মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতি
প্রকাশ : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৩, ২১:৩৯
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগ ও ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনের যৌথ উদ্যোগে বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত মহাত্মা গান্ধী স্মারক বক্তৃতায় নীতিহীন রাজনীতি বর্জনের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের আহ্বান জানানো হইয়াছে। এই অনুষ্ঠানে বক্তারা মহাত্মা গান্ধীর জীবনাদর্শ, বিশেষ করিয়া তাহার অহিংস নীতি, মানবতাবাদী দর্শন ইত্যাদি বিষয়ে সারগর্ভ বক্তব্য তুলিয়া ধরেন। তাহারা যথার্থই বলিয়াছেন যে, মহাত্মা গান্ধী সারাজীবন নৈতিকতাহীন শিক্ষা এবং নীতিহীন রাজনীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকিয়াছেন। বর্তমান সময়ে তাহার নীতি ও আদর্শ অনুসরণের প্রয়োজনীয়তার কথাও বক্তারা উল্লেখ করিয়াছেন। কিন্তু যে যুগে আমরা বাস করিতেছি, সেই যুগ যে মহাত্মাজীর যাপিত জীবন ও যুগ হইতে সকল বিচারেই সম্পূর্ণ পৃথক হইয়া গিয়াছে এই কথা অস্বীকারের উপায় আছে কি? তাই আজিকার যুগে আমরা সমাজে এমন সব কাণ্ডকারখানা দেখি যাহা মানুষের হূদয়ে কেবল রক্তক্ষরণই ঘটায় না, আমাদের ভবিষ্যত্ সম্পর্কেও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে। বক্তারা নীতিহীন রাজনীতি বর্জনের উপর সবিশেষ গুরুত্বারোপ করিয়াছেন। কিন্তু নীতিহীন রাজনীতিই কি আমাদের দেশ ও সমাজের একমাত্র সমস্যা আজ? রাজনীতি তো সমাজ হইতে কোন বিচ্ছিন্ন বিষয় নহে। সমাজে যখন সর্বত্রই অবক্ষয়, পচন আর নীতিহীনতার পরাকাষ্ঠা দেখা যায়, তখন কেবলমাত্র রাজনীতির উপর দোষারোপ করা কতটুকু সমীচীন ইহাও ভাবিয়া দেখা দরকার বৈকি! আজিকার সমাজে সকল পেশায় যে ধরনের অন্যায়-অবিচার আর নীতিহীনতা দৃশ্যমান তাহা শুধুমাত্র রাজনীতির নীতিহীনতার সৃষ্টি নহে। সমাজে ন্যায়বিচার এবং সত্য প্রতিষ্ঠা করিতে হইলে কেবল রাজনীতিকরা সত্-সজ্জন হইলেই চলিবে না, এইজন্য সকলেরই নীতিনিষ্ঠা, দায়িত্ববোধ, মমত্ববোধ ইত্যাদির পরিচয় দিতে হইবে। চিকিত্সক, সাংবাদিক, প্রকৌশলী, পুলিশ, শিক্ষক, ব্যবসায়ী সকলেই যদি কেবলই ব্যক্তিস্বার্থে নিমগ্ন থাকে এবং দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণ চিন্তার পরিবর্তে কেবলই নিজেদের অন্যায় দাবি ও স্বার্থ পূরণে ব্যস্ত থাকে তাহা হইলে এককভাবে রাজনীতিকরা ইহার কি ঔষধ বাত্লাইবেন?
গান্ধীজীর আমলে অবিচার অত্যাচার অসাধুতা ছিল না তাহা নহে; কিন্তু উহার একটি সীমা-পরিসীমা ছিল। কিন্তু আমাদের সমাজে কোনকিছুই আর নিয়ম-শৃংখলা মানিয়া চলে না। এই সমাজকে ‘যে যায় লংকায় সেই হয় রাবণ’ দশায় পাইয়া বসিয়াছে। ফলে সকল রকমের অন্যায় আব্দার পূরণের জন্য এখানে সকলেই যেন সাতিশয় ব্যস্ত। রাজনীতি শুধু যে রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয় তাহা নহে, ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় রাজনীতির প্রভাবের কথা অস্বীকার করা যাইবে না এই কথা সত্য; কিন্তু তাই বলিয়া সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যেই নীতি ও আদর্শহীনতার চর্চাকে তো নিশ্চয়ই রাজনীতি নামে অভিহিত করা যাইবে না। এই সমাজে ‘যে যত ভণ্ড ধড়িবাজ আজ সেই তত বলবান’ অবস্থা। এমতাবস্থায় সমাজে নৈরাজ্য-হিংসা-হানাহানি চলাটাই স্বাভাবিক। এখানে কেহ আইন মানিতে চাহে না, ব্যক্তিস্বার্থের যূপকাষ্ঠে সবকিছু জলাঞ্জলি দিবার এক উদ্ভট মানসিকতায় আচ্ছন্ন সবাই। হিংসা চরিতার্থ করার মধ্যেই তৃপ্তি খুঁজিয়া বেড়ায় অধিকাংশ মানুষ। এমন এক অবস্থায় অহিংস নীতি ইহাদের মনে সামান্যতম প্রভাব যে ফেলিবে না সেই কথা হলপ করিয়াই বলা চলে।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে কেবল রাজনীতিকদের সদিচ্ছাই যথেষ্ট হইতে পারে না। গোটা সমাজ যেখানে কলুষতায় ছাইয়া গিয়াছে সেখানে একা রাজনীতির পক্ষে স্রোতের বিপরীতে দাঁড়াইয়া কলুষমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা কাহাতক সম্ভব? মহাত্মা গান্ধীর শান্তিবাদী অহিংস নীতি এই যুগের ক্লেদাক্ত হিংসাশ্রয়ী ও স্থূল সমাজমানসে আদৌ কোন ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করিতে পারে কি না উহা দেখার বিষয়ই বটে! তবে এইজন্য হয়তোবা আমাদের আরও বহুকাল অপেক্ষাই করিতে হইবে কেবল! ধৈর্য, সহিষ্ণুতা, সহমর্মিতা ও মানবিক বোধবুদ্ধি আজ যেভাবে কর্পূরের মতো উবিয়া যাইতেছে তাহাতে শিহরিত না হইয়া পারা যায় না। মহাত্মা গান্ধীর যুগ আর এই যুগের বৈপরীত্যের দিকে দৃষ্টিক্ষেপ করিয়া ইহাই বলা সঙ্গত যে, আজ যখন সেই রামও নাই সেই অযোধ্যাও নাই, তখন অহিংসার বাণী শুধু উলু বনে মুক্তা ছড়াইবার মতো শোনায় নয় কি?