স্মরণ

লোকসাহিত্যের শেকড় সন্ধানী মুহম্মদ মনসুর উদ্দীন

আজ ৩১ জানুয়ারি বাংলার কিংবদন্তি লোকসাহিত্য গবেষক, শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক মুহম্মদ মনসুর উদ্দীনের ১০৯তম জন্মদিন। ১৯০৪ সালের এদিনে পাবনার সুজানগর থানার মুরারীপুর গ্রামে জন্ম নেয়া সাহিত্য-সংস্কৃতি ক্ষেত্রে অত্যন্ত সফলতম জীবনের অধিকারী মানুষটি ১৯২১ সালে এন্ট্রান্স পাস করার পর পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে আইএসসি পাস করেন ১৯২৩ সালে। বিএ পাস করেন রাজশাহী কলেজ থেকে ১৯২৬ সালে। বাংলায় প্রথম শ্রেণিতে তৃতীয় স্থান লাভ করে স্নাতকোত্তর পাস করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯২৮ সালে। বিয়ে করে সংসার জীবন শুরু তার ছাত্রাবস্থায়ই। ছাত্রজীবন শেষে তিনি বেছে নেন শিক্ষকতার পেশা। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৯ সাল পর্যন্ত একটানা বিভিন্ন স্কুল-কলেজে শিক্ষকতায় নিয়োজিত থাকার পর খণ্ডকালীন অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। মনসুর উদ্দীনের সাহিত্যে হাতেখড়ি শিক্ষকতা করার সময়কালীন। তার প্রথম প্রকাশিত কবিতার নাম— ‘বেদুইন মুসলমান’। কবিতাটি ছাপা হয় পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের ম্যাগাজিনে। তিনি লালন তথা লালনগীতির প্রতি আকৃষ্ট হন স্কুলজীবন থেকেই। সে সাথে তিনি আগ্রহী হয়ে ওঠেন বাংলার লোকগাথা, লোকসংগীত, প্রবাদ-প্রবচন ইত্যাদির প্রতি। আর তাই তো সেসব সংগ্রহের জন্য তিনি চারণিকের মতো চষে বেড়ান গ্রামবাংলার আনাচে-কানাচে। ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে অবসর জীবনে এসেও তিনি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘুরে ঘুরে ছড়া, গান, ধাঁধা, প্রবাদ, প্রবচন ইত্যাদি লোকসাহিত্যের সকল উপাদান সংগ্রহ করে তার ভাণ্ডার পূর্ণ করেছেন। তিনি বাংলাভাষাকে এতটাই ভালোবাসতেন যে, যখন তত্কালীন পাকিস্তান সরকার বাংলা বর্ণমালা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয় সাথে সাথে তীব্র ভাষায় তার প্রতিবাদ করেন। এমনকি সরকার বেতার-টিভিতে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচার বন্ধ করে দিলে তিনি প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। বাস্তবিকই বাংলা সাহিত্যে বাংলা ভাষা, বাংলা সংস্কৃতি এবং লোকগাথা-লোকসংস্কৃতির এমন শেকড় সন্ধানী অনুরাগী প্রতিভা খুব অল্পই দেখা গেছে। বাংলার লোকসাহিত্য, যা ছিল অলিখিত, সাধারণের মুখের বুলি, সেগুলোর অন্যতম সংগ্রাহক হিসেবে সুপরিচিত তিনি। শুধু দেশেই নয়, ১৯৫২ সালে লন্ডনে আন্তর্জাতিক লোকসঙ্গীত সম্মেলনে যোগ দিয়ে ‘বেঙ্গলি ফোকলোর’ নামে প্রবন্ধ পাঠ করে প্রশংসা অর্জন ছাড়াও তাকে একজন উচ্চমানের ফোকলোর গবেষকের মর্যাদা দিয়ে ফোকলোর কাউন্সিলের সদস্যপদ প্রদান করা হয়। তার ফোকলোর বিষয়ক বহু লেখা প্রকাশিত হয় তত্কালীন প্রবাসী, ভারতী, ভারতবর্ষ, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষত্ পত্রিকা-এর মতো নামকরা সব পত্র-পত্রিকায়। মনসুর উদ্দীনের সবচেয়ে বড় এবং অক্ষয় কীর্তি হলো ‘হারামণি’। দীর্ঘ সময়ব্যাপী লোকসাহিত্য সংগ্রহের ফসল এই ‘হারামণি’। মোট ১৩ খণ্ডে প্রকাশিত হয় এই লোকসঙ্গীত সংকলনটি। তার সম্পাদনায় আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সুগভীর পাণ্ডিত্যের পরিচয়বাহী এ গ্রন্থখানি বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ । তার অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে শিরনী, ধানের মঞ্জরি, আগরবাতি, বাংলা সাহিত্যে মুসলিম সাধনা, ইরানের কবি প্রভৃতি অন্যতম। সাহিত্য এবং সংস্কৃতি ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি লাভ করেন বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার, শেরে বাংলা জাতীয় পুরস্কার ও পদক, মুক্তধারা সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদক, নাসিরুদ্দিন স্বর্ণপদক, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধিসহ অসংখ্য সম্মাননা। ১৯৮৭ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর তার জীবনাবসান ঘটে। লেখক: প্রাবন্ধিক/অনুবাদক