প্রকাশ : ২৭ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:৩২
ভেনিজুয়েলার একটি কারাগারে বন্দী ও নিরাপত্তাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ৫৪ জন নিহত হওয়ার সংবাদ পাওয়া গিয়াছে। এই ঘটনায় আহত হইয়াছে ৯০ জন। গত শুক্রবার পশ্চিমাঞ্চলীয় লারা স্টেটের উরিবানা কারাগারে এই ঘটনাটি ঘটে। বন্দীদের অস্ত্র তল্লাশিতে সেনাবাহিনী পাঠানো হইয়াছে স্থানীয় গণমাধ্যমে এমন সংবাদ প্রকাশের পরই গণ্ডগোল শুরু হয়। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়িতে পারে বলিয়া আশঙ্কা প্রকাশ করিয়াছে কারাবন্দীদের অধিকার নিয়া কাজ করা সংগঠন ‘এ উইনডো টু ফ্রিডম’।
ল্যাটিন আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলায় এ ধরনের ঘটনা এমন সময়ে ঘটিল যখন দেশটির প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ ক্যান্সার চিকিত্সার জন্য কিউবায় রহিয়াছেন। হাভানার একটি হাসপাতালে গত ১১ ডিসেম্বর তাহার দেহে চতুর্থবারের ন্যায় অস্ত্রোপচার করা হয়। অস্ত্রোপচারের পর তাহার শ্বাসতন্ত্রে সংক্রমণ দেখা দেয়। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী তিনি এখন এই সংক্রমণ হইতে মুক্ত। উল্লেখ করা যাইতে পারে যে, সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি জনপ্রিয়তার জোরে চতুর্থবারের মতো নির্বাচিত হইয়াছেন বলিয়া দাবি করা হয়। তবে অসুস্থতার জন্য এখনও শপথ গ্রহণ করিতে পারেন নাই। ইহার আগে তিনি সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে চতুর্থবারের ন্যায় নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার জন্য তথাকথিত বৈধতা অর্জন করেন। এমতাবস্থায় ভেনিজুয়েলায় এক ধরনের রাষ্ট্রীয় সংকট সৃষ্টি হইয়াছে এবং এই সুযোগে কারাবন্দীরা দাঙ্গা-হাঙ্গামা বা বিদ্রোহের সূত্রপাত ঘটাইয়াছে বলিয়াই প্রতীয়মান হয়। উল্লেখ্য, বর্তমানে ভেনিজুয়েলা এক যুগেরও বেশি সময় ধরিয়া কমিউনিস্ট শাসকদের দ্বারা শাসিত হইয়া আসিতেছে। হুগো শ্যাভেজ বারবার নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসিলেও অনেকে মনে করেন তিনি দেশটিতে নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্র ও একনায়কতন্ত্র কায়েম করিয়াছেন। সেখানে বিরোধী মতকে নানাভাবে দমন করা হইতেছে যাহা অবশ্যই অগণতান্ত্রিক। কেহ কেহ বলেন, ভেনিজুয়েলা পরিণত হইয়াছে একটি পুলিশী রাষ্ট্রে। যাহার প্রমাণ হইল দেশটির কারাগারগুলি এখন বিরোধী নেতা-কর্মীদের দ্বারা ভরিয়া গিয়াছে। কোথাও তিল ধারণের ঠাঁই নাই।
জানা যায়, ভেনিজুয়েলার কারাগারগুলিতে ১৪ হাজার বন্দীর ধারণক্ষমতা রহিয়াছে। কিন্তু রাখা হইয়াছে প্রায় অর্ধ লক্ষ বন্দী। ফলে কারাগারগুলিতে অব্যবস্থাপনা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হইয়াছে। প্রায়শ সেখানে সহিংস ঘটনা ঘটিতেছে। এইসব ঘটনার জন্য বিরোধী দল বিশেষত গত নির্বাচনে পরাজিত প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হেনরিকস কাপরিলেস সরকারের ব্যর্থতাকে দায়ী করিয়াছেন। উল্লেখ্য, ভেনিজুয়েলায় দুই ধারার রাজনীতি বিদ্যমান। একদিকে আছেন খ্রিস্টান ডেমোক্রাটরা ও অন্যদিকে আছেন সোশাল ডেমোক্রাটরা। ১৯৯৮ সালে বর্তমান প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। প্রকৃতপক্ষে তাহার এই ক্ষমতারোহণের মাধ্যমে বলিভিয়ান রিভ্যুলুশনের সূত্রপাত হয়। ইহার পর তিনি আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া, ব্রাজিল, ইকুয়েডর ও প্যারাগুয়ের বামপন্থি সরকারগুলির সহিত মৈত্রী স্থাপন করেন। হন্ডুরাস ও নিকারাগুয়ার সঙ্গেও এখন ভেনিজুয়েলার শক্তিশালী সম্পর্ক বিদ্যমান। এসব কারণে ভেনিজুয়েলা ঘরে-বাহিরে চাপের সম্মুখীন। সেখানে রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের আশা করিতেছেন অনেকেই।
কারাবিদ্রোহের সহিত সরকার পতনের আন্দোলনের সম্পর্ক আছে বলিয়া অনেকে ধারণা করিতেছেন। যদিও ভেনিজুয়েলার তথ্যমন্ত্রী এক সপ্তাহ পর হুগো শ্যাভেজের দেশে ফিরিবার সম্ভাবনার কথা বলিয়াছেন, তবে অন্য বড় কমিউনিস্ট নেতাদের ন্যায় তাহার স্বাস্থ্যের ব্যাপারে কোন লুকোচুরি খেলা চলিতেছে কিনা তাহাও সুনিশ্চিত নহে। কোন দেশে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হইলে সাধারণত: বিকল্প নেতৃত্ব গড়িয়া উঠা ও বিকশিত হইবার সম্ভাবনা থাকে না। সুতরাং নেতৃত্বের সংকট হইতে সেই রাষ্ট্রে ভয়াবহ রাজনৈতিক সমস্যার উদ্ভব হইতে পারে। ভেনিজুয়েলার ভাগ্যে শেষপর্যন্ত কি ইহাই ঘটিতে যাইতেছে?