পরমাণু বোমা বিস্ফোরণের হুমকি উত্তর কোরিয়ার
প্রকাশ : ২৭ জানুয়ারি ২০১৩, ২২:১৬
বছর কয়েক আগে পরমাণু কার্যক্রম পরীক্ষার পর উত্তর কোরিয়া পুনরায় বোমা ফাটালো। হুমকির বোমা। গত সপ্তাহে উত্তর কোরিয়া ঘোষণা দিয়েছে, কিছুদিনের মধ্যেই ফের পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটাবে তারা। একই সঙ্গে জানিয়েছে, তাদের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উনহা— ৩ শুধুই কৃত্রিম উপ-গ্রহ নয়, পরমাণু অস্ত্র বহনের জন্যও তৈরি করা হয়েছে।
স্বাভাবিকভাবে প্রতিবেশী দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র যথেষ্ট সতর্ক হয়ে উঠেছে উত্তর কোরিয়ার এ হুঙ্কারে। গত ডিসেম্বরে উত্তর কোরিয়া ক্ষেপণাস্ত্রের সফল উেক্ষপণ করে। বছর তিনেক আগে, ২০০৯ সালেও একবার ক্ষেপণাস্ত্রের সফল উেক্ষপণ করেছিল পিয়ংইয়ং। দেশের ক্ষমতায় তখন ছিলেন বর্তমান শাসক কিম জং-উন-এর পিতা কিম উল-জং। আমেরিকাসহ পশ্চিমা দুনিয়া সেই ধাক্কা সামলানোর সুযোগ পায়নি। এক মাসের মধ্যেই পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল তারা। বুঝিয়ে দিয়েছিল, মার্কিন হুমকিকে ‘থোড়াই কেয়ার’ করে ‘ক্ষুদ্র’ উত্তর কোরিয়া। অতীত ‘ঐতিহ্য’ বজায় রেখে কি আবার খুব তাড়াতাড়ি পরীক্ষামূলকভাবে পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটাতে চলেছে পিয়ংইয়ং? উত্তর কোরিয়া এখন সেই ঘোষণাই দিয়েছে।
এদিকে পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্য যে প্রশান্ত মহাসাগরের অপর পারে থাকা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র— তা বলতেও বাকি রাখেনি উত্তর কোরিয়া। এরপর অপেক্ষা ছিল জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকের। গত মঙ্গলবার এ বৈঠকে স্পষ্টতই গত ডিসেম্বর মাসে উত্তর কোরিয়ার দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উেক্ষপণ পরীক্ষার নিন্দা করা হয়। এছাড়া প্রস্তাবে উত্তর কোরিয়া নতুন করে পরমাণু অস্ত্রের পরীক্ষা চালালে জাতিসংঘ যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ারও হুমকি দিয়েছে।
উত্তর কোরিয়ার ওপর জাতিসংঘের নতুন অবরোধকে স্বাগত জানিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। একইসঙ্গে দেশটি পরমাণু কর্মসূচী বাতিলের দাবি অগ্রাহ্য করায় উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে। অপরদিকে উত্তর কোরিয়ার ওপর আরোপিত জাতিসংঘ নিষেধাজ্ঞার আওতা বাড়ানো হয়েছে। নতুন করে দেশটির মহাকাশ সংস্থা, একটি ব্যাংক, চারটি ট্রেডিং কোম্পানি ও চার ব্যক্তিকে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে। এদের সম্পদ জব্দ ও ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
তবে পুরুষানুক্রমিক মানসিকতার বদল ঘটাননি উত্তর কোরিয়ার সামরিক শাসক কিম জং উন। ১৯৫০ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার দেশ ও পরিবারের সম্পর্ক তেতো হতে শুরু করে। আজও ভালো হয়নি সেই সম্পর্ক। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরো খারাপই হয়েছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকের পর আরো স্পষ্টভাবে বোঝা গেল উত্তর কোরিয়ার মনোভাব। রাজধানী পিয়ংইয়ং-এ জাতীয় প্রতিরক্ষা কমিশনের বৈঠকে কমিশনের প্রধান তথা দেশের শাসক সাফ জানিয়ে দিলেন, ডিসেম্বরের উেক্ষপণ ‘শান্তিপূর্ণ’ উদ্দেশ্যে ছিল ঠিকই; কিন্তু উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র উেক্ষপণের একটা সামরিক লক্ষ্যও আছে— মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। এই ঘোষণার পরই দেশের শাসক জানিয়ে দেন খুব শিগগিরই তারা ফের পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটাবেন।
এর আগে ২০০৬ এবং ২০০৯ সালেও পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল উত্তর কোরিয়া। দেশের একেবারে উত্তরে নিয়ংবিয়ং পরমাণু স্থাপনার ভূ-গর্ভস্থ কেন্দ্রে দুইটি বিস্ফোরণ ঘুম ছুটিয়ে দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দুনিয়ার। জার্মান পরমাণু বিশেষজ্ঞ সিগফ্রিড হেকার জানিয়েছেন, অন্তত ছয় থেকে আটটি পরমাণু বোমা তৈরি করার মতো প্লুটোনিয়াম রয়েছে উত্তর কোরিয়ার সঞ্চয়ে। ২০০৬ ও ২০০৮ সালে তারা প্লুটোনিয়াম বিস্ফোরণই ঘটিয়েছিল। জার্মান পরমাণু বিশেষজ্ঞর হিসেবে ২০০৬ সালের বোমাটি ১ কিলোটন ও ২০০৯ সালের বোমাটি দুই কিলোটনের কাছাকাছি শক্তিসম্পন্ন। গত দুইবারই উত্তর কোরিয়ার ওপর জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা জারি হওয়ার পরেই পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল তারা। এবারও ক্ষেপণাস্ত্র উেক্ষপণের পর তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞার কোপ পড়বে কিনা তা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছিল। তখন অবশ্য অন্য রূপ দেখিয়েছিলেন শাসক কিম জং-উন। কৃষি ও অর্থনীতিকে মজবুত করার কথা ঘোষণা করে বিশ্বকে চমকে দিয়েছিলেন উত্তর কোরিয়ার এই জঙ্গি শাসক। তবে একই সঙ্গে মার্কিন নজরদারি ড্রোন লক্ষ্য করেছিল, দেশের উত্তরের পুরনো পরমাণু বিস্ফোরণ কেন্দ্রে যাওয়ার রাস্তাঘাট সংস্কারের কাজ শুরু করে দিয়েছে উত্তর কোরিয়ার সেনাবাহিনী। তখন থেকেই প্রমাদ গুনতে শুরু করেছিল পশ্চিমা দুনিয়া। বেশ বোঝা গিয়েছিল, ফের অস্বস্তিকর কিছু একটা ঘটানোর চেষ্টা করছে পিয়ংইয়াং; কিন্তু একেবারে সরাসরি এমন ধ্বংসের বার্তা দেবেন ৩০ বছরের কিম— তা ভাবেননি কেউই। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের নিষেধাজ্ঞার উত্তরে উত্তর কোরিয়ার এমন বিস্ফোরক মন্তব্যের জবাবে অবশ্য যথেষ্ট সংযম দেখিয়েছে ওয়াশিংটন। পাল্টা কোনো মন্তব্যই করেনি বারাক ওবামার সরকার। উত্তর কোরিয়ায় মার্কিন দূত গ্লিন ডেভিসও সংযত থাকার আর্জি জানিয়েছেন। উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে আলোচনা কোন পথে এগোতে পারে তা ঠিক করতে গেলে প্রয়োজনে চীন ও জাপানের সঙ্গে আলোচনা করতেও রাজি আমেরিকা।
পরমাণু হাতিয়ারের হুমকি অবশ্য এই প্রথম নয়। গত অক্টোবর মাসেই উত্তর কোরিয়ার জাতীয় প্রতিরক্ষা কমিশনের এক কর্তা জানিয়েছিলেন, মার্কিন ভূখণ্ডে আঘাত করার মতো হাতিয়ার তাদের রয়েছে।
এমন ঘোষণার কয়েক মাস আগেই গত বছর এপ্রিলে দেশে এক সামরিক প্যারেডে কিম জং-উনের সেনাদের দেখা গেছে বিশেষ এক ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ে প্যারেড করতে। বিশেষজ্ঞমহলের ধারণা, ওই ক্ষেপণাস্ত্র ভিন মহাদেশে পাড়ি জমানোর উপযুক্ত। অন্তত ১০ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়ার ক্ষমতা রাখে ওই ‘ইন্টার কন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইল’। এখানেই চিন্তা আমেরিকার। এছাড়াও এতদিনে উত্তর কোরিয়া যথেষ্ট পরিমাণ ইউরোনিয়ামও জমিয়ে ফেলেছে বলে তথ্য আছে।
তিন পুরুষ ধরে উত্তর কোরিয়ার শাসকরা সমানে বজায় রেখেছেন তাদের মার্কিন বিরোধিতা। বিভিন্ন সময়ে মার্কিন সরকার ও রাষ্ট্রপুঞ্জের নিষেধাজ্ঞা ছাড়া আর তেমন কোনো বড়সড় বিপর্যয়ের মোকাবিলা করতে হয় না উত্তর কোরিয়াকে। কয়েক মাস আগেই হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও ক্ষেপণাস্ত্র উেক্ষপণ করায় প্রায় আড়াই লাখ টন খাদ্য সাহায্য থেকে বঞ্চিত হয়েছে উত্তর কোরিয়া। অর্থনীতি ভেঙে পড়ার মুখে, তবু বিকার নেই শাসক কিম জং-উনের।
সম্প্রতি এক মার্কিন গোয়েন্দা উপ-গ্রহের তোলা ছবিতে দেখা গেছে, দেশের উত্তর-পূর্বের পার্বত্য এলাকার দিকে যাওয়ার পুরনো রাস্তার মেরামতি চলছে। পথ থেকে সরানো হচ্ছে বরফ ও জঞ্জাল। এর আগে এই হামগিওং পার্বত্য এলাকাতেই পরীক্ষামূলক ভাবে পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল উত্তর কোরিয়া। এমনিতেই দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা চলছে, তাই নতুন করে হারানোর মতো কিছুই নেই। দুঃসাহসী কিম তাই শান্তি ভিক্ষা করতে চান না। আসলে তিনি বিশ্বাস করেন, ‘বন্দুকের নলের শেষ প্রান্তেই থাকে শান্তি।’