মাদকের ‘স্বর্গরাজ্য’ মেক্সিকো
প্রকাশ : ২৭ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:১৬
উত্তর আমেরিকার দেশ মেক্সিকোর নাম শুনলে হয়তো অনেকেই চমকে উঠবেন। কারণ এখানে রয়েছে মাদকের রমরমা ব্যবসা। এ নিয়ে বিবদমান মাদক চক্রের মধ্যে সংঘর্ষে প্রায় প্রতিদিনই কেউ না কেউ মারা যাচ্ছে। রাস্তার ধারে পাওয়া যাচ্ছে বস্তা ভর্তি গলাকাটা লাশ, যা মাঝে মধ্যেই পত্রিকার পাতায় বড় বড় হরফে ছাপা হয়। আর এগুলো যে মাদক চক্রের কীর্তিকলাপ তাতে বোধ হয় দেশটির খোদ মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থারও দ্বিমত নেই । রীতিমতো পুরো দেশটাই এখন এই চক্রের কাছে জিম্মি হয়ে গেছে। এ কারণে মেক্সিকোকে বলা হয় মাদকের ‘স্বর্গরাজ্য’। মনে হয় সরকার এগুলো নিয়ন্ত্রণে পুরোপুরি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বছরে দেশটিতে পাইকারি বাজারে মাদক বিক্রির মাধ্যমে ১ হাজার ৩৬০ কোটি ডলার থেকে ৪ হাজার ৯৪০ কোটি ডলার আসে। অভিযোগ রয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র (মেক্সিকোর উত্তরে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্ত পথ) এই চক্রের হোতাদের কাছ থেকে মাদক নিচ্ছে। অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে আয় বা লাভক্ষতির হিসেব যা-ই হোক দেশটি যে একঅর্থে মাদকের সাগরে ডুবে গেছে এ নিয়ে সম্ভবত সন্দেহের অবকাশ নেই কারোরই। দেশটিতে যে হারে মাদকের ব্যবসা বাধাহীনভাবে এগিয়ে চলছে তা দেখে মনে হয় আসলে এটা দেখার কেউ নেই। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বা সরকারের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মাঝে মধ্যে রুটিন মাফিক তাদের অভিযান পরিচালনা করলেও কার্যত এতে তেমন কোন প্রভাব পড়ে না তাদের এই অবৈধ ব্যবসায়। তাই হেরোইন, কোকেন, মারিজুয়ানা, ব্রাউন সুগার সবকিছুরই যেন অবাধ বাণিজ্য সেন্টার হয়ে গেছে দেশটি। এছাড়া প্রায়ই দেখা যায় মুখোশধারী মাদক চক্রের অবাধ বিচরণ। অস্তিত্ব লড়াইয়ের লক্ষ্যে বা মাদকের রাজ্যে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় তারা প্রতিপক্ষ গ্রুপের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। খুন, লুটতরাজ তাদের নিত্যদিনের কাজের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেপরোয়া এই মাদক গোষ্ঠীর কাছে অন্যায়ই যেন এখন ন্যায়ে পরিণত হয়েছে।
মেক্সিকোতে বিভিন্ন মাদকগোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষের মূলে রয়েছে আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। তারা এই ব্যবসা চালিয়ে যেতে সরকারি বাহিনীর সঙ্গেও সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। বলা যেতে পারে তাদের টার্গেটে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীও রয়েছে। কেননা এই বাহিনীর হাতে তাদের অনেক সহযোগিকে হারাতে হয়েছে। এ কারণে প্রতিশোধের স্পৃহা তাদের ভয়ঙ্কর করে তোলে। সরকার অবশ্য এতে ভীত-সন্ত্রস্ত নয়। তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এই অসাধু চক্রকে সমূলে ধ্বংস করার জন্য। তাই মাঝে মধ্যে চালানো হয় সাঁড়াশি অভিযান। এতে দুই একদিন পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত থাকলেও আবার তা পূর্বের অবস্থায় ফিরে যায়। ভৌগোলিক কারণে অবশ্য মেক্সিকোকে এই মাদক ব্যবসার নিরাপদ রুট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এখানে রয়েছে অনেক অবৈধ অভিবাসীর বসবাস। অভিযোগ রয়েছে এদের একটা বিরাট অংশের মাধ্যমে মাদকের চালান চলে যায় পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন দেশে। ১৯৩৩ সাল থেকেই এটা হয়ে আসছে বলে জানা যায়। ’৬০-এর দশকের শেষের দিকে মেক্সিকোর মাদক ব্যবসায়ীরা পুরোদমে শুরু করে এই ব্যবসা। এরপর ’৮০-এর দশকের শুরুর দিকে এই স্থানটিতে চলে আসে কলম্বিয়া। কলম্বিয়ার পাবলো এসকোবার ছিল তখন কোকেন রপ্তানির প্রধান হোতা। এরাই সে সময় গোটা বিশ্বে নেটওয়ার্ক স্থাপনের মাধ্যমে চালায় এই ব্যবসা। আস্তে আস্তে তাদের এই ব্যবসা পরিণত হয় শক্তিশালী মাদক সাম্রাজ্যে। বিভিন্ন দেশের নামকরা অপরাধ চক্রের সঙ্গে তখন গড়ে ওঠে তাদের বন্ধুত্ব। এরপর ’৯০-এর দশকে কলম্বিয়ায় এ ব্যবসায় কিছুটা ভাটা পড়লে তখন আবারো চলে আসে মেক্সিকো। তবে এ সময় মেক্সিকো কলম্বিয়ার সঙ্গে যৌথ অংশিদারিত্বের মাধ্যমে এ ব্যবসায় এক নতুন মাত্রা যোগ করে। মেক্সিকোতে এ সময় হেরোইন এবং গাঁজার ব্যবসা বেশ রমরমাভাবে চলতে থাকে। এগুলো তখন পরিবহনের মাধ্যমে কলম্বিয়ায় পাঠানো হতো। মেক্সিকোর পরিবহন ব্যবসায়ীরা কলম্বিয়ার মাদক পাচারকারীদের সঙ্গে আঁতাতের মাধ্যমে এগুলো তখন পাচার করতো। কখনো এগুলো কলম্বিয়ার মাধ্যমে ভিন্ন দেশে পাঠানো হতো। এ কাজে মেক্সিকোর পরিবহন ব্যবসায়ীরা এক একটা কেকোনের চালান খালাস করে লাভ পেত শতকরা ৩৫ থেকে ৫০ ভাগ। বর্তমানে মেক্সিকোর সিনোলোয়া এবং গালফ কার্টেল এই দুটি চক্র কলম্বিয়াকে দূরে সরিয়ে কোকেন ব্যবসায় শক্ত অবস্থানে আছে। আর এখান থেকেই সারাবিশ্বে এখন কোকেন পাচার হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে মেথামফেটামাইন নামে এক ধরনের মাদকের প্রধান সরবরাহকারী বলা হয় মেক্সিকোকে। বলা হয়ে থাকে দেশটিতে অর্ধেক মাদক ব্যবসার লাভই আসে এখান থেকে। বিশ্বব্যাপী হেরোইন সরবরাহ করে দেশটি যতটা না নাম করেছে তারচেয়ে বেশি নাম করেছে এই মাদকদ্রব্যগুলো সরবরাহ করে। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের এক হিসেবে বলা হয়, শতকরা ৯০ ভাগ কোকেনই যুক্তরাষ্ট্রে আসে মেক্সিকো এবং কলম্বিয়া হয়ে।