দেশে-বিদেশে বইমেলার আধুনিকায়ন
প্রকাশ : ০১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২০:৪৫
উন্নত দেশগুলোতে বাসে ট্রেনে গাড়িতে বা যেকোন বাহনে মানুষ বই পড়ে। পড়তে ভালোবাসে। এই ক’বছর আগেও তেমন দৃশ্য দেখতে দেখতে অফিসে যেতাম, ফেরার পথেও তাই। আমাদের দেশের মত ভিড়, জনাকীর্ণ অবস্থা বা পকেট মারের ভয় নেই বটে। কিন্তু সকাল সন্ধ্যায় পাবলিক যানবাহন কিছুও নয়। মোটামুটি ভিড়, কোথাও কোথাও গায়ের ওপর ঝুঁকে পড়া অন্য যাত্রীর পরও পাঠরত মানুষের দেখা মিলতো। হাতে ধরা বইটিতে বুঁদ হয়ে আছেন কেউ, কেউ বা গিলছেন আর কেউ অলসভাবে পাতার পর পাতা উল্টে চলেছেন, সে দৃশ্যপট এখন ভিন্ন ধরনের। মাত্র দু’এক বছরে বলতে গেলে আমূল পাল্টে গেছে তা। এখনো মানুষ পড়েন, পড়ছেন কিস্তু হাতে তার মুদ্রিত পুস্তক নেই। সিডনি, বিশ্ব জরিপে সব সময় দশের ভেতরে থাকা নগরী। এবার এক জরিপে ঠাঁই নিয়েছে তিন বা চার নম্বর অবস্থানে। বলাবাহুল্য যেকোন জরিপের মূল বিষয় হচ্ছে অর্থ বা জীবন মানের সচ্ছলতা। সচ্ছল স্বনির্ভর সিডনির মানুষের আর যাই থাক অর্থ কষ্ট নেই। না খেয়ে না পরে মরার মত অবস্থা নয় তাদের। সচ্ছলতার হাওয়ায় প্রযুক্তি বা বিজ্ঞানের তোড়ে বই হয়ে গেছে ছোট পর্দা, অক্ষরবন্দী হয়েছে ল্যাপটপ, আই প্যাড, ট্যাবলেট নামের ছোট ছোট কম্পিউটার যন্ত্রে। ই-বুক নামের নতুন যন্ত্রদানব অথবা যন্ত্রদূত মুদ্রিত বইকে প্রায় হটিয়ে দিয়েছে, যেকোন পাবলিক প্লেসে মানুষ এখনো পড়ছে তবে তাদের হাতে হাতে ই-বুক, মিনি পর্দা বা ই-মাধ্যম।
বদলে যাওয়া পুস্তকের এই ধারা আমাদেরও ছেড়ে কথা বলছে না। বিশেষত তরুণ-তরুণীরা এখন মূলত কম্পিউটারনির্ভর, তাদের দৈনন্দিন জীবনে মুদ্রিত বই, হাতের লেখা, সনাতন বা প্রাচীন উপকরণ বিলুপ্তির পথে। অপেক্ষাকৃত গরীব দেশ হবার পরও আমাদের দেশ বা সমাজেই কম্পিউটার প্রযুক্তি ও মুঠোফোন জাঁকিয়ে বসেছে। মানুষের হাতে হাতে মোবাইল। ফলে বই বা গ্রন্থ যে দ্রুত ই-বুকে পরিণত হবে বা হতে যাচ্ছে, এতে কোন সন্দেহ দেখি না। পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়ানোর নামই আধুনিকতা। আমাদের দেশের লেখকরা কি সে পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত আছেন?
বইমেলা আরম্ভ হলে আমাদের লেখকরা জেগে ওঠেন। প্রাণ-প্রাচুর্যে জেগে ওঠা বইমেলায় নতুন লেখক, পুরনো লেখক আর ক্রেতা-বিক্রেতা মিলে গড়ে ওঠে স্বপ্নের এক ভুবন। এই স্বপ্নময় জগিট এখন কারিগরি বা যন্ত্র নির্ভরতার কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। আমরা যেন ভুলে না যাই পৃথিবী ও মানুষ পরিবর্তনের খেয়ায় জীবন পাড়ি দেয়। এককালে শরত্চন্দ্র, মীর মোশাররফ হোসেন বা বিমল মিত্রের বই মানেই ছিল ইট। বিশাল বিশাল উপন্যাস, সুনীল, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামানদের হাতে এলো পরিমিত গদ্যের নতুন উজ্জ্বলতা, যদিও বুদ্ধদেব বসুই এর পথিকৃত্, এখন মানুষের হাতে সময় কম, সংক্ষিপ্ত সময়ে যতটা রস আস্বাদন বা তৃপ্তি পাওয়া সম্ভব, ততটাই তার চাওয়া। বাংলা বইয়ের আরেক শ্রেণির পাঠক আমাদের জননী ও ভগ্নিরা। এই সেদিনও অলস মধ্যাহ্নে স্বামী কাজে, পুত্র কন্যাকে ঘুম পাড়িয়ে, নিজে পরিতৃপ্ত মধ্যাহ্ন ভোজ সেরে পান মুখে দিয়ে বিছানায় এলিয়ে উপন্যাস, গল্প বা অন্য কোন বইয়ে ডুবে যেতেন তারা। বালিশের তলায়, বিছানার চাদরের নিচে থাকতো সুপাঠ্য ভ্রমণ কাহিনী। কান্না ভেজা উপন্যাস বা গল্পগুচ্ছ। সেদিন ঘুচেছে, সেকাল আজ গতায়। এখন মা-ভগ্নিরাও কর্মজীবী, তাদের হাতে সময় নেই। যাদের আছে তাদের সামনেও বিকল্প অনেক। দৃশ্যমান মিডিয়া টিভি, ইউটিউব বা অন্য যেকোন কিছুতেই আবেদন আর টেনে নেয়ার মত বিনোদনের ছড়াছড়ি। আজকাল টিভি সিরিয়াল মানেও কিন্তু উপন্যাস বা গল্পের চিত্রায়ন, তার মানে কি? ঐ উপন্যাসটি চিত্রনাট্যকার, পরিচালক আর শিল্পী-কুশীলবরা পড়লেই চলবে, বাকিরা এক ঢিলে দুই পাখি মারবেন। দর্শক-শ্রোতা উপন্যাসও জানলেন, নাটক বা সিমেনাও দেখলেন।
এই যে নানাবিধ উপসর্গ, আক্রমণ, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এর গা বাঁচিয়েই বইকে বেঁচে থাকতে হচ্ছে, থাকবেও। ই-বুক বা অন্যান্য আধুনিক পুস্তক-বিকল্পগুলোকে জায়গা দিতে হবে। সে জাতীয় স্টল খোলা সম্ভব কিনা তাও বাংলা একাডেমীর ভাবনায় রাখা প্রয়োজন। অন্যদিকে আকর্ষণীয় অর্থে আকর্ষণীয় নয়, সত্যিকার প্রাণ ও জীবনের স্পন্দন জাগাতে হবে। একদিকে আধুনিকতা, অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের বই ও লেখকের আগ্রাসন রোধ, পাশাপাশি নিজেদের গুণ ও কর্মে ঔজ্জ্বল্য তৈরি করে বইমেলাকে এগুতে দিতে হবে। মনে রাখা প্রয়োজন সরকার আসবে, সরকার যাবে, নীতি বদলাবে, মুখ বদলাবে; কিন্তু বইমেলা থেমে থাকবে না। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় স্বপ্ন দেখতেন তার বইগুলো মরে একদিন ভূত হবে আর ভূত হয়ে কম্পিউটার বইয়ের টুঁটি চেপে ধরবে। অতটা না হলেও আমরা একথা বলতেই পারি, বই অবিনাশী, বইমেলাও চিরন্তন। দেশের পাশাপাশি বিদেশের প্রায় প্রত্যেক দেশে অভিবাসী বাঙালির বইমেলাই তার উজ্জ্বল উদাহরণ। যা নিয়ে আগামীতে বলার ইচ্ছে রইল।
(সিডনি থেকে)
dasguptaajoy@hotmail.com