ড. কাদরি কি পাকিস্তানের আন্না হাজারে

পাকিস্তানের ভুঁইফোড় রাজনীতিক ও ধর্মীয় নেতা মাহাম্মদ তাহির-উল-কাদরি ব্যাপক শোরগোল তুলেছেন সারাদেশে। ছিলেন কানাডায়। বলা নেই কওয়া নেই আচমকা দেশে ফিরে হুংকার দিলেন বেসামরিক সরকার দুর্নীতিবাজ। এই সরকারের আর ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই। এক্ষুণি পতন চাই। তার আরো দাবি, পার্লামেন্ট ভেঙ্গে দিয়ে এক্ষুণি নির্বাচন দিতে হবে। তার মতে, বর্তমান সরকার শুধু দুর্নীতিবাজ নয়, সেনাবাহিনীকেও অবমূল্যায়ন করছে। সমপ্রতি সরকার পতনের ডাক দিয়ে বিশাল লংমার্চ করেছেন লাহোর থেকে ইসলামাবাদ পর্যন্ত। তিনি এখন পাকিস্তানের রাজনীতিতে অন্যতম আলোচিত ব্যক্তি। ৬২ বছর বয়স্ক ড. কাদরিকে তুলনা করা হচ্ছে ভারতের দূর্নীতিবিরোধী কর্মী আন্না হাজারের সাথে। তিনি প্রায় একদশক ধরে কানাডায় বাস করছেন এবং সে দেশেরই নাগরিক। গত বছর প্রায় এক মাসের জন্য ভারত সফরে এসেছিলেন। ২০১২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি নয়াদিল্লির ইন্ডিয়ান ইসলামিক সেন্টার থেকে ‘দুর্নীতি নিয়ে ফতোয়া’ নামে একটি গ্রন্থও প্রকাশ করেন। তখন তিনি নয়াদিল্লিতে একটা বড় সমাবেশে বলেছিলেন, ‘ইসলামী জঙ্গিবাদ’ কথাটি বলে বলে তাদের হাতকেই মজবুত করা হচ্ছে, যারা কিনা হিংসা আর সন্ত্রাস ছড়িয়ে চলেছে বিশ্বব্যাপী। তিনি গুজরাটের বরোদা সফর করে সেখানেও এসব বিষয় নিয়ে বক্তৃতা করেন। গত ১৪ জানুয়ারি তিনি পাকিস্তানে পার্লামেন্ট অভিমুখে লংমার্চ করলেন। সরকারকে দুর্নীতিবাজ আখ্যা দিয়ে জ্বালাময়ী ভাষণ দিলেন। লংমার্চের প্রথম দিনের পর জনস্রোতে ভাটা পড়লেও তার জ্বালাময়ী ভাষণ বিন্দুমাত্র নিষ্প্রভ হয়নি। একদিন তো তিনি পার্লামেন্ট থেকে মাত্র কয়েকশ মিটার দূরে বুলেটপ্রুফ কাঁচে ঘেরা মঞ্চের ভেতর থেকে সমর্থকদের উদ্দেশে টানা প্রায় চার ঘণ্টা ধরে বক্তৃতা করেন। পাকিস্তানের পত্র-পত্রিকাগুলোর অভিযোগ, তিনি শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর সমর্থনে জারদারি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছেন। কিন্তু এই অভিযোগ তিনি একেবারেই মানতে নারাজ। যদিও তিনি তার ভাষণে বারবার উল্লেখ করেছেন, এই বেসামরিক সরকার দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে অবমূল্যায়ন করছে এবং এই বাহিনীকে দুর্বল করে ফেলার পাঁয়তারা করছে। তিনি বলেন, আমি মানছি যে, বেসামরিক সরকারকে কাজ করতে না দেয়ার জন্য সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনী বা বিচার বিভাগ কোন হস্তক্ষেপ করেনি! গত পাঁচ বছর এই সরকার স্বাধীনভাবে কাজ করেছে; কিন্তু ভালো কিছু করতে পারেনি। এখন আবার সেইসব অসত্ রাজনীতিক লজ্জাজনক নির্বাচন করে আবার ক্ষমতায় আসার পাঁয়তারা করছে। তাদের এ ষড়যন্ত্র জাতি বুঝতে পেরেছে। ফলে গোটা জাতি রাস্তায় নেমে এসেছে এর প্রতিবাদ জানাতে। যথেষ্ট হয়েছে। অসত্ মানুষের জন্য আর কোন জায়গা নেই, এবার সত্ মানুষেরাই পার্লামেন্টের দখল নেবে। পাকিস্তানের বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী কাদরি সাহেবকে তেমন পাত্তা দিতে চান না; কিন্তু চারদিন ধরে ইসলামাবাদ অভিমুখে তিনি যে লংমার্চ করলেন তাকে উপেক্ষা করা মোটেই সহজ নয়। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিনা রব্বানী খার বলেন, পাকিস্তানের ৬০ বছরের ইতিহাসে গণতান্ত্রিকভাবে পালাপদলের দোরগোড়া থেকে যখন আমরা মাত্র দুই মাস দূরে, তখন এই লোকটা অনেক দূরের দেশ থেকে এসে আন্দোলন শুরু করেছেন এবং পাকিস্তানের পার্লামেন্ট ভেঙে দেয়ার কথা বলছেন। ড. কাদরির উত্থান ঠিক সেই সময়ে যখন পাকিস্তান সরকার সামরিক বাহিনী এবং বিচার বিভাগের সাথে বিবাদে জড়িয়ে একটা সুগভীর সংকটে পড়েছে। দেশটির সর্বোচ্চ আদালত একটা দুর্নীতি মামলায় প্রধানমন্ত্রী রাজা পারভেজ আশরাফের বিরুদ্ধে আটকাদেশ জারি করেছে; কিন্তু পাকিস্তানের প্রভাবশালী মন্ত্রীরা ঐ গ্রেফতারি পরোয়ানার সমালোচনা করে বলেছেন, সুপ্রিম কোর্টের এমন আদেশ দেয়ার এখতিয়ার নেই। কাদরি যখন সরকার পতনের আন্দোলন করছেন, সুপ্রিম কোর্ট যখন দেশটির বেসামরিক সরকারের প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করছে, ঠিক সেই মুহূর্তে পাক-ভারত সীমান্তে নতুন করে দেখা দিয়েছে উত্তেজনা। গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে চলেছে দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে। এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যে ভারত অভিযোগ তুলেছে, দুই ভারতীয় সৈন্যের শিরশ্ছেদ করেছে পাকিস্তানি সৈন্যরা, যা রণাঙ্গনের নীতিবিরুদ্ধ। ভারত সরকার এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধের আশঙ্কাও করছেন অনেকে। এই পরিপ্রেক্ষিতে ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল বিক্রম সিং সমপ্রতি এক সাক্ষাত্কারে এব্যাপারে বলেছেন কিছু খোলামেলা কথা। ভারত বর্তমানে অর্থনৈতিকভাবে একটা যুদ্ধ শুরু করতে প্রস্তুত কিনা— এমন এক প্রশ্নের জবাবে বিক্রম সিং বলেন, যুদ্ধ হচ্ছে একটা চূড়ান্ত পদক্ষেপ। অগ্রাধিকারের তালিকায় এটি হতে পারে চরম অবলম্বন। একটা দেশ যুদ্ধে জড়ানোর পূর্বে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। যুদ্ধ এমন একটা বিষয় যার প্রসঙ্গ আসতে পারে একেবারে শেষে। পাকিস্তানের সাথে সামপ্রতিক ঘটনাপ্রবাহে ভারতীয় সামরিক বাহিনীর বর্তমান অবস্থান কি— এ কথার উত্তরে তিনি বলেন, যত ধরনের উপায় অবলম্বন করা যায় আমরা তার মধ্যে চার-পাঁচটি পদক্ষেপ গ্রহণ করব। সরাসরি আলোচনা, দ্বৈত আলোচনা, জনগণের অংশগ্রহণ, সংঘর্ষ এবং তারপরেই আসবে যুদ্ধের প্রশ্ন। সামপ্রতিককালে দুই দেশের জনগণের পারস্পারি যোগাযোগের বিষয়টিকে উত্সাহ দেয়া হচ্ছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে স্নায়ুচাপ কমাতে এর ব্যবহার হচ্ছে। ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রধানের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল— আপনি অভিযোগ উত্থাপন করেছেন যে, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আপনাদের অভিযোগের নির্দিষ্ট প্রমাণ আছে, সেটা কি? উত্তরে তিনি বলেন, ভারতীয় সামরিক বাহিনীর হাতে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ আছে। আমরা বিস্তারিত এবং সকল প্রমাণ সরকারকে দাখিল করেছি। ভারতীয় সৈন্যের শিরশ্ছেদের ব্যাপারে আমাদের দাবির সমর্থনে যথেষ্ট এবং নিশ্চিত প্রমাণ আছে। পাক-ভারত পরিস্থিতির দিকে যারা বিশেষভাবে নজর রাখেন এমন একজন বিশ্লেষক সমপ্রতি এক বেসরকারি টেলিভিশনে বলেন, ড. কাদরির সরকার উত্খাতের হুমকি, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে গ্রেফতারে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ, পাকিস্তানের আসন্ন নির্বাচন এবং সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আশফাক কায়ানির অবসর গ্রহণের সময়— এই বিষয়গুলো একসঙ্গে মিলিয়ে দেখলে দেশটির বর্তমান সংকটের কী কারণ তার একটা যুক্তিগ্রাহ্য উত্তর খুঁজে পাওয়া যাবে। জেনারেল আশফাক কায়ানির এ বছরই অবসর নেয়ার কথা। বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের দুর্নীতিবিরোধী আন্না হাজারের সঙ্গে ড. কাদরির তুলনা করা হচ্ছে। তার কারণ তারা দু’জনেই দৃশ্যত দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছেন। অনেকে মনে করেন, আন্না এখনো রাজনীতিতে নামেননি। তবে মৌলবাদী হিন্দু সংগঠন বিজেপির কাঁধে ভর করে রাজনীতির আসরে নামতে পারেন— এমন একটা ধারণা অনেক আগে থেকেই করা হচ্ছে। অথবা নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে বিজেপি তার কাঁধে সওয়ার হতে পারে বলেও মনে করছেন অনেকে। ড. কাদরির অতটা রাখঢাক নেই। তিনি সেনাবাহিনীর প্রতি জোর সমর্থন ব্যক্ত করছেন। সমর্থন দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীকে গ্রেফতারে সুপ্রিম কোর্টের আদেশের প্রতিও। পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনী ও বিচার বিভাগের প্রভাব কতখানি তা দেশটির ইতিহাসের দিকে লক্ষ্য করলেই পরিষ্কার হয়ে যায়।