জলবায়ু বিজ্ঞান বনাম
তথ্য বিভ্রাট
প্রকাশ : ৩০ জানুয়ারি ২০১৩, ২১:৩০
বিগত ১৫ বছর প্রায় অদৃশ্যভাবে এক বৃহত্ লড়াই চলছে যা এই গ্রহের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণে জরুরি। এর এক পক্ষে লড়াই করছেন জলবায়ু বিজ্ঞানীরা আর অন্যদিকে আছেন জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানির অর্থায়নে লালিত বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদ গোষ্ঠী।
এই ১৫ বছরে জলবায়ু বিজ্ঞানীরা এক অভূতপূর্ব বৈজ্ঞানিক ঐক্যমতে এসেছেন যে, আমাদের তেল, গ্যাস ও কয়লা ব্যবহারে যে কার্বন ডাই অক্সাইড নির্গমন হচ্ছে তা বৈশ্বিক উষ্ণতাকে বৃদ্ধি করছে এবং এক সময় গ্রহকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিবে, যদি আমরা সমস্ত জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার দ্রুত না কমাই। একই সাথে তেল, গ্যাস কয়লা কোম্পানিগুলো বিরাট মাপের তথ্য বিভ্রমের প্রচারণা চালাচ্ছে যাতে জনগণ এই বিষয়ে অজ্ঞ থাকে।
প্রখ্যাত উদ্ভাবনশীল বিজ্ঞানী মাইকেল মান এই যুদ্ধের বিষয়ে তার নতুন বই ‘The Hockey stick and the climate wars; dispatches from the front lines’ (Columbia University Press, 2012) এ বিস্তারিত লিখেছেন।
বৈশ্বিক উষ্ণতার গুরুত্ব বৈজ্ঞানিক মহলে গ্রহণযোগ্যতা পায় ১৯৯৮ সালে মাইকেল মান আবিষকৃত ‘হকিস্টিক গ্রাফ’-এর মধ্য দিয়ে যা আল গোরের প্রামাণ্য চিত্র ‘An inconvenient Truth’-এ দেখানো হয়েছে। মানের গ্রাফে দেখা যায় পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা গত এক হাজার বছরে ধীরে-ধীরে কমতে কমতে এক নতুন বরফ যুগে প্রবেশ করেছিল, কিন্তু সামপ্রতিককালে এই তাপমাত্রা কেবলই ঊর্ধ্বমুখি, যার ফলে গ্রাফটিকে দেখায় একটি হকিস্টিকের মাথার মত। এই গ্রাফ প্রমাণ করে যে, বৈশ্বিক উষ্ণতা মনুষ্য সৃষ্ট এবং ঘটমান। পরবর্তী অনেক গবেষণাই মানের এই পর্যবেক্ষণকে সমর্থন করে। যেগুলোতে ভিন্ন ফল আসে, দেখা যায় সেগুলো ভুলে ভরা। তাই জলবায়ু বিজ্ঞানীদের মধ্যে বৈশ্বিক উষ্ণতার বাস্তবিকতা ও গুরুত্ব নিয়ে কোনই সন্দেহ নেই।
কিন্তু জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলো, যাদের বহুজাতিক তেল ও কয়লার ব্যবসা আছে, তারা তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষার জন্য জনগণের মাঝে বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ে সন্দেহের বীজ বুননে সচেষ্ট। তাদের অর্থায়নে চালিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও ওয়েব-সাইট তাদের নিজস্ব বিশেষজ্ঞদের দ্বারা হকিস্টিক গ্রাফের উপর সন্দেহ প্রকাশ করে। এদের বিশেষজ্ঞরা বেশির ভাগই অর্থনীতিবিদ কিংবা আবহাওয়াবিদ কিংবা টেলিভিশনের আবহাওয়া-বার্তা পাঠক, যাদের জলবায়ু বিজ্ঞান সম্বন্ধে কোন ধারণাই নেই। এদের সঙ্গে থাকা হাতে গোনা কিছু জলবায়ু বিজ্ঞানীদের সংখ্যা ক্রমশ ক্ষীয়মান।
তথ্য বিভ্রমের এই প্রচারণা জনগণ ও প্রচার মাধ্যমের বিজ্ঞান সম্বন্ধে অজ্ঞতাকে কাজে লাগায়, যাদের কোন ধারণাই ছিল না যে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে প্রকৃত বৈজ্ঞানিক বিতর্কের অনেক আগেই অবসান হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের তেল ও কয়লা কোম্পানিগুলোর দালালদের হাতে বাধা কিছু কংগ্রেসম্যান ২০০৫ সালে জলবায়ু বিজ্ঞানীদের বিরুদ্ধে এক তদন্ত শুরু করে। শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস তাদের গবেষণায় কোন ভুলত্রুটি খুঁজে না পেলেও ততদিনে ক্ষতি যা হবার তা হয়ে গেছে। ‘জলবায়ু পরিবর্তন আমেরিকার ইতিহাসে একক বৃহত্তম তথ্য বিভ্রম’-সিনেটর জেমস্ ইনহফের এই মন্তব্য এবং আরো অন্য রাজনীতিবিদদের ভাষ্য মিডিয়াতে ফলাও করে প্রচার হয় যার ফলে জনমনে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব গেড়ে বসে।
শেষ পর্যন্ত মান এবং তার সহযোগী বিজ্ঞানীরা এই প্রপাগান্ডার শিকার হন। তাদের ই-মেইল হ্যাক করা হয় এবং তাদের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ আনা হয়। ‘ক্লাইমেট গেট’ নামে পরিচিত ২০০৯ সালের এক ঘটনায় অজ্ঞাতনামা হ্যাকাররা যুক্তরাজ্যের ইষ্ট অ্যাঙ্গলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু গবেষণা ইউনিট থেকে হাজার হাজার ই-মেইল চুরি করে। এদের মধ্যে মানের একটি ই-মেইল বহুবার বহু জায়গায় ব্যবহূত হয় এটা প্রমাণ করতে যে তিনি একটি ট্রিক বা ছলচাতুরি ব্যবহার করে হকিস্টিক গ্রাফের উপাত্ত পরিবর্তন করেছেন এবং তাপমাত্রা আসলে না বেড়ে নেমে গিয়েছে এরকম একটি বিষয়কে ধামাচাপা দিয়েছেন। অথচ বিজ্ঞান বা বিশেষত গণিতে ট্রিক কথাটি ব্যবহার হয় কৌশল বুঝাতে, অর্থাত্ এমন কিছু একটা যা জটিল সমস্যার সমাধান এনে দেয়। একই ভাবে তাপমাত্রা নেমে যাওয়ার বিষয়টি আসলে একটি পরিমাপের ভুল বলে প্রতীয়মান হয়।
পরবর্তীতে যে কয়টি তদন্ত হয় তার কোনটিতেই জলবায়ু বিজ্ঞানীদের দ্বারা কোন ছল-চাতুরির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিন্তু যা ক্ষতি হবার তা হয়ে যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে মানুষের আস্থা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব সৃষ্টি হয়।
বিশ্ব উষ্ণায়ন নিয়ে জনগণের মনে যে সন্দেহের কালো মেঘ জন্ম নিয়েছে তার দীর্ঘ মেয়াদী প্রভাব পড়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। বারাক ওবামার প্রস্তাবিত কার্বন নির্গমন হ্রাস পরিকল্পনা কংগ্রেস নাকচ করে দেয়। ২০০৯-এর কোপেনহেগেন শীর্ষ সম্মেলনের আগে আগে ‘ক্লাইমেট গেট’ এর ঘটনার ফলে, সম্মেলনটি থেকে কোন অর্থবহ সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ আসার সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়।
এই ব্যর্থতা বিশ্বকে উষ্ণায়ন, সমুদ্র সীমার উত্থান, সাইক্লোন এবং খরার মত প্রলয়ের মুখোমুখি করে দিয়েছে। জনগণ এবং রাজনীতিবিদরা যদি জীবাশ্ম জ্বালানির স্থলে পারমাণবিক, সৌর ও বায়ু শক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ না নেয় তবে হ্যারিকেন স্যান্ডি, যুক্তরাষ্ট্র বা রাশিয়ার ফসল সংকট এবং ২০১২-র উচ্চ খাদ্যমূল্যের মত সংকট আসতেই থাকবে।
লেখক :হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস থেকে সদ্য গ্র্যাজুয়েটপ্রাপ্ত