[ আ ন্ত র্জা তি ক ]
কোন পথে মিসরের রাজনীতি
প্রকাশ : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২০:৫৬
কায়রোর সেই বিখ্যাত তাহরির স্কয়ার আবারও বিক্ষোভের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছে। গত ২০১১ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি হোসনী মোবারকের পতনের পর মোহাম্মদ মুরসির নেতৃত্বে মিসরের নতুন সরকার গঠিত হলেও সাম্প্রতিককালে মুরসি কর্তৃক বিভিন্ন ডিক্রি জারির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করার প্রয়াস আবারও জনবিক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মিসরে। ২০১০ সালের শেষের দিকে অর্থাত্ ২০১১ সালের শুরুতে আরব বিশ্বে যে বসন্ত শুরু হয়েছিল তার ফলস্বরূপ মিসরে একনায়কতন্ত্রের পতন হলেও রাজনৈতিক দলীয়করণ তথা ক্ষমতার কেন্দ্রীয়করণের প্রয়াস এখনো চলছে।
মিসরের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে যদি নব্য-উদারবাদী তত্ত্বের আলোকে বিশ্লেষণ করা যায় তাহলে একটি বিষয় আমাদের কাছে স্পষ্টভাবেই উঠে আসে আর তা হলো অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সামাজিক শোষণ। হোসনী মোবারক মিসরে যে একনায়কতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা কায়েম রেখেছিল তার ফলে সমাজের একটি নির্দিষ্ট শ্রেণী রাষ্ট্রীয় সুবিধা ভোগ করতে পারলেও বাকি ৮৫ মিলিয়ন জনগণ ছিল সুবিধা বঞ্চিত। আর এরূপ সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের ফলেই গত ২৫শে জানুয়ারি ২০১১ সালে মিসরের জনগণ যে বিপ্লব শুরু করেছিল তা একনায়কতন্ত্রের পতন ঘটাতে সক্ষম হয়। কিন্তু তারপরও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন শক্তির মধ্যে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিযোগিতা এখনো চলছে। হোসনী মোবারকের পতন হয়েছে একথা সত্য, কিন্তু একনায়কতন্ত্রের এরূপ পতন মিসরের জনগণের জন্য কতটুকু গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিশ্চিত করতে পেয়েছে তা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। মিসরের চলমান আভ্যন্তরীণ রাজনীতি দেখে মনে হচ্ছে এখনো যেন মোবারকের অবর্তমানে “মোবারকবাদের” একটা ধারণা রয়েই গেছে সেখানে। সর্বোপরি বলা যেতে পারে নব্য-উদারবাদ যেন এখনো মিসরের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে প্রভাবিত করছে। মিসরসহ মধ্যপ্রাচ্যের লাখো সাধারণ জনগণ আজ নব্য-উদারবাদকে তথা নব্য-উদারবাদী নীতিগুলোকে তাদের রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হিসেবে বিবেচনা করছে। এটা অনস্বীকার্য যে, আবার মিসর এরূপ গণজাগরণ তথা আরব বসন্ত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তথা আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে অনেকটা প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিককালে মিসরের রাজনীতিতে চলমান ক্ষমতার এরূপ প্রতিযোগিতার ফলে জনমনে যে ক্ষোভের জন্ম নিয়েছে তা থেকে বলা যেতে পারে মোহাম্মদ মুরসির নেতৃত্বে মিসরের বর্তমান রাজনীতির ভবিষ্যত্ অনেকটাই অনিশ্চিত।
মোহাম্মদ মুরসি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই উদারপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে কট্টর ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত মুসলিম ব্রাদারহুডের দূরত্ব বেড়েই চলেছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, হোসনী মোবারকের উত্খাতের পর এখনো পর্যন্ত মিসরে কোন সংবিধান নাই। তাই সাম্প্রতিককালে মুরসি মিসরের নতুন রাষ্ট্রীয় সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্যে পদক্ষেপ নিয়েছে। আর সংবিধান প্রণয়নের এরূপ পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে মিসরের উদারপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে মুরসির বিরোধ বেড়েই চলেছে। উদারপন্থি দলগুলো এখন অভিযোগ তুলছে যে, সংবিধান প্রণয়নের লক্ষ্যে গঠিত গণপরিষদ এবং সরকারি বিভিন্ন পদে মুসলিম ব্রাদারহুডের একচ্ছত্র আধিপত্য রয়েছে যা গণতন্ত্র পরিপন্থি। তাছাড়া আর্থসামাজিক স্থিতিশীলতা, মানবাধিকার এবং সংখ্যালঘু অধিকার এবং বিপাকের সময় হতাহত জনগণের দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকার যে পদক্ষেপ নিয়েছে তা যথাযথ না।
মিসরের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে দেখা যায় অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর তুলনায় দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে মুসলিম ব্রাদারহুড এর প্রভাব অনেক ক্ষেত্রেই বেশি। আর হোসনী মোবারক এবং মোহাম্মদ মুরসি উভয়েই ছিলেন মুসলিম ব্রাদারহুডের বেশ বড় মানের নেতা। যদিও ২০১২ সালের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত হওয়ার পর মুরসি ব্রাদারহুড থেকে পদত্যাগ করেন, কিন্তু ব্রাদারহুডের সেই আদর্শের প্রতিফলন এখনো তাঁর দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হচ্ছে। নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই উদারপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে ক্ষমতার কেন্দ্রীয়করণ নিয়ে মোহাম্মদ মুরসির দ্বন্দ্ব চলে আসছে। হোসনী মোবারকের পতনের পর প্রথমদিকে ব্রাদারহুড নির্বাচনে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানানোর পরবর্তীতে ব্রাদারহুডের প্রার্থী হিসাবেই মুরসি নির্বাচনে অংশ নেন এবং ৬১.৭ শতাংশ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। নির্বাচনী প্রচারের সময় যদিও মুরসি অঙ্গীকার করেছিলেন যে, বিজয়ী হতে পারলে তিনি নারীর অধিকার নিশ্চিত করবেন এমনকি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত প্রণয়নের ক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করবেন। এবং এরই ধারা হিসেবে একজন নারী উপ-রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিবেন। কিন্তু নির্বাচন পরবর্তীকালে এখনো পর্যন্ত মুরসি তাঁর নির্বাচনী অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়ন করতে পারলেন না। অনেক সমালোচকগণই এখন ইসলামিক আদর্শগুলোকে নিজেদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। মোহাম্মদ মুরসি ক্ষমতায় আসার পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত মিসরে আর্থ-সামাজিক স্বার্থের দ্বন্দ্বের পরিধি বেড়েছে অনেকখানি। মিসরের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনায় বলা যায় যে, আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে নতুন কোন ধারণার গ্রহণযোগ্যতা দেশটিতে খুবই কম রয়েছে। নতুন ও অধিক কার্যকর কোন রাজনৈতিক ধারণার গ্রহণযোগ্যতা মিসরে নেই বললেই চলে। দেশটির রাজনৈতিক দলগুলো এখনো সেই প্রাচীন আদর্শিক রাজনীতির ধারণাগুলো নিয়েই নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন গণতন্ত্রের চর্চা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে তেমনি আবার উন্নয়নও ব্যাহত হচ্ছে। এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে বিভিন্ন ইসলামী দল, সমাজতান্ত্রিক দল, জাতীয়তাবদী দলসহ উদারপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। মিসরের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এক ধরনের ভাঙ্গন তথা বিভাজন লক্ষ্য করা যায়। দেশটিতে আনুমানিক ৪০টি রাজনৈতিক দল রয়েছে। এ সকল রাজনৈতিক দলের মধ্যে আদর্শিক দিক থেকে পার্থক্য খুবই সামান্য হলেও ক্ষুদ্র ক্ষদ্র বিভিন্ন বিষয়ে মতানৈক্যের কারণে সৃষ্ট দ্বন্দ্বের ফলে প্রায়শই ভাঙ্গন লক্ষ্য করা যায়।
মিসরের রাজনৈতিক দলগুলো অনেক ক্ষেত্রেই নিজের রাজনীতিকে সংগঠিত করতে নতুন কোন ধারণা সম্পর্কে জ্ঞান নিতে অনাগ্রহী।
তাছাড়া আন্ত:দলীয় গণতন্ত্রের চর্চাও মিসরের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে লক্ষ্য করা যায় না। এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে বর্তমান ক্ষমতাসীন ব্রাদারহুডের ফ্রিডম এন্ড জাস্টিস পার্টির (FJP) কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। বিপ্লব পরবর্তীকালে নির্বাচনের পর ফ্রিডম এন্ড জাস্টিস পার্টি নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার মাধ্যমে মিসরের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসে। কিন্তু ব্রাদারহুডের ফ্রিডম এন্ড জাস্টিস পার্টির নেতা হিসেবে মোহাম্মদ মুরসি দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে কতটুকু প্রস্তুত আছেন তা আজ প্রশ্নবিদ্ধ। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে মুরসি আজও কোন কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পেরেছেন কি-না তা নিয়ে বিশ্লেষকগণের মধ্যে মতান্তর আছে। সাম্প্রতিককালে বিরোধী দলগুলো মুরসিকে ক্ষমতা থেকে উত্খাত করার জন্য যে বিক্ষোভ শুরু করেছে তা যদি চলমান থাকে তাহলে হয়তো ভবিষ্যতে তা বিপ্লবে রূপ নিতে পারে। এমন অবস্থায় মুরসির উচিত হবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার চিন্তা বাদ দিয়ে বিরোধী দলগুলোর সাথে আলোচনায় আসা। অন্যদিকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন তথা নারীর ক্ষমতায়ন এবং মানবাধিকার নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলোকে আরো গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিত। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিরোধী দলগুলোর সাথে আলোচনা করা। কেননা জনগণ যে গণতান্ত্রিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আরব বসন্ত বিপ্লবের মাধ্যমে হোসনী মোবারককে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল তা যদি মুরসি নিশ্চিত করতে না পারে তাহলে হয়তো একই বিপ্লবের পুনরাবৃত্তি ঘটবে।
লেখক :সহযোগী অধ্যাপক ও সাবেক বিভাগীয় সভাপতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।