রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণেই বাড়ছে নারী নির্যাতন
প্রকাশ : ২৯ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:১৪
বর্তমানে নারীদের জন্যে এক মহাবিপদাপন্ন সময় অতিবাহিত হচ্ছে বললে ভুল হবে না। প্রতিদিনই নারীর ওপর যে সহিংস ঘটনা ঘটছে তা সর্বকালের রেকর্ড ভঙ্গ করছে বলে প্রতীয়মান। বিশেষ করে গত কয়েকমাসে নারীর ওপর বহুমাত্রিক অসংখ্য নৃশংস নির্যাতন প্রমাণ করছে সরকার, প্রশাসন নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একেবারেই ব্যর্থ হচ্ছে। ঘরে বাইরে যেনো কোথাও নারীর নিরাপত্তা নেই। একের পর এক খুন, অপহরণ, ধর্ষণ, গণধর্ষণসহ বিবিধভাবে অবিচারের শিকার হচ্ছে নারী। সরকারের পক্ষ থেকে যখন মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে কেবলই উন্নয়নের ফিরিস্তি আর শত সাফল্যের কথা তুলে ধরা হচ্ছে তখন নারীর ওপর বিবিধ নিপীড়ন আমাদের মাথা নত না করে পারে না। নির্যাতন যেনো সমমাত্রায় চলছে সর্বত্র। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত কোনো ঘরের মেয়েরাই রেহায় পাচ্ছে না। গ্রামের সাধারণ পরিবারের মেয়ে থেকে শুরু করে রাজধানীর সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠের মেয়ে কেউই এখন আর নিরাপদ নন। বর্তমানে নারীর ওপর যে ধারাবাহিক করুণ নৃশংস নিপীড়নের চিত্র দেখা যাচ্ছে তা খুবই উদ্বেগ ও উত্কণ্ঠার বিষয়। একের পর এক ঘটনাগুলো ঘটেই চলছে। এসব ঘটনার কোনো কোনোটা এতোটাই নিষ্ঠুর নির্মম যে যা বর্ণনারও অযোগ্য। আমরা দেখছি নারীর ওপর নতুন নতুন নিপীড়নের চিত্র। এই চিত্রগুলো আমাদের ভবিষ্যতের জন্যে এক ভয়াবহ অশনি সংকেত। রাজধানীর খোদ রাস্তার ওপর কোনো মেয়েকে অ্যাসিড নিক্ষেপের ঘটনা এর আগে নগরবাসী শুনেছে কিনা জানা নেই। কিন্তু কদিন আগে ইডেন কলেজের ছাত্রী আঁখিকে এমনই এক নির্মমতার শিকার হয়ে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়তে হচ্ছে। অ্যাসিড দগ্ধ করে তাকে রাস্তায় ফেলে রেখে গিয়েছিল কতিপয় যুবক। পত্রিকায় দেখেছি মিরপুরের গৃহবধূ ইশরাতকে তার স্বামী কেটে কয়েক টুকরো করেছে। তোপখানাতে ভাত বিক্রেতা শ্রমজীবী শিশু রিতুকে নৃশংসভাবে হত্যা করে ফেলে রাখা হয় বাথরুমে। গ্রামাঞ্চলে চলছে আরো নারকীয় সব কান্ড। একের পর এক খুন, ধর্ষণের শিকার হচ্ছে মেয়েরা। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে দু বোনের ওপর গণধর্ষণের ঘটনাও ঘটছে সম্প্রতি। ছোটভাইকে গাছের সাথে বেঁধে দুবোনকে ধর্ষণ করে ধর্ষকরা। টাঙ্গাইলে গণধর্ষণের শিকার হওয়া মেয়েটি এখনও মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। আর সবশেষে ২৪ ডিসেম্বর মানিকগঞ্জে যে ঘটনা ঘটল সেটা ছিল ভারতের সেই আলোচিত ধর্ষণ ঘটনার মতোই একটি ঘটনা। ঐদিন চলন্ত বাসে একটি মেয়েকে ধর্ষণ করে রাস্তার পাশে ফেলে রাখে।
গত কয়েকমাস ধরেই আমরা খেয়াল করছি নারীর ওপর সহিংস ঘটনা ঘটেই চলেছে। কিন্তু কোনো প্রতিকারের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। কয়েকমাস আগে নগরীর আমতলার ব্র্যাক ক্লিনিকের তরুণ ডাক্তার সাজিয়া আফরিন ইভাকে হত্যা করে ক্লিনিকের নিরাপত্তা কর্মচারী ফয়সাল। সিলেট মেডিক্যাল কলেজ থেকে পাস করে আসা শত সম্ভাবনাময় এই মেয়েটি চাকরির পাশাপাশি উচ্চতর শিক্ষা নিচ্ছিলেন। কিন্তু নরপিশাচ ফয়সাল তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে ইভার পুরো পরিবারটিকে চিরজীবনের জন্যে এক গভীর বেদনার সাগরে ঠেলে দেয়। এই পরিবারটি সারাজীবনই এক গভীর কষ্ট বয়ে বেড়াবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। ইভার পর মেডিক্যাল ছাত্রী জেরিনের করুণ মৃত্যুও সবাইকে শঙ্কিত না করে পারেনি। শুধু ডাক্তার হওয়ার বাসনায় কানাডা থেকে বাবা মাকে ছেড়ে এ দেশে এসেছিলেন মুঞ্জেরিনা আরাবিন জেরিন। রাজধানীর উত্তরা মেডিক্যাল কলেজে লেখাপড়া করতেন। কিন্তু সামান্য ঘটনায় কথিত বয়ফ্রেন্ড মহিউদ্দিন স্মরণ তাকে ট্রেনের নিচে ফেলে নির্মমভাবে হত্যা করে। এই নির্মম হত্যার খবর পেয়ে কানাডা থেকে ফিরে আসে জেরিনের মা-বাবা।
এদিকে রাজবাড়ি জেলার মূলঘর ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামের ব্র্যাক স্কুলের ছাত্রী মৌসুমীকে যেভাবে হত্যা করা হয় সেই খবর পড়ে নিরবেই কেঁদেছি। আসলেই মানুষ কতোটা নিষ্ঠুর হলে এমন করতে পারে ভেবে পাই না। কদিন পরে খোদ রাজধানীতে এই একই ঘটনা ঘটেছে। মাত্র দশ বছর বয়সী শ্রমজীবী কন্যা শিশু রিতুকে কতিপয় যুবকের লালসার শিকারে নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করতে হয়। রাজধানীর তোপখানার একটি এয়ারলাইন্সের অফিসে এ ঘটনাটি ঘটে। রিতু বিধবা মায়ের সাথে বিভিন্ন অফিসে ভাত সরবরাহের কাজ করতো। ভাতের বাটি আনতে গিয়ে ট্র্যাভেল এজেন্সীর তিন যুবকের নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় এই ছোট মেয়েটি। তাকে হত্যা করে বাথরুমে ফেলে রাখে অভিযুক্ত যুবকরা। সাম্প্রতিক সময়ে নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়ার কারণ অনেকেই অনেকভাবে ব্যাখ্যা করবেন। ক্ষমতাশীনরা বলবেন এটি একেবারেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা-এর সাথে রাজনীতির কোনো যোগসূত্র নেই। তবে যা ঘটছে এসব মোটেও রাজনৈতিক বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এর আগেও আমরা দেখেছি রাজধানীর সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ভিকারুন নূন নেসা স্কুলের এক নিরীহ ছাত্রীকে শিক্ষক পরিমল কর্তৃক নিগৃহীত হওয়ার ঘটনা-যা সবাইকে বিস্মিত করেছিল। সমাজে নারীর ওপর এখন যে বীভত্সতা নেমে এসেছে তা আমাদের নষ্টভ্রষ্ট, দলীয়করণ এবং পচে যাওয়া রাজনীতির কুফল। বর্তমান ধারার রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা সমাজকে মোটেও আলোকিত করছে না বরং সমাজকে কলুষিত করছে। আমরা দেখছি একের পর এক নৈরাজ্যকর ঘটনা ঘটলেও তা বিচার হচ্ছে না। যেনো বিচারহীনতার এক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। নানা ছলে বলে কৌশলে অপরাধীরা আড়ালে চলে যাচ্ছেন, নয়তো পার পেয়ে যাচ্ছেন। দলীয় ছদ্মাবরণে রাষ্ট্রের ক্ষমাও পাচ্ছেন। একথাতো একেবারেই সত্য যারা দেশ চালাচ্ছেন তারা মুখে সুশাসনের কথা বললেও সর্বত্র চলছে চরম দুর্বৃত্তায়ন। আইনের শাসন মুখ থুবড়ে পড়ছে বললে মোটেও ভুল হবে না। সবমিলিয়ে চরম এক দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতির নির্মম খেসারত দিতে হচ্ছে আমাদের নারীদের।
বর্তমান সময়ে নারীর ওপর যে নিপীড়নের ঘটনা ঘটছে তার দায় পুরোটাই শাসক শ্রেণীকে নিতে হবে। শাসক শ্রেণীকেই এ সবের জবাবদিহিতা করতে হবে। কদিন আগে আমরা ভারতে দেখলাম চলন্ত বাসে একজন মেডিক্যাল ছাত্রীর ধর্ষণের ঘটনা এবং পরবর্তীতে ধর্ষিতার মৃত্যু গোটা ভারতকে নাড়িয়ে দেয়। সাধারণ জনগণ ফুঁসে উঠে চারদিক থেকে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে কংগ্রেস নেত্রী জনগণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। কিন্তু আমাদের এখানে যা হচ্ছে সেখানে একেবারেই একটি ক্ষুদ্র অংশ ছাড়া কোনো নেতা বা নেত্রীকে দেখছি না টু শব্দ করতে। এর কারণ একটাই যারা সহিংস ঘটনার শিকার হচ্ছেন তারা কেউই রাজনীতি করেন না। সাধারণ পরিবারের মানুষ। রাজনীতির গন্ধ নেই বলে এদের পাশে কোনো রাজনীতিক নেই। কেউ তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন না। সহানুভূতি পাচ্ছেন না। কিন্তু সরাসরি রাজনৈতিক পরিবারের কেউ হলে আমরা দেখতাম নেতা নেত্রীরা সহানুভূতি জানাতে দল বেঁধে ছুটেছেন। জড়িয়ে ধরে চোখের পানি ফেলছেন। আরো কত কী। কিন্তু ঘটনার শিকার নারীরা রাজনৈতিক দলের কেউ নয় বলে তাদের পাশে কেউ নেই। সুশীল সমাজও কেন জানি এর বিরুদ্ধে জোরালো ভূমিকা পালন করতে পারছে না। দাতা নির্ভর এনজিও এবং নারী সংগঠনগুলোও ততটা তত্পর নয়। কোথাও প্রতিবাদের কোনো আগুন জ্বলছে না। এটা সত্য শুধু রাজধানী বা শহরে এনজিও স্টাইলে কথিত শোভাযাত্রা, মিছিল মিটিং করে, মঙ্গল প্রদীপ জ্বেলে নারীর ওপর সহিংসতা কমানো সম্ভব নয়। নারী নির্যাতন বন্ধ বা কমানোর কথা বলে দেশের বহু এনজিও বিদেশিদের কাছ থেকে কাড়ি কাড়ি টাকা নিয়ে এসেছে কিন্তু নারী নির্যাতন সেই অর্থে কমেনি বরং নানামাত্রায় তার ব্যাপকতা বেড়েছে। একশ্রেণীর এনজিও নারী নির্যাতনের বিষয়গুলোকে পুঁজি করে নিজেদের অর্থবিত্ত, জৌলুস বাড়িয়েছে-কিন্তু সমাজের চরিত্র বদলাতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। আর সেটা হয়নি বলেই নারীর ওপর নিপীড়নের বহুমাত্রিকতা বেড়েছে। নারী নির্যাতন বন্ধে সবার আগে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সততা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। প্রতিহিংসার রাজনীতি থেকে সরে আসা। কিন্তু সেই সদিচ্ছা, কোথাও লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। ন্যায়বিচার আজ ভূলুণ্ঠিত। জোট সরকারের নেতৃবৃন্দ বার বার কারণে অকারণে শুধু চারদলীয় জোট সরকারের আমলের উদাহরণ দিচ্ছে। অথচ নিজ আমলের ঘটনা তারা খেয়াল করলে ভালো হতো। শুধু জোট আমলে সেই নির্বাচনোত্তর পূর্ণিমা ধর্ষণের ঘটনা বলে সব দায়-দায়িত্ব এড়ানো যায় না। এই আমলেওতো অসংখ্য পূর্ণিমা ধর্ষিতা হলো- এর দায় জোট সরকার কীভাবে এড়াবে? জোট সরকারের আমলে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন বেড়েছে বলেই নারীর ওপর নানা নিপীড়নমূলক ঘটনাও বেড়েছে। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের কুফল কতোটা তীব্র তা এখন ভালোই বুঝতে পারছে দেশবাসী। সবশেষে বলবো দুর্বৃত্তায়নকে প্রশ্রয় দিয়ে রাষ্ট্র মাথা নত করলে সামাজিক অপশক্তিগুলো এভাবেই উন্মত্ত হয়ে উঠে চারিদিকে। আসুন, সবাই মিলে এসবের বিরুদ্ধে আরো সোচ্চার হই।
++লেখক :চেয়ারম্যান, ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি
kirondibate@gmail.com