বাংলাদেশের কৃষি
কৃষক ও খাদ্য
পরিস্থিতি
প্রকাশ : ২৮ জানুয়ারি ২০১৩, ২০:৫৭
বেলাল বেলাল, হেলাল উঠেছে দেখো পশ্চিম আসমানে
লুকাইয়া আছে লজ্জায় কোন মরুর গোরস্থানে?
হের ঈদগাহে যাইতেছে কৃষক, যেন প্রেত-কঙ্কাল
কসাইখানায় যাইতে দেখেছো কী জীর্ণ গরুর পাল?
প্রায় শতবর্ষ আগের দুর্দশাগ্রস্ত কৃষকদের নিয়ে লেখা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের উপরোক্ত পঙক্তিগুলোর সাথে বর্তমান সময়ের বাংলাদেশের কৃষকদের তুলনা অপ্রাসঙ্গিক হবে না। তখনকার কৃষকদের মত স্বাধীন বাংলাদেশের কৃষকরাও আজ দুর্দশার শিকার। যদিও মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশের কৃষকদের মুক্তির জন্য রয়েছে সাংবিধানিক বাধ্য-বাধকতা। কৃষক ও শ্রমিকের মুক্তি শিরোনামে সংবিধানের একটি অনুচ্ছেদে তাদের উন্নয়নের জন্য বিশেষ বিধানের ব্যবস্থা করতে রাষ্ট্র উদ্যোগ নেবে। কাগজে-কলমে, বক্তৃতার মঞ্চে, রাজনীতির মাঠে বহু আশার বাণী বর্ষিত হলেও তাতে কৃষকের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি এতটুকু।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে যখন জনগণের (বিশেষত মধ্যবিত্ত ও কৃষকসমাজ) নাভিশ্বাস তখন কৃষক তার উত্পাদিত সবধরনের পণ্য বিক্রি করছে পানির দামে। কৃষকের দুর্দশার এ এক করুণ চিত্র। মফস্বলের একটি বাজারে কৃষক বেগুন বিক্রি করছে ১৫-২০ টাকা কেজি। ঢাকার মানুষ সে বেগুন কিনছে ৬০-৭০ টাকা কেজি। সরকারি হিসেবে সেল খোন্দে প্রতিমণ ধান উত্পাদনে খরচ হয়েছে ৬৭৩ টাকা। কৃষক বািক্র করেছে ৪৫০-৫০০ টাকায়। উত্পাদন খরচ উঠা তো দূরের কথা, গরু-বাছুর বিক্রি এমনকি জমি বন্ধক রেখেও কৃষক সামাল দিতে পারে না তার দুরবস্থা। সবাই জানে, বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক। তারা হয় বিভিন্ন দোকান থেকে সার তেল-বীজ বাকিতে নিয়ে জমি চাষ করে। অথবা দাদন নিয়ে আবাদ করে তাদের জমি। ফলে প্রচলিত বাজার দামের চেয়ে বেশি দামে এ সব কৃষি উপকরণ কিনতে বাধ্য হয় আমাদের কৃষক। ধান কাটা সারা তো বেচাও শেষ। তবে ঋণের বোঝা হয় না হালকা। কৃষকের মাথার ঘাম ঝরিয়ে, রক্ত পানি করে উত্পাদিত ফসল পানির দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয় সে। আবার কয়েকদিন পর সেই ধানেরই চাল তাকে কিনতে হয় সোনার দামে।
এক সময় এদেশে পাটের সুদিন ছিল। অসংখ্য পাটকলে কর্মসংস্থান হয়েছিল লক্ষাধিক। বিশ্বের সর্ব বৃহত্ পাটকল আজ বন্ধ। বাংলাদেশের এক সময়ের প্রধান রপ্তানিপণ্য ও বৈদেশিক মুদ্রার্জনকারী এ খাতটি চরম অবহেলার শিকার হতে হতে আজ স্থান নিয়েছে যাদুঘর আর ইতিহাসের পাতায়। কৃষক পাটচাষ করে ক্রমাগত ক্ষতির সম্মুখীন হতে হতে বেছে নিয়েছে বিকল্প পথ। পাট থেকে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার্জনের পথ বন্ধ হলেও গার্মেন্টস ও প্রবাসী শ্রমিক এ অভাব পূরণ করেছে। কিন্তু কৃষক যদি ক্রমাগতভাবে লোকশান গুণতে গুণতে ধানচাষ কমিয়ে দেয় তাহলে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খাদ্য ঘাটতি মোকাবেলা করবে কে? কীভাবে খাদ্য সমস্যার সমাধান হবে? বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম ধান উত্পাদনকারী দেশের খাদ্য পরিস্থিতি ও যুগপত্ভাবে কৃষকের অবস্থা কী তাহলে আরও শোচনীয় হবে?
চলতি বছরের মধ্যেই দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। ২০০০-১১ অর্থ বছরে খাদ্য আমদানি করতে হয়েছে ৬১.৫ লাখ মে. টন। একই বছর খাদ্য উত্পাদন হয়েছে ৩৬০ লাখ মেট্রিক টন। লক্ষণীয়, পরের বছরই তা (২০১১-১২ অর্থবছরে) কমে হয়েছে ৩৫০ লাখ মেট্রিকটন। যদিও এ সময়ের মধ্যে বড় ধরনের কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ফসলহানির ঘটনা ঘটেনি। তাহলে উত্পাদন কমে যাওয়ার কারণ কী। আসলে কৃষকরা পাটচাষ করে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যেমন বিকল্প পথ বেছে নিয়েছে তেমনি ধান চাষ করে সর্বস্বান্ত হওয়া থেকে বাঁচতে বেছে নিয়েছে বিকল্প। পত্রিকাগুলোর রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে উত্তরাঞ্চলের কৃষকরা লাভবান (মূলত টিকে থাকার জন্য) হওয়ার জন্য ধান-পাট, আলুর বদলে ব্যাপকভাবে তামাক চাষ করছে। এভাবে চলতে থাকলে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন কী আদৌ সম্ভব?
কৃষকের অসংখ্য সমস্যা থাকা সত্ত্বেও তারা পরম মমতায় আগলে রেখেছে এ খাতটি। সময়মত ভাল বীজ না পাওয়া, চড়ামূল্যে সার-তেল-বীজ ক্রয় সত্ত্বেও এখনো তারা বেঁচে থাকার সংগ্রামে টিকে আছে। কিন্তু ক্রমাগতভাবে, বিভিন্ন উপায়ে কৃষকের বুকে ছুরি চালালে তা যে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তাকে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করবে। জাতীয় অর্থনীতিতে এখনো ৩য় বৃহত্তম এ খাতটির জিডিপিতে গত অর্থ বছরে সরাসরি অবদান ছিল ১৯.২৯%। যেখানে দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। সরকার কৃষকের উন্নয়নের নানাবিধ পদক্ষেপ নিলেও তাতে কৃষক লাভবান হয়নি। কেন কৃষক পর্যন্ত সরকারি সহায়তা পৌঁছানো যাচ্ছে না তা এখন ওপেন সিক্রেট। পৃথিবীর প্রত্যেক দেশই তার জাতীয় নীতির সর্বোচ্চ স্তরে রাখে কৃষিকে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের কৃষির স্বার্থে ডব্লিইটি ও’র সাথে বিরোধে জড়িয়েছে অনেকবার।
সুতরাং বাংলাদেশকে সমৃদ্ধির শিখরে নিতে হলে অবশ্যই অন্যান্য বিকাশমান খাতের মত কৃষিকেও দিতে হবে সর্বোচ্চ গুরুত্ব। একইসাথে সরকারি নীতিমালা ফাইলবন্দি না রেখে তার সুফল পৌঁছে দিতে হবে সরাসরি কৃষকের হাতে। মনে রাখতে হবে, কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। কৃষি ও কৃষককে অবহেলা করে দেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে না। সবার উপরে দেশ, সবার আগে কৃষক। এই মূলমন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে কৃষকের উন্নয়নের কাজ শুরু ত্বরিত শুরু করা সময়ের দাবি।
লেখক : এমএসএস (রাষ্ট্রবিজ্ঞান), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
rakibulislambd 11@gmail.com