অমর একুশে গ্রন্থমেলা

বায়ান্নের ভাষা শহীদদের স্মৃতিবিজড়িত ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিন আজ। এই দেশের মানুষের চেতনায় মাসটির প্রভাব ও তাত্পর্য কতো ব্যাপক ও গভীর তাহা বলার অপেক্ষা রাখে না। বস্তুত ইহা এক অনির্বাণ বাতিঘর। দশকের পর দশক ধরিয়া ব্যতিক্রমহীনভাবে তাহা জাতিকে পথ দেখাইয়া আসিতেছে। এই আলোর স্পর্শে অন্যায়ের কাছে মাথানত না করার এবং প্রবল দেশাত্মবোধের অন্যরকম এক আবেগ ও উদ্দীপনায় জাগিয়া ওঠে সর্বস্তরের মানুষ। তাহার বড়ো অংশ জুড়িয়াই থাকে বর্ণনাতীত ও অনন্য এক সৃষ্টিশীলতা। নানাভাবে তাহার বহিঃপ্রকাশ ঘটিলেও সাহিত্য ও সংস্কৃতির অঙ্গনেই এই সৃষ্টিশীলতার প্রভাব যে সর্বাধিক তাহাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই। পুরা মাস জুড়িয়াই চলিতে থাকে সৃষ্টিশীল সাংস্কৃতিক কর্মযজ্ঞ। দেশব্যাপী বিস্তৃত এই কর্মযজ্ঞের প্রাণকেন্দ্র বলিয়া বিবেচিত বাংলা একাডেমী এইবারও যথারীতি গ্রহণ করিয়াছে মাসব্যাপী কর্মসূচি। এই কর্মসূচির প্রধান আকর্ষণ হইল অমর একুশের গ্রন্থমেলা। ইতোমধ্যে সকল প্রস্তুতিই সম্পন্ন করা হইয়াছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ আনুষ্ঠানিকভাবে মাসব্যাপী এই গ্রন্থমেলার উদ্বোধন করিবেন। বাংলা একাডেমীর এই গ্রন্থমেলা ইতোমধ্যে পরিণত হইয়াছে বাঙালির প্রাণের মেলায়। নানা বয়সি নানা পেশার নানা স্তরের মানুষ সপরিবারে ছুটিয়া আসে এই মেলায়। মাস জুড়িয়া অব্যাহত থাকে মেলাকেন্দ্রিক মানুষের এই ঢল। হাজার হাজার নয়, লক্ষ লক্ষ মানুষের এই ঢল সামলাইতে গিয়া হিমশিম খাইতে হয় বাংলা একাডেমী কর্তৃপক্ষকে। একদা গুটিকয় প্রকাশকের অংশগ্রহণে অতি ক্ষুদ্র পরিসরে যেই বইমেলার সূচনা হইয়াছিল তাহা আজ মেলা প্রাঙ্গণের জটাজুটধারী বটবৃক্ষটির মতো বিশাল আকার ধারণ করিয়াছে। গ্রন্থমেলাকে কেন্দ্র করিয়া একদিকে যেমন শত শত নূতন বই প্রকাশিত হইতেছে, অন্যদিকে তেমনি বই বিক্রির পরিমাণও ছাড়াইয়া গিয়াছে কোটি টাকার অংক। তবে অংশগ্রহণেচ্ছু প্রকাশক ও প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ক্রমবর্ধমান হইলেও প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োজনে একাডেমী চত্বর ক্রমেই সংকুচিত হইয়া আসিতেছে। ফলে স্টল পাইবার জন্য দৌড়ঝাঁপ প্রবল হইতে প্রবলতর হইয়া উঠিতেছে। সেইসাথে মাথাচাড়া দিয়া উঠিয়াছে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, পেশিশক্তি প্রদর্শন ও স্টল-বাণিজ্যের মতো নানা অশুভ প্রবণতাও। এমনকি গ্রন্থমেলার প্রবেশপথটিও বেদখল হইয়া যাওয়ার কারণে গ্রন্থমেলায় নিরাপদে ও স্বচ্ছন্দে আসা-যাওয়া ক্রমেই কঠিন হইয়া পড়িতেছে। মেলা প্রাঙ্গণের অবস্থা আরও দুর্বিষহ। পরিবার-পরিজন লইয়া স্টলে স্টলে ঘুরিয়া পছন্দের বইটি খুঁজিয়া বাহির করা দূরে থাক, অত্যধিক ভিড়ের কারণে বেশিরভাগ সময়ে হাঁটাচলারও উপায় থাকে না। সব মিলাইয়া, গ্রন্থমেলা লইয়া দীর্ঘদিন যাবত্ নানা ধরনের আলোচনা-সমালোচনা চলিয়া আসিতেছে। বেশকিছু বিকল্প প্রস্তাবও উত্থাপিত হইয়াছিল। দাবি উঠিয়াছিল, মেলাটি অন্যত্র সরাইয়া নেওয়ার। কিন্তু বায়ান্নের অবিনাশী চেতনার ফসল বাংলা একাডেমীর সাথে গ্রন্থমেলার নাড়ির বন্ধন ছিন্ন করিতে কেহই সম্মত হন নাই। তবে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ দাবিটি ছিল মেলাটিকে অবাঞ্ছিত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জবরদখল হইতে মুক্ত করিয়া শুধুই প্রকাশকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার। বাংলা একাডেমী কর্তৃপক্ষও ইহাতে নীতিগতভাবে সম্মত হইয়াছিলেন। সিদ্ধান্তটি মহত্ হইলেও কাজটি যে কতোটা কঠিন তাহা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। বাংলা একাডেমীর মহাপরিচালককে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাইতে হয়— কারণ তিনি নানামুখী ‘প্রচণ্ড চাপের’ মধ্যেও সেই সিদ্ধান্তকে বাস্তবে রূপ দিয়াছেন। গত বৃহস্পতিবারের ইত্তেফাকে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক বা অন্য কোনো বিবেচনায় এইবার কোনো স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয় নাই। শুধু তাহাই নহে, মেলা প্রাঙ্গণের সামনের সড়কটিকে জবরদখলকারীদের কবলমুক্ত রাখার পাশাপাশি গ্রন্থমেলাকে সর্বপ্রকার অননুমোদিত ও নকল প্রকাশনামুক্ত রাখার ব্যাপারেও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করিয়াছে বাংলা একাডেমী। সেইসাথে অন্যান্যবারের তুলনায় জোরদার করা হইয়াছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা— যাহা অত্যন্ত জরুরি বলিয়া আমরা মনে করি। বই ক্রয় ও পাঠ করিবার জন্য শিক্ষা ও সঙ্গতি দুইটাই প্রয়োজন। এই ক্ষেত্রে আমাদের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি সর্বজনবিদিত। তাহা সত্ত্বেও, যতো দিন যাইতেছে গ্রন্থমেলায় জনসমাগমও ততোই বাড়িয়া চলিয়াছে। বিষয়টি আশাব্যঞ্জক শুধু নহে, অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণও বটে। সরকারের নীতিনির্ধারক মহল, বাংলা একাডেমী কর্তৃপক্ষ এবং প্রকাশকদের এইদিকে বিশেষ নজর রাখিতে হইবে। সম্ভাব্য সকল উপায়ে উত্সাহিত ও প্রণোদিত করিতে হইবে বইমেলা অভিমুখী এই জনসাধারণকে। অতএব, শুধু প্রকাশকদের নয়, গ্রন্থমেলা হউক প্রকাশক-লেখক ও পাঠকের মিলন মেলা। গ্রন্থমেলা হউক বাঙালির সত্যিকারের প্রাণের মেলা। আর এই অদম্য প্রাণপ্রবাহ ছড়াইয়া পড়ুক বাংলার প্রতিটি গৃহকোণে।